১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কুর্দী রাষ্ট্রের ভূত তাড়া করছে তুরস্ককে


আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের ছত্রছায়ায় সম্প্রতি ইসলামিক স্টেট বা আইএসএর বিরুদ্ধে কুর্দীদের বিজয়ের ফলে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোগান দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। স্বাধীন কুর্দী রাষ্ট্রের ভূত তাকে তাড়া করছে।

তুর্কী প্রেসিডেন্ট আগে বহুবার বলেছেন, ‘আমরা হামার মতো আরেক হত্যাযজ্ঞ ঘটতে দেব না।’ সুযোগ পেলে এ কথার পুনরাবৃত্তি করতে তিনি কখনই ছাড়েন না। তবে এরদোগান মনে হয় ভুলে গেছেন অথবা ভুলে যাওয়ার ভান করছেন যে, যে হত্যাযজ্ঞের কথা তিনি বলছেন সেটা হাফিজ আল আসাদের দ্বারা ১৯৮০-এর দশকে সংঘটিত হয়েছিল এবং এক দশক পর সেই একই শহরে ও অন্যত্র পুনরায় অন্যদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। কুর্দীপ্রধান এই শহরটি গত সেপ্টেম্বরে উদ্ধার করা হয়। এরদোগানের নাকের ডগায় কী নৃশংসতা ঘটে চলে হামা তার জাজ্জ্বল্য দৃষ্টান্ত। তার ওপর অন্যান্য বিয়োগান্ত পরিণতিও আছে। লাখ লাখ উদ্বাস্তু তুরস্কে পালিয়ে এসেছে। এতে করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

কেউ কেউ এসব ঘটনায় এরদোগানের যোগসাজশের অভিযোগ এনে থাকেন। শত শত বিদেশী তুরস্কের ভেতর দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কোন না কোন চরমপন্থী ইসলামী সংগঠনে যোগ দিয়েছে। অথচ তা দেখেও না দেখার ভান করে থেকেছে তার সরকার। উপরন্তু এই সরকার বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তাকফিরি জিহাদীদের অস্ত্র, মালসামান ও রসদ দিয়ে সাহায্যও করে আসছে। ট্রাকে করে এসব অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য সামগ্রী তুর্কী গোয়েন্দা রক্ষীদের প্রহরায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাবার ভিডিও দৃশ্য অকাট্য প্রমাণ হিসেবে প্রকাশ করেছে কামহুরিয়াত পত্রিকা।

এই সাহায্য দেয়ার পেছনে গোপন উদ্দেশ্যটা হলো কুর্দীপ্রধান শহর কামিসলির রাজনৈতিক কর্মী, মিলিশিয়া, রাজনৈতিক সংগঠন ও জনগণকে নির্মূল করা। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারাও হবে। প্রথমত এর দ্বারা দামেস্ক সরকার ও বাথ পার্টির পক্ষ নেয়ার জন্য কুর্দীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হবে। দ্বিতীয়ত কুর্দীদের বিস্তার রোধ করা এবং তুরস্কের সীমান্তের পাশে কুর্দীদের স্বাধীন রাষ্ট্র সত্তা গঠনের ভাবনার রাশ টেনে ধরা যাবে।

কিন্তু সে গুড়ে বালি দিয়ে কুর্দীদের স্বাধীন রাষ্ট্র লাভের ধারণার বাস্তবায়ন সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। কারণ নিজেদের অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে শুধু কামিসলির জনগণ নয়, উপরন্তু সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা এবং সিরিয়ার বাইরের ভূখ-ের কুর্দী জনগণ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। আঙ্কারার শীর্ষ মহলের শঙ্কিত বোধ করা উচিত যে, কোবানি থেকে শুরু করে উত্তর ইরাক হয়ে তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত একটা ট্রায়াঙ্গেল সম্পন্ন হওয়ার পথে।

কিছু কিছু ঘটনা থেকে এই বক্তব্য সমর্থিত হয়। তার মধ্যে প্রধান প্রধান হলো কুর্দী মুক্তিযোদ্ধাদের স্থলভাগের লড়াইয়ে জয়লাভ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জয় হলো সীমান্ত শহর তেল আল আবিয়াদে। এই সীমান্ত শহরটি জিহাদীদের ও রসদপত্রের প্রধান ক্রসিং পয়েন্ট ছিল। শহরটি হাতছাড়া হওয়া ইসলামী রাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় ধরনের পরাজয়। ক্রসিংটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ফলে কুর্দীদের পক্ষে আনাতোলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বেড়ে গেছে। ওই এলাকাগুলোতে কুর্দীস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) অত্যন্ত প্রভাবশালী।

গত ১৩ জুন সাংবাদিকদের কাছে দেয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, “এমন একটা ধারণা বিরাজ করছে যে, তেল আল আবিয়াদে আরব ও তুর্কীদের টার্গেট করা হচ্ছে এবং এদের ১৫ হাজার লোক তুরস্কে পালিয়ে গেছে। তারপর ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি ও পিকেকের সদস্যরা সেই শূন্য স্থানে চলে এসেছে। এটা শুভ লক্ষণ নয়। এর অর্থ হচ্ছে একটা সত্তা গড়ে উঠতে চলেছে যা আমাদের সীমান্তের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।”

ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত সিরিয়ার কিছু এলাকায় লোকগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটার পাশাপাশি কুর্দীদের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু অর্জনও উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমত তুরস্কের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কুর্দীদের সাফল্য। আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে এই প্রথম তারা ৮০টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। অর্থাৎ পার্লামেন্টের ১০ শতাংশেরও বেশি আসন তাদের হাতে। তুরস্কের কুর্দীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাস করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। এ বিজয়ের ফলে এ এলাকার জনগণের রাজনৈতিক ও নৈতিক মনোবল অনেক উঁচুতে উঠেছে। এতে করে তুরস্কের রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু কিছু মহলে ভীতি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এরা মনে করে এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, তুরস্কের লাখ লাখ কুর্দী ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জাস্টিস পার্টিকে ভোট দেয়ার পর এখন তারা পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (এইচডিপি) প্রার্থী হিসেবে নামানো তাদের নিজস্ব লোকজনকে ভোট দিয়েছে।

সম্প্রতি তুরস্কের একটি কুর্দী প্রতিনিধিদল ইরাকের ইরবিল ও সুলায়মানিয়ায় গিয়ে স্বজাতীয়দের সঙ্গে দেখা করে। তারা কুর্দীস্তান ন্যাশনাল ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকে মিলিত হন। সিরিয়ার কুর্দীদের প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কুর্দীরা সবাই তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে, যে স্বপ্ন এরদোগানের জন্য দুঃস্বপ্ন। তেল-আল-আবিয়াদের কুর্দীস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) শাখা বলে কথিত সালেহ মুসলিমের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন পার্টির জঙ্গীরা বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের পর তুর্কীদের মধ্যে শঙ্কার ছায়া পড়েছে। পিকেকে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তালিকাভুক্ত হলেও এসব সংগঠন ও শক্তি ওয়াশিংটনের সমর্থন লাভ করছে। এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, তাতে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের জন্য এটা আঙ্কারার বিরুদ্ধে এক ধরনের শাস্তি।

তুরস্কের শীর্ষ মহল মনে করে যে, কোবানিকে যে রক্ষা করা গেছে তার প্রধান কারণ কোয়ালিশনের বিমান হামলা। কুর্দী সৈন্যরা তেল-আল-আবিয়াদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করায় কোয়ালিশনের জঙ্গী বিমানগুলো এখন কুর্দী বিমান বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কুর্দী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন আপত্তি নেই কিংবা এই রাষ্ট্র গঠন রোধে যুক্তরাষ্ট্র যে অন্ততপক্ষে কিছু করবে না, এটা কোন গোপন ব্যাপার নয়। তুরস্ককে ন্যাটো থেকে বের করে দেয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে ওয়াশিংটন থেকে যে আভাস পাওয়া গেছে, তাতে এমন ধারণা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

সিরিয়া সীমান্তে তুরস্ক তার স্থলবাহিনীর ১৫ শতাংশ সৈন্য মোতায়েন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তুরস্ক কি সীমান্ত এলাকা থেকে তার ভাষায় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও তাদের অনুসারীদের বের করে দেবে, যেমনটি তারা ১৯৯০-এর দশকে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে করেছিল? তেমন সম্ভাবনা খুব একটা বাস্তবানুগ বলে মনে হয় না। কারণ এবার ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা কখনই তা হতে দেবে না।

সূত্র : উইকলি আল আহরাম