২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

নক্সিকাঁথায় কৃষ্ণলীলা


আবহমান কাল ধরে পল্লী রমণীরা জীবনের প্রয়োজনে মনের তাগিদ মেটাতে উপহার দেয়ার ইচ্ছায় কিংবা নানা উদ্দেশ্যে সুচ ও বিভিন্ন রঙের সুতো দিয়ে হরেক রকম স্টিজ বা ফোঁড় তুলে যে নক্সীকাঁথাটি তৈরি করেন, যা আমাদের গ্রামীণ বাংলার লোক জীবনের সাংস্কৃতিক রূপবৈচিত্র্যের সৃজনশীল বিকাশে পরিপূর্ণ। লোকশিল্প হিসেবে নক্সীকাঁথার ব্যবহার নানাভাবে হয়। যেমন- ব্যক্তিগত প্রয়োজনভিত্তিক সামাজিক বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠাগত শিক্ষা ও নীতিবিষয়ক এবং বাণিজ্যভিত্তিক। তবে এই নক্সীকাঁথাটি কৃষ্ণের সহস্র গোপিনীদের কাব্যগাঁথা অজস্র কাহিনী তৈরির ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংস্কৃতি বিকাশের চেতনাস্বরূপ উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই নক্সীকাঁথাটির চারপাশের বর্ডার কলকা দিয়ে সাজানো। কেন্দ্রে বৃত্তাকার পদ্ম মোটিফের পার্শে¦ আলপনা অঙ্কৃত বৃত্তকে ঘিরে ফুলের সমারোহ। চারিপার্শ্বের বর্ডারে মুসরী ডিজাইন, ভিতরে কোণায় চারটি বড় মুসরী ফুল তার পার্শে¦ দুটি করে মোট আটটি কানের দুল এলোমেলো করে সাজানো হয়েছে। সম্পূর্ণ কাঁথাটির চার কোণায় চারটি জীবনবৃক্ষ। একটি সোজা হয়ে দ-ায়মান গাছে ফুল, পাখীদের কথোপকথন; নিচে সাপময়ূরী খেলা করছে। তারই পার্শে¦ মন্দির রাধাকৃষ্ণের যুগল গাঁথা কৃষ্ণের হাতে বাঁশী বাজাচ্ছে; আবার কৃষ্ণ কদম গাছের ডালে লুকোচুরি খেলায় মত্ত। কৃষ্ণের পা ছুয়ে আছে একজন সখী, গাছ থেকে নেমে এসে দু’জনে দু’জনায় কত কথা বলছে কে জানে। অন্য কোণের জীবনবৃক্ষের পার্শ্বে ময়ূরপক্ষী নায়ে কৃষ্ণ সখীদের নিয়ে যমুনার ঘাটে স্নান করিতে যাওয়ার দৃশ্য সখীদের মাথায় কলসী নিয়ে দাঁড়ানো। পার্শ্বের কোণার জীবনবৃক্ষের পর চার রমণী মাথায় হাত উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝের বৃক্ষে সাতটি ফুল এর পার্শে¦ তিন দেবী একটি ভঙ্গিতে মন্দিরের মধ্যে দাঁড়ানো। শেষ কোণার বৃক্ষটির পার্শে¦ নৃত্যের ভঙ্গিতে দাঁড়ানো রমণীরা নৃত্যলীলায় মাতোয়ারা এক অপূর্ব দৃর্শের সমাহার দেখা যায়।

নক্সীকাঁথার কাহিনীটি কৃষ্ণের সহস্র গোপিনীদের নিয়ে রচিত হলেও এর মূল চরিত্রগুলো নারী প্রধান অবলম্বনে চিত্রায়িত করা হয়েছে। যীশুখ্রীস্টের জন্মের শতকে সুন্দরের আর এক বিশেষ রূপ এলো নারীদেহ অবলোকনের এক বিশেষ কৌশল। নারীর দেহের ওপর সঙ্কোচিত ভাষায় সংযোগ যে নারী রূপ আমরা মিসরীয় ছবিতে দেখতে পাই, নারী জননী রূপে এক আদি আরাধনা পেয়েছে। কিন্তু মানুষ যখন তার আরাধনার লক্ষ্য তখন তা আর জাগতিক নয়। তার মধ্যে ইন্দ্রিয়ের বিশেষ পরিমার্জনা চলে আসে। তখন তারা মন্দির ছেড়ে দেবতা উপদেবতা ও দেবী রূপে মত্তে নেমে আসে।

এখানে যে সকল নর-নারীর প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গসহ সামগ্রিক দেহবয়বে সৌন্দর্যের যে প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে তা বাস্তবে কোন মানব মানবীর ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় না। কারণ নক্সীকাঁথার শিল্পীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে মানব-মানবীর দেহকে সুঁই ও বিভিন্ন রঙের সুতো দিয়ে দেহের আবয়ব তৈরি করে। কথাশিল্পীদের রমণীর সৌন্দর্য নির্মাণের ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় বৃহদাকৃতির সুডৌল স্তন, রাজহাঁসের লম্বা গলার মতো চিকন কোমর বৃহৎ মাংসল নিতম্ব এবং রূপলাবণ্য ভরপুর। সকল নারীদের একই ধরনের পোশাক সজ্জিত করা হলেও নক্সীকাঁথা স্টিজের ভিন্নতা রঙের ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ রূপলাবণ্য নির্মাণের কৌশল এবং এই রূপকে চিরস্থায়ী ও আকর্ষণীয় করার যে লক্ষ্য সে লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়, কারণ যুবতী চিরকাল যুবতী থাকে না। বার্ধক্যজনিত কারণে এক সময়ের রূপসী যুবতীও অনাকর্ষণীয় রূপধারণ করে থাকে।

শিল্পী যে বাস্তবে দেখা কোনকিছুর অবিকল চেহারা নির্মাণ ও চিত্রায়ত করে না বরং স্বাধীনভাবে মুক্তমনে শিল্প সৃষ্টি করবে। শিল্পীর সৃষ্টি মানুষ মানুষ হবে ঠিকই কিন্তু সে মানুষ বাস্তবকে দেখা কোন মানুষের অবিকল আকৃতি নয়। গাছপালা জীবজন্তু পশুপাখি আসবাবপত্র ফুল ফল সবই হবে কিন্তু হবে ভিন্ন ভিন্নভাবে।

মানবজীবনের বিচিত্র অনুভূতি যেমন সাহিত্যে বাণীরূপে লাভ করে, তেমনি শিল্পের ক্ষেত্রেও নানান রূপলাবণ্যে অভিষিক্ত হয়ে কাহিনী রূপে আত্মপ্রকাশ করে থাকে। পল্লীবালাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফোঁড়ের পর ফোঁড় হয়ে উঠে বিভিন্ন চিত্রকল্প, নানান মোটিভের মাধ্যমে চারপাশের বিচিত্র কাহিনী। এ নক্সীকাঁথাটি পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত কৃষ্ণলীলা ও নৌকাবিলাস পালার মধ্যে দিয়ে আধ্যাত্মিক প্রেমমূলক ভাবতরঙ্গ ইত্যাদি বাংলার নারীরা অতি সরল ও সহজ সাবলীল ছন্দে বোধগম্য করে নক্সীকাঁথা শিল্পে চিত্রের মাধ্যমে প্রচার করেছেন।

রাধা হলো কৃষ্ণের প্রিয়তমা স্ত্রী। কৃষ্ণ প্রাণের অধিষ্ঠাত্রী রাধা। কৃষ্ণলীলাতে রাধা নামের সবচেয়ে বেশি উল্লেখ পাওয়া যায়। কৃষ্ণকে ঈশ্বরজ্ঞানে দেহ, মন, প্রাণ সবকিছু সমর্পণ করেছিল। কদমগাছের ডালে বসে কৃষ্ণ বাঁশি বাজাতেন এবং সমস্ত পুরনারী আকুল হয়ে কৃষ্ণের অনুসরণ করতেন। বসন্ত এলেই গোকুলে কৃষ্ণ বাঁশি বাজায়। রাধা কান পেতে শুনতেন। কৃষ্ণ গোপীদের ঘরে ফিরে যেতে বললেও তারা যেতেন না। গোপীকারা পাগল হয়ে ঘরের চারিপাশে ঘুরে বেড়াতেন এবং কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে কাঁদতে থাকতেন। কৃষ্ণ বাধ্য হয়ে সখীদের সঙ্গে দেখা দিতেন এবং সকলকে নিয়ে রসলীলা করতেন।

পরবর্তী কাহিনীটি যমুনাতে গোপীদের নিয়ে কৃষ্ণের স্নান করার দৃশ্যটি চোখে পড়ে। ষোলশো গোপিনী নিয়ে যমুনার ঘাটে জল তুলে আনা, তাদের বস্ত্র চুরি করে গাছে বেঁধে রাখা, কখনও মাঝি সেজে সখীদের পারাপারের দৃশ্য ইত্যাদি অপরূপ কাহিনী মন কেড়ে নেয়। বাংলার লোকসাহিত্যে রাধিকাকে আচার্যরা হলাদিনী শক্তি বলেছেন। বৃন্দাবন লীলার প্রথম সন্ধান মেলেছিল হরিবংশে। সমুদ্রে জলকেলির মাধ্যমে যদু বংশীয় নরনারীদের যে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। ভগবত ও বিষ্ণুপুরাণে রাসলীলায় কিন্তু রাধা নেই।

তথ্যসূত্র : পৌরাণিকা (প্রথম ও দ্বিতীয় খ-)

অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

লেখক : ডিজাইনার আড়ং

ফোন : ০১৫৫২৭২৮০৭৯

০১৭৭৭৮৪৮৩৭১