২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ব্যাংক ঋণের সুদহার কমছে


রহিম শেখ ॥ বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। সেই বাধা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। সর্বশেষ মে মাসে ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। আগের মাসেও যা ছিল ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। সুদহারে এই নিম্নমুখী প্রবণতা ঋণ আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ হার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার আরও কমানোর লক্ষ্যে আমানতের বিপরীতে সুদহার কমিয়েছে। কিন্তু বেসরকারী ও বিদেশী ব্যাংকগুলো ঋণ-আমানতের সুদহার কমাতে পারছে না। যদিও এই হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতির উন্নয়নের প্রধান সূচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান তিনটি সমস্যা হচ্ছে অবকাঠামোর অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঋণের উচ্চ সুদহার। বাজেটে বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম বাধা হলো বিদ্যুত, গ্যাস প্রাপ্তিতে বিলম্ব, বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকরণে জটিলতা, জমির অভাব ও ঋণের উচ্চ সুদহার।

সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের দীর্ঘদিনের দাবি ব্যাংক ঋণের সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। সুদহারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ব্যাংকগুলোকে সুদহার কমিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়ে আসছে। গত কয়েক মাস ধরে আমানত ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রে সুদহার কমছে। ফলে গত মার্চে আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) রেকর্ড পরিমাণ কমে ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের নিচে নেমে এসে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। গত এপ্রিলে স্প্রেড আরও কমে ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশীয় পয়েন্টে নেমে এসেছে। সর্বশেষ মে মাসে স্প্রেড আরও কমে ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশীয় পয়েন্টে নেমে এসেছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদর্শিত তথ্যের মধ্যে ২০১৩ সাল পরে সর্বনিম্ন। এর আগে স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে ছিল ২০১৩ সালের এপ্রিলে ৪ দশমিক ৯৯, মে ৪ দশমিক ৯৮ এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদ উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, আমানতের বিপরীতে সুদহার অনেক কমেছে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার কমাতে পেরেছে। ফলে স্প্রেড কমেছে। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, স্প্রেড কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ফলে আগের চেয়ে স্প্রেড কমে যাচ্ছে। এটি আরও কমবে। আর স্প্রেড কমে এলেই ঋণের সুদের হারও কমে যাবে। যেসব ব্যাংকের স্প্রেড বেশি রয়েছে তাদের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এর কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জুনে স্প্রেড আরও কমে আসবে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেননা আমানতের বিপরীতের সুদ আর গড়ে ২ শতাংশ কমিয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। জুন থেকেই এটি কার্যকর করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত মে মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ সুদ। স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিশেষায়িত ব্যাংকের স্প্রেড সবচেয়ে কম মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশীয় পয়েন্ট। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ সুদ। এই খাতের ব্যাংকগুলোর ঋণের ক্ষেত্রে ভারিত গড় সুদহার ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। তবে বিদেশী ও বেসরকারী ব্যাংকগুলো স্প্রেড এখনও ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের উপরে রয়েছে। বিদেশী ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে ৩ দশমিক ২১ শতাংশ সুদ দিয়ে ঋণের বিপরীত আদায় করছে ১১ দশমিক ১২ শতাংশ সুদ। এ খাতের ব্যাংকগুলোর স্প্রেড সবচেয়ে বেশি ৭ দশমিক ৯১ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না ২২ বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর মধ্যে ১৭টিই বেসরকারী ও ৫টি বিদেশী ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণের সুদের হার কমাতে ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ রয়েছে। যেসব ব্যাংকে বেশি ব্যবধান রয়েছে তাদের নামিয়ে আনার জন্য একাধিকবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বিদেশী খাতের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। এরপরে রয়েছে বেসরকারী খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের একটি বড় অংশই হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতের। এই খাতের ঋণের সুদের হার বেশি। এছাড়া তাদের ভোক্তা ঋণের সুদের হারও বেশি। যে কারণে তাদের ঋণের গড় সুদের হার বেশি। এদিকে তারা আমানতের বিপরীতে খুব কম সুদ দেয়। যে কারণে তাদের স্প্রেড বেশি। ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধানের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বেসরকারী খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। তাদের এই ব্যবধান ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই ব্যাংকটিও খুব কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে। আবার ঋণের সুদের হার বেশি। যে কারণে তাদের স্প্রেডও বেশি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা উত্তরা ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা ওয়ান ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রিমিয়ার ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ০৭ শতাংশ।

অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, দি সিটি ব্যাংকের ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের ৫ দশমিক ২২ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংকের ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ৫ দশমিক ১২ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ৫ দশমিক ১ শতাংশ। নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ ও মিডল্যান্ড ব্যাংকের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। নির্দিষ্ট পরিমাণ জমার অজুহাত দেখিয়ে বিদেশী ব্যাংকগুলো সঞ্চয়ী হিসাবে সুদ দেয় না। এছাড়া নির্ধারিত ছকের বাইরে টাকা তোলার কারণেও সুদ দেয় না। এসব কারণে বিদেশী ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে কোন সুদ পায় না। বিদেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের স্প্রেড ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ, উড়ি ব্যাংকের ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, সিটি ব্যাংক এন, এ’র ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ, এইচএসবিসি ব্যাংকের ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ ও কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ স্প্রেড রয়েছে।