১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ব্যাধির মতোই কোচিং শিক্ষাব্যবস্থায় একাকার!


সমুদ্র হক ॥ উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির অনেক আগেই শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক কোচিং শুরু করতে হয়। এবারও তাই হয়েছে। আগামীতে এই অবস্থা কেটে যাবে, এমনটি মনে করে না কেউই। উল্টো এই বিষয়টি ব্যাধি আকারে ধারণ করে লেখাপড়ার (শিক্ষা ব্যবস্থা) সঙ্গে একাকার হয়ে দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে, এমন মন্তব্য অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের। ‘কোচিং না করলে পরীক্ষায় ভাল ফল করা যায় না এমন একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে’- ভাল ফল অর্থ জিপিএ- ৫। তারওপর হালে জিপিএ-৫ হলেই শুধু হবে না সকল বিষয়েই এ- প্লাস পেতে হবে। সকল বিষয়ে এ-প্লাসের একটা অদ্ভুত নামকরণ হয়েছে গোল্ডেন এ- প্লাস। এই ‘গোল্ডেন’ শব্দ বা পরিভাষাটি শিক্ষা বিভাগে এবং কোন বোর্ডেই নেই। কী করে যে তা আপন গতিতেই যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করেছে তা কেউ বলতে পারে না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে ছড়িয়েছে যে কোচিং না করলে এই গোল্ডেন পাওয়া সহজ নয়। আবার এই গোল্ডেন (প্রতিটি বিষয়ে ৮০ থেকে ১শ’ নম্বর) পেলেই যে পছন্দের ভাল কলেজে ভর্তি হওয়া যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই। যেমন এবার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা বিভাগ উত্তীর্ণ সকল শিক্ষার্থীকে অনলাইনে ফরম পূরণ করার নির্দেশ দেয়। সকলকেই পছন্দের ক্রমানুসারে পাঁচটি কলেজের নাম নির্বাচন করতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠিত ভাল কলজেগুলো বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগে ভর্তির জন্য ন্যূনতম যোগ্যতার ঘোষণা দেয়। সেই অনুযায়ী কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করা থাকে। যেমন ঢাকা কলেজসহ দেশের প্রতিষ্ঠিত কলেজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির জন্য সর্বনি¤œ জিপিএ-৫ চেয়েছে। অনলাইনে আবেদন করার সময় কেউ যদি জিপিএ-৫ না পেয়ে প্রথম পছন্দে ঢাকা কলেজ টিক দেয় তা কম্পিউটার নেবে না। এই অবস্থায় ভাল কলেজে পড়তে চাইলে ফল জিপিএ-৫ হতেই হবে। এমনও হয়েছে জিপিএ-৫ ‘গোল্ডেন’ পেয়েও পছন্দের ভাল কলেজে ভর্তির সুযোগ মেলেনি। নির্ধারিত ভর্তির আসনপ্রাপ্ত নম্বরের ওপর ভিত্তি করে পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ জিপিএ-৫ ফলে সকল বিষয়ে মোট নম্বর আসন পূরণে ওপর থেকে নিচ যে পর্যন্ত ঠেকেছে সেই পর্যন্তই প্রথম পছন্দের কলেজ নিয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় তৃতীয়...পছন্দে চলে গেছে। এভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে কোচিং অনেকটাই বাধ্যতামূলক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন শিক্ষার্থীরাই অভিভাবকদের সরাসরি বলে কোন কোন বিষয়ে কোচিং নিতে হবে। মা-বাবা অভিভাবকদের বোঝাতে সক্ষম হয় তাদের সহপাঠীরা যখন কোচিং করে লেখাপড়ায় এগিয়ে যাচ্ছে তখন সে পিছিয়ে থাকবে কেন। মা-বাবাও এই বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হন এবং কোচিংয়ের বাড়তি খরচ যোগাতে থাকেন। কারণ চারদিকে শিক্ষার অবস্থা দেখে চোখ-কান মেলে তারা বুঝতে পারছেন সন্তানের লেখাপড়ার গতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যা থাকার কথা সম্ভবত তা নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক প্রাইভেট পড়তে ও পড়াতে উদ্বুদ্ধ করেন। অনেক সময় নির্দিষ্ট কোচিং সেন্টারের নামও বলে দেন। এসব কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তাদের অদৃশ্য সম্পর্ক আছে বলে জানা যায়। এই বিষয়ে এক অভিভাবক বললেন, বর্তমানে এক শ্রেণীর চিকিৎসক যেমন রোগ নির্ণয়ের আগে শরীরের যাবতীয় পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠায় শিক্ষা ব্যবস্থাতেও কোচিং তেমনই এক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই ব্যাধি দূর হওয়ার কোন উপায় তারা দেখতে পান না। বরং মহামারির মতো জেঁকে বসেছে। এই বছর মাধ্যমিকে সকল বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া তন্দ্রা, পৃথ্বা ও সূচি বলল, পরীক্ষা শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরই পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন ও জীববিদ্যায় কোচিং শুরু করেছে তারা। ওই সময়ে কোচিং শুরু করতে না পারলে ভাল কোচিং দেন এমন শিক্ষকের কাছে আসন পাওয়া যেত না। কোচিংয়ের অবস্থাটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে যেখানে ভাল কোচিং হয় সেখানেও দিনের কয়েকটি ব্যাচে আসনসংখ্যা সীমিত করা আছে। কোচিং প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক সাফ বললেন, ভাল কোচিং পেতে ভাল অর্থ ব্যয় করতে হয়। তিনি দাবি করলেন সীমিত শিক্ষার্থী নিয়ে কোচিংয়ে ভাল পাঠ দেন এবং শিক্ষার্থীরা ভাল ফল করে। রাজধানী ঢাকায় শিক্ষায় কোচিং পাঠ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে সকল জেলা শহর বর্তমানে উপজেলা সদরেও কোচিং যেন শিক্ষা কার্যক্রমের বড় অংশ হয়ে গেছে। ঢাকার অনেক কোচিং প্রতিষ্ঠানের শাখা বড় জেলা শহরগুলোতে স্থাপিত হয়েছে। ঢাকার বাইরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বিষয়ভিত্তিক কোচিং জনপ্রতি প্রতি ব্যাচে ৫শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা (কখনও আরও বেশি) করে দিতে হয়। কোন বিষয়ের শিক্ষক ৬ মাসের একটি প্যাকেজের জন্য নেন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এই টাকা দু’তিন মাস অন্তর কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়। বর্তমানে সকল বিষয়েই কোচিং করতে হয়। বাংলা ও ইংরেজী বিষয়েও কোচিং এখন শুরু হয়েছে। নতুন বিষয় তথ্যপ্রযুক্তিতে কোচিং নিতে হবে এমনটিও জানানো হয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে কোচিং ফি অনেক বেশি। মোট কথা কোচিং ছাড়া আজকাল কোন পাঠ নেই। স্কুলে ও কলেজে যে পাঠদান করা হয় তা কার্যত নামে মাত্র। পরীক্ষায় ভাল ফলের জন্য প্রাথমিক স্কুলে ভর্ত্তির পর হতেই কোচিং শুরু হয়ে যায়। প্রাথমিক পাঠ উত্তীর্ণ হয়ে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির পর বিষয়ভিত্তিক যে কোচিং শুরু হয় তার রেশ চলে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। উচ্চ মাধ্যমিকের পর মেডিক্যাল ও প্রকৌশল পাঠের জন্য নির্ধারিত সময়ের প্যাকেজে যে কোচিং শুরু হয় দেশজুড়ে তার বহু প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছে। হালে প্রতিটি কোচিং সেন্টারের বাহারি ব্রুশিয়ারগুলোতে কে, কবে পাঠ নিয়ে কোথায় ভর্তি হয়েছে তার ফিরিস্তি দেয়া হয়। জেলা শহরগুলোতে কোচিংয়ের সফলতার প্রচার প্যানাপ্লেক্স ইলেকট্রিক পোলের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে ভাল স্কুল ও কলেজে ভর্তি হওয়ার মূল লক্ষ্য হলো সার্টিফিকেটে ডিগনিফায়েড একটি স্কুলে বা কলেজের পরিচিতি থাকা। কয়েক অভিভাবক বললেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের সঙ্গে মা-বাবাকেও পরোক্ষ কোািচং করতে হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে কোচিংয়ে পৌঁছে দেয়া এবং সেখান থেকে আনার দায়িত্ব পালন করতে হয় অভিভাবকদেরই। শিক্ষার্থীদের স্কুল ও কলেজে থেকে বাড়িতে গিয়ে দুইদ- না বসতেই দৌড়াতে হয় কোচিংয়ে। সকাল থেকে শুরু করে স্কুল কলেজ ও কোচিং শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে পাঠে মনোযোগী হতে হয়। এই অবস্থা চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। ভাল শিক্ষার্থীদের অনেক রাত পর্যন্ত পড়ার টেবিলে বসতে হয়। এসব শিক্ষার্থীর শরীরের ক্যালরি পূরণেও ভাল খাবার দিতে হয়। বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থার এই হাল দেখে কয়েক প্রবীণ তাদের কালের কথা স্মৃতি চারণ করলেনÑ গত শতকে ষাটের দশকের প্রথমার্ধে তারা মাধ্যমিক পাস করে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। ১৯৬২ সালের আগে মাধ্যমিক পরীক্ষার পরিচিতি ছিল এন্ট্রান্স পাস। বোর্ড ছিল একটি ঢাকা। এরপর কয়েকটি বোর্ড স্থাপিত হয়। স্কুল ও কলেজে কোচিং বলতে বোঝানো হতো প্রাইভেট পড়ানো। পরীক্ষায় অতিরিক্ত ভাল ফলের (বোর্ডে স্ট্যান্ড লেটার মার্ক স্টার মার্ক প্রথম ডিভিশন) জন্য মেধাবীরা কেউ প্রাইভেট পড়ত। এ ছাড়া স্কুল ও কলেজে শিক্ষকরা ক্লাসে যে পাঠ দিতেন তার ওপর ভিত্তি করে মেধাবী ও মধ্যম গোছের শিক্ষার্থীরা কখনও কোন স্যারের কাছ থেকে কখনও লাইব্রেরীতে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক বই ঘেঁটে নোট লিখে পাঠ্যক্রমকে সমৃদ্ধ করা হতো। গত শতকে ’৭০-এর দশকেও স্কুল ও কলেজে বড় জোর প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়টি ছিল। ’৯০-এর দশকের শুরু থেকে একটু একটু করে সেই যে কোচিংয়ের অধ্যায় শুরু হয়ে গেল তা আর থেমে থাকেনি। দিনে দিনে কোচিংয়ের শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোচিং যেন ‘আবশ্যিক বিষয়’ হয়ে গেছে। একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো- বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থা আপাতত দৃষ্টিতে অনেক উন্নত। নতুন অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী। বিশেষ করে প্রযুক্তি ছাড়া এখন চলার কোন উপায় নেই। মেধার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় না থাকলে প্রজন্মের আগামী দিনে এগিয়ে চলা বেশ কঠিন। তারপরও যে বিষয়টি আসে তা হলো- বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য (ব্যবসা শিক্ষা) বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগে বিষয়ভিত্তিক পাঠ ছাড়া বর্তমানের শিক্ষার্থীরা অন্য কোন বিষয় নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। একটা সময় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক্সট্রা কারিকুলাম এ্যাক্টিভিটিজ দেখা হতো। অর্থাৎ সংস্কৃতির পরিম-লে কার কী অবস্থান তা পরিমাপ করে সেই ভাবেই তাকে গড়ে তোলা হতো। যেমন যে ভাল খেলাধুলা করে, স্পোর্টসে যে ভাল তাকে মাঠে প্রাকটিস করতে হতো। গান, নাটক, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক, গল্প বলা, কল্পনা শক্তির পরীক্ষা (ইমাজিনেশন পাওয়ার) ইত্যাদি বিষয় দেখা হতো। এ জন্য নির্ধারিত ক্লাস রুটিনের শেষে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি স্কুল ও কলেজে খেলার মাঠ ছিল ম্যান্ডেটরি। মাঠ ছাড়া কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বই পড়াকে (যে কোন ধরনের বই) এতটাই উৎসাহিত করা হতো যে ক্লাসের বইয়ের বাইরে কে, কী বই পাঠ করেছে তা শোনা হতো। নবম ও দশম শ্রেণীর ক্লাস শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুনতেন একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি কে, কত বেশি পড়েছে। অনেক সময় যে বেশি বই পড়েছে তার কাছ থেকে তার বিষয় শুনে এবং বিশ্লেষণের ক্ষমতা পরখ করে বাড়তি নম্বর দিতেন। মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রমাণ পেলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার ওপর বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে শিক্ষকদের বলে দিতেন যেন বাড়তি পাঠ দেয়া এবং বাড়তি ব্যবস্থা নেয়া হয়। অনেক সময় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাড়তি ক্লাস নিতেন যাতে তারা ভালভাবে বুঝতে পারে। এভাবেই একটা সময় শিক্ষার্থীরা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে গেছে। বর্তমানে কোচিং ছাড়া যেন কিছুই ভাবতে পারছে না শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: