মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

কক্সবাজারে মানুষ পাচার করে অনেকেই কোটিপতি

প্রকাশিত : ৬ জুলাই ২০১৫
  • শীর্ষ পাচারকারীসহ আটক দুই দালাল

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার থেকে ॥ কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালং এলাকার দিনমজুর ফেরদৌসের বড় পুত্র মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য শীর্ষ দালাল মোঃ আব্দুল্লাহকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাব সদস্যদের হাতে গ্রেফতার হয়ে ওই দালাল এখন বুঝতে পেরেছেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। মানুষ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেলেও আইনের হাত থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। একের পর এক ধরা পড়ছে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারকারী দালাল। ক্ষমতাসীন দলের দাপট দেখিয়ে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ভাঙ্গিয়ে শত শত নিরীহ লোকজনকে বিভিন্ন প্রলোভনে ফেলে সাগরপথে পাচার করেছে মালয়েশিয়ায়। খুনিয়াপালং ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আবদুল্লাহ এক সময় ইলেক্ট্রিকের কাজ করতেন। এজন্য এলাকার লোকজন তাকে বিদ্যুত আব্দুল্লাহ বলে চেনে। বিদ্যুতের কাজ বাদ দিয়ে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার করে বর্তমানে তিনি মানবপাচারকারী চক্রের ডন। এ কাজ করে তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। মানুষ বিক্রিতে অতি লাভ দেখে মানবপাচারের সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অঢেল টাকার মালিক বনেও আইনের হাত থেকে রেহাই পেলেন না বিদ্যুত আব্দুল্লাহ। প্রকাশ্যে কক্সবাজার ও রামু এলাকায় দাপড়ে মোটরসাইকেল হাঁকিয়েছেন এ দালাল। শেষ পর্যন্ত র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে ফাঁন্দে পড়িয়া বগা.... অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবপাচারকারী শীর্ষ দালাল আব্দুল্লাহর। পুঁজিবিহীন মানুষ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক গডফাদারদের অনেকের সঙ্গে এক শ্রেণীর পুলিশ ও বিজিবি সদস্যের সঙ্গে সখ্য থাকায় দালালরা মালয়েশিয়ায় মানবপাচার কাজে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছিল। উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝতে পেরে কক্সবাজার জেলা থেকে শতাধিক পুলিশকে বদলি করে অন্যত্র নিয়ে গেছে। কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ বিক্রি করে অন্তত তিন শতাধিক ব্যক্তি কোটিপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে। এদের মধ্যে গডফাদার রয়েছে প্রায় ৭০ জন। একজন পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত, একজন শামসুল আলম সোহাগ চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে আটক হলেও আরও ৬৮ জন গডফাদার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।

সচেতন মহল জানান, পুলিশের দুর্বল চার্জশীট, সাক্ষীর অভাব আর প্রভাবশালীদের দাপটে বিচার হচ্ছে না মানবপাচারকারী দালালদের। অনেক দালালের বিরুদ্ধে বহু মামলা থাকলেও তারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ধরা পড়লেও অঢেল টাকা খরচ করে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কেউ জামিনে, কেউবা চূড়ান্ত রায়ে বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে অথবা এক শ্রেণীর অসৎ পুলিশ কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে চার্জশীট থেকে শীর্ষ দালালের নাম বাদ পড়ে যাচ্ছে। সোনাপাড়ার রেবি ম্যাডাম, তার স্বামী নুরুল কবির ও অন্যতম গডফাদার সোনাইছড়ির সামসুল আলম সোহাগকে একাধিকবার গ্রেফতার করেও বন্দী রাখা যায়নি কারাগারে। তবে পরক্ষণে চট্টগ্রামে আবারও পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে গডফাদার শামসুল আলম কারাগারে রয়েছে। জামিনে মুক্ত বা বেকসুর খালাস পেয়ে ওই সব দালাল এলাকায় গিয়ে সাক্ষীদের বা পুলিশকে সহযোগিতাকারী ব্যক্তিকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।

জানা গেছে, উখিয়ার সোনাপাড়ার সৌদিয়া হ্যাচারিতে ইলেক্ট্রিকের কাজ করতেন মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে। তার চোখের সম্মুখে মানুষ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা কামাই করে নিচ্ছে দেখে মাথা হট হয়ে যায় আব্দুল্লাহর। মানবপাচার কাজে জড়িয়ে পড়ে তার মামা চিহ্নিত দালাল হামিদুল হক (বর্তমানে কারাগারে) প্রকাশ কালাবার সঙ্গে। মানবপাচার কাজ সহজ করতে ২০০৮ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে নাম লেখান। মানবপাচার কাজের আয় থেকে কিছু টাকা খরচ করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন দালাল বিদ্যুত আব্দুল্লাহ। টাকার জোরে অল্প সময়েই খুনিয়াপালং ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি হয়ে বেপরোয়া হতে শুরু করেন এ দালাল। গড়ে তোলেন মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট। তার গঠিত সিন্ডিকেট থেকে প্রশাসনের নামে প্রতি মাসে অন্তত অর্ধকোটি টাকা চাঁদা হাতিয়ে নিতেন যুবলীগ নেতা মানবপাচারকারী বিদ্যুত আব্দুল্লাহ। তার সিন্ডিকেটে গডফাদার শামসুল আলম সোহাগ (কারাগারে), ফয়েজ সিকদার, রেজিয়া আক্তার প্রকাশ রেবি ম্যাডাম, নুরুল কবির, আবুল কালাম, বেলাল মেম্বার, সানা উল্লাহ ও জালালসহ ১২ জন পাচারকারী সদস্য ছিল। আইনের হাত থেকে পাচারকারীদের বাঁচাতে আব্দুুল্লাহকে কাজে খাটাত সিন্ডিকেট সদস্যরা। ক্ষমতাসীন দলের নেতা এবং সংসদ সদস্যের কাছের লোক বলেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধৃত দালাল আব্দুল্লাহ প্রায়ই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবপাচারকারীদের গঠিত সিন্ডিকেটের কাছ থেকে প্রতি মাসে মোটা দাগের টাকা হাতিয়ে নিয়ে হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে আব্দুল্লাহ বেপরোয়াভাবে জীবনযাপন শুরু করেন। ইজারা নেন হিমছড়ি পার্ক। দখল করা শুরু করেন সরকারী সম্পদ। কমুবনিয়ার সরকারী বনভূমির ১০ একর জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করার জন্য ইট, বালি মজুদ করেছেন। সেখানে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জায়গা কিনেছেন। আগে রিক্সায় চলাফেরা করা দায়, এমন ব্যক্তির ঘরে বর্তমানে তিনটি উচ্চমূল্যের মোটরসাইকেল। এদিকে, ১২ মে সেন্টমার্টিনে ১১৬ জন মালয়েশিয়াগামী যাত্রী উদ্ধারের ঘটনায় কোস্টগার্ড তাকে আসামি করে মামলা দায়ের করে। ওই মামালার তালিকাভুক্ত ৩৪ নম্বর আসামি বিদ্যুত আব্দুুল্লাহ। এছাড়াও তার নামে বিভিন্ন থানায় আরও মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। মানবপাচার মামলা মাথায় নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের দাপট দেখিয়ে চলাফেরা করায় এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন দালাল বিদ্যুত আবদুল্লাহ। তবে তাকে আটক না করার ব্যাপারে রামু থানার কতিপয় কর্মকর্তাকে নিয়মিত উৎকোচ দেয়া হতো বলে জানা গেছে।

প্রকাশিত : ৬ জুলাই ২০১৫

০৬/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: