২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে চিলির ঐতিহাসিক শিরোপা


স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ আরেকবার আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে কোপা আমেরিকা ফুটবলের শিরোপা জিতে নিয়েছে স্বাগতিক চিলি। বাংলাদেশ সময় রবিবার ভোরে চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোর এস্টাডিও ন্যাসিওনালে অনুষ্ঠিত ৪৪তম আসরের ফাইনাল ম্যাচে চিলি টাইব্রেকারে ৪-১ গোলে পরাজিত করে চৌদ্দবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য থাকার পর পেনাল্টি শূটআউটে শেষ হাসি হাসে চিলি।

চিলির ইতিহাসে এটি প্রথম কোপা আমেরিকা কাপের শিরোপা। শুধু তাই নয়, দেশটির ইতিহাসে এটি প্রথম কোন বড় শিরোপা জয়। অন্যদিকে ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর এক বছরের ব্যবধানে আরও একটি ফাইনালে হারের তেতো স্বাদ পেল লিওনেল মেসির দল। এই হারে কোপায় সর্বোচ্চ ১৫ শিরোপা জয়ের উরুগুয়ের রেকর্ডেও ভাগ বসাতে ব্যর্থ হলো জেরার্ডো মার্টিনোর দল। সেই সঙ্গে ১৯৯৩ সালের পর শিরোপা জয়ের স্বপ্নও পূরণ হলো না আর্জেন্টিনার। নিজেদের ইতিহাসে প্রথম শিরোপা জয়ের পর উৎসবে ভাসছে চিলি। রাজধানীসহ দেশের ভক্ত-সমর্থকরা জাতীয় পতাকা নিয়ে উৎসব আনন্দ করে চলেছে।

শ্রেয়তর দল হিসেবেই কোপার শ্রেষ্ঠত্ব নিজেদের করেছে চিলি। ফাইনালে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আধিপত্য বিস্তার করে খেলে স্বাগতিকরা। বিশেষ করে ম্যাচের ২৯ মিনিটে এ্যাটাকিং মিডফিল্ডার এ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে গেলে আর্জেন্টিনা বিপাকে পড়ে। তখন থেকেই মেসি বাহিনীর শারীরিক ভঙ্গিমা কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ে! নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের খেলায় আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের হতাশা স্পষ্ট ভেসে উঠে। আর পেনাল্টি শূটআউটের আগ মুহূর্তে মার্র্টিনোর শিষ্যদের রীতিমতো বিধ্বস্ত, ক্লান্ত মনে হয়। এ সময় চিলির ফুটবলারদের চিত্র ছিল ঠিক উল্টো। তারা যেন শিরোপা জয় করে নিয়েছে এমন একটা পরিবেশ বিরাজ করছিল! শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের আগের এই দৃশ্যই মঞ্চায়িত হয়। চিলির ফুটবলাররা শতভাগ সফল হন, আর শুধু মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনার সবাই ব্যর্থ। যে কারণে আরেকবার চোখের পানি সঙ্গী হয়েছে দিয়াগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরিদের।

চিলির হয়ে জয়সূচক স্পট কিকটি নিয়েছিলেন ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা আর্সেনাল স্ট্রাইকার এ্যালেক্সিস সানচেজ। প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরোকে বোকা বানিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৪৫ হজারেরও বেশি দর্শক বাধভাঙ্গা উল্লাসে ফেটে পড়ে। টাইব্রেকারের প্রথম শটে চিলির মাটিয়াস ফার্নান্ডেস জোরালো শটে গোল করেন। আর্জেন্টিনার প্রথম শট নেন অধিনায়ক মেসি। ডানদিক দিয়ে নিচু শটে বল জালে জড়ান তিনি। আর্টুরো ভিদালের দ্বিতীয় শটে হাত লাগিয়েও ফেরাতে পারেননি আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক রোমেরো। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় শট হিগুয়াইন অবিশ্বাস্যভাবে বার পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে মারেন। চিলির চার্লস আরানগুইজ তৃতীয় শট থেকে সহজেই গোল করেন। আর আর্জেন্টিনার এভার বানেগার দুর্বল শট চিলি গোলরক্ষক ক্লাউডিও ব্রাভো সহজেই রুখে দেন। আর্জেন্টিনা টানা দুই শট থেকে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় চিলির সামনে সুযোগ আসে চতুর্থ শটেই গোল করে শিরোপা জয়ের। রোমারোকে বোকা বানিয়ে সেই কাজটি অবলীলায় করেন সানচেজ।

শিরোপা জিততে না পারার বেদনায় ‘পাথর’ বনে যান মেসিরা! ১৯৯৩ সালের পর কোপার শিরোপা জেতেনি তারা। ২০০৪ ও ২০০৭ সালে ফাইনালে উঠলেও হারতে হয়েছিল তাদের। এবারও তাই হলো। ফলে এ আসরে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে শিরোপাহীন দলটির শিরোপা জেতার প্রতীক্ষা প্রলম্বিত হলো আরও। ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়ার পর বড় কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দুভার্গ্যজনকভাবে আবারও পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ পেতে হলো তাদের।

এ জয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে একটি পুরনো হিসেবও চুকিয়ে ফেলল চিলি। ১৯৫৫ সালে নিজ মাটিতে এ আসরের (তখন আসরটির নাম ছিল সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ) ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে অশ্রুজলে বুক ভাসাতে হয়েছিল চিলিকে। ৬০ বছর পর সেই মাটিতে সেই একই প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়ের পর আবারও কাঁদল তারা। তবে এবার সে কান্না জয়ের! একেই বলে ‘ঐতিহাসিক প্রতিশোধ।’ পাঁচবার ফাইনাল খেলে এটা চিলির প্রথম কোপা শিরোপা। রানার্সআপ হয় ১৯৫৫, ৫৬, ৭৯ ও ৮৭ সালে। আর রেকর্ড ২৭ বার ফাইনাল খেলে ও ১৪ বার শিরোপা জিতে কোপায় এ নিয়ে দ্বাদশবারের মতো রানার্সআপ হলো আর্জেন্টিনা। দু’দলের মধ্যে এটা ছিল ৮১তম সাক্ষাত। চিলির জয় ৭ ম্যাচে (আর্জেন্টিনা জেতে ৫৩ ম্যাচে, ড্র ২১ ম্যাচ)। আর কোপায় এটা ছিল দু’দলের ২৫তম দ্বৈরথ। মজার বিষয় হচ্ছে, আর্জেন্টিনা ১৮ ম্যাচে জিতলেও এবারই প্রথম জয় পেল চিলি (বাকি ৬ ম্যাচ ড্র হয়)! ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনা ৩ এবং চিলি ১৯ নম্বরে। হেড টু হেড পরিসংখ্যানেও স্পষ্টই এগিয়ে ফেবারিট আর্জেন্টিনা। অথচ ফাইনালে দেখা যায় অন্য চিত্র। আক্রমণে, আধিপত্যে, বল নিয়ন্ত্রণে সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল চিলিয়ানরা। বলের নিয়ন্ত্রণ তাদের ছিল ৫৭ শতাংশ। তাদের খেলা ছিল পরিকল্পিত, গোছালো ও আক্রমণাত্মক। নিজেদের মাঠে পরিপূর্ণ দর্শক সমর্থন নিয়ে খেলেছেও তারা বীরের মতো। পক্ষান্তরে আর্জেন্টিনার খেলা ছিল এলোমেলো, রক্ষণাত্মক, বিরক্তিকর এবং কাউন্টার এ্যাটাকনির্ভর। তাদের মাঝমাঠের দুর্বলতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দলের প্রাণভোমরা মেসি ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ! যে কারণে আরেকবার ফাইনালে হারের জ্বালায় জ্বলতে হয়েছে তাদের।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: