মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২২.৮ °C
 
২৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৬ বৈশাখ ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বিপন্ন জামদানি শিল্প

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫

বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত জামদানি আমাদের গর্ব, আমাদের অহঙ্কার। এ দেশের তাঁতীদের অসামান্য দক্ষতা এবং নিপুণতায় শতশত বছর ধরে তৈরি কারুকার্যময় জামদানি বিশেষ করে ঢাকাইয়া জামদানির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। মোগল আমলের আগ থেকেই জামদানি তৈরি করা হলেও এদের পৃষ্ঠপোষকতায় জামদানি শাড়ির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ঢাকাইয়া জামদানি সবার কাছে হয়ে ওঠে সমাদৃত ও জনপ্রিয়। ঢাকাইয়া জামদানি হিসেবে পরিচিত হলেও এর বিস্তরণ বেশি ঘটে ঢাকার অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও, কাপাসিয়া, রূপগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জে। এর মধ্যে আবার রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো ইউনিয়নের চৌদ্দটি গ্রামে ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্প মূলত কেন্দ্রীভূত। এ অঞ্চলে জামদানি শিল্পের বিকাশের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সূক্ষ্ম তুলা এ অঞ্চলে উৎপাদিত হত, যা জামদানি তথা মসলিনের জন্য আদর্শ। শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে ধোলাইয়ের আগে সুতা পরিষ্কার করলে যে চকচকে ভাব আসে, তা অন্য কোথাও সম্ভব নয় বিধায় এ অঞ্চল ঘিরে জামদানির প্রসার ঘটেছে। মোদ্দা কথা, শীতলক্ষ্যার জলবায়ু আর নদীর পানির অদ্ভুত রসায়নেই দৃষ্টিনন্দন জামদানির অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া যাতায়াত সুবিধা, কাঁচামালের সুবিধা বিশেষ করে মাকু, শানের পর্যাপ্ততাও জামদানির বিস্তরণের অন্যতম কারণ। কিন্তু আজ রূপগঞ্জের জামদানি মৃতপ্রায় হয়ে কোনমতে টিকে আছে।

জামদানি নিয়ে কিছু তথ্য

বাংলাদেশী নারীদের জনপ্রিয় শাড়ি জামদানি। বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীরা এই শাড়ি পরতে ভালবাসেন। অনেকে আবার একে মনে করে আভিজাত্য প্রকাশের মাধ্যম। বিচিত্র নক্সা ও চাকচিক্যের কারণে নারীদের কাছে এ শাড়ির কদর বেশি। নক্সার ঐশ্বর্য, কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে জামদানি বাংলাদেশী পণ্য হিসেবে বিকশিত হয়েছে কয়েক শতক ধরেই। জামদানি তৈরিতে তুলা, জরি, রং, মাকু, শানা ইত্যাদি কাঁচামালের প্রয়োজন। একটা সময় পর্যন্ত এই কাঁচামালগুলোর পর্যাপ্ততা থাকায় রূপগঞ্জে এ শিল্প বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু এখন অধিকাংশ কাঁচামালই আমদানি করতে হয়। এতে দামও বেড়ে গেছে। তবে জামদানির দাম সময়ের ওপরই বেশি নির্ভর করে। তিন চার হাজার টাকার শাড়ির কাঁচামাল বাবদ যেখানে খরচ পড়ে আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ টাকা, সেখানে পঞ্চাশ টাকার শাড়ির কাঁচামাল বাবদ খরচ পড়ে আট শ’ থেকে এক হাজার টাকা। তবে তিন চার হাজার টাকার শাড়ির পেছনে যেখানে ওস্তাদ ও সাগরেদকে দুই তিন দিন সময় দিতে হয়, সেখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা দামের শাড়িতে সময় দিতে হয় তিন থেকে চার মাস।

জামদানি শিল্প নগরী

জামদানি শিল্প নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ঐতিহ্য হারাতে বসায় এ থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ১৯৯২-৯৩ সালে ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের সারপত্র প্রণয়ন করে। প্রাথমিকভাবে বিশ একর জমি নিয়ে নগরী গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয় যার মধ্যে তাঁতীদের প্লট, বিপণন কেন্দ্র, ডাইং সেন্টার, হাট, মসজিদ, প্রাথমিক বিদ্যালয় ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। সারপত্র প্রণয়নের পর সন্দেহ ছিল তাঁতীরা তাদের পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে শিল্পনগরীতে আসবে কিনা। প্রাথমিক জরিপের মাধ্যেমে দূর হয়ে যায় সেই সন্দেহ। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে বিসিক জামদানি শিল্পনগরী বিশেষায়িত শিল্প হিসেবে। এটি দেশের একমাত্র জামদানি শিল্পনগরী। তাই এ নিয়ে তাঁতী ও তৎসংশ্লিষ্ট মানুষের মাঝে বেশ উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু অল্পকিছু দিনের মধ্যে ভাটা পড়ে যায় তাদের সেই উৎসাহে। কারণ শিল্পনগরী যে উদ্দেশ্যে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে অনেক দূরে সরে যায়। এখন জামদানি শিল্পনগরী যেন টিকে আছে নামেমাত্র।

শুধু নামেই গবেষণা কেন্দ্র

শিল্পনগরীতে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল নিত্যনতুন নক্সা, পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য। গবেষণার মাধ্যেমে জামদানির উন্নয়ন ঘটিয়ে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, এ পর্যন্ত কোন ধরনের গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। গবেষণা কেন্দ্র বিল্ডিংটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে সৃষ্টিলগ্ন থেকেই। বিসিক শুধু প্লট বরাদ্দ দিয়েই যেন তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে। এই বিষয়ে বিসিক শিল্পনগরীর ইনচার্জ মামুনুর রশিদ বলেন, আগে কেন গবেষণা কেন্দ্র চালু করা হয়নি, তা বলতে পারব না। কিন্তু এখন সম্ভব হচ্ছে না অর্থাভাবে। আগে প্রকল্প ছিল, কিন্তু ২০১০ সালে তা রাজস্ব খাতে চলে আসায় প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এ খাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না। তবে এখন চেষ্টা করা হচ্ছে যেন গবেষণা কেন্দ্রটি চালু করে জামদানি শিল্পের মানোন্নয়ন করা যায়।

প্লট বরাদ্দ ও অপব্যবহার

শিল্পনগরীতে ৪১২টি তাঁতী পরিবারকে প্লট দেয়া হয়। মূলত দরিদ্র তাঁতীদের কথা বিবেচনা করে এই শিল্পনগরী গড়ে উঠলেও এখানে বেশিরভাগ প্লটই হাতিয়ে নিয়েছে মহাজন শ্রেণী। অল্প কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ দরিদ্র তাঁতীরা মহাজনী শ্রেণীর প্রভাবে প্লট থেকে বঞ্চিত হয়। প্লটগুলোর সুবিধা ছিল ৬০% সরকারী অনুদান এবং ৪০% সুদমুক্ত ঋণ। এ সুবিধার জন্যই মহাজন শ্রেণী তাদের করায়ত্ত করে নেয় প্লটগুলো। প্রতিটি প্লটের একপাশে দশটি তাঁত বসানোর মতো জায়গা দেয়া হয় এবং আরেক পাশে তাঁতী পরিবারের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। উদ্দেশ্য পারিবারিক কুটির শিল্পের মধ্য দিয়ে জামদানির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা গেল, কোন কোন প্লটে মাত্র একটি কিংবা দুটি তাঁত বসানো হয়েছে। কোথাও আবার কোন তাঁতই নেই। মেস ভাড়া দেয়া হয়েছে কিংবা ব্যবহার করা হচ্ছে অন্য কোন কাজে। এ বিষয়ে তাঁত শ্রমিকদের সভাপতি আনিসুজ্জামান খোকনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি তাঁত বসাতে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ পড়ে। মহাজনদের অনেক টাকা আছে, তাই তারা নিয়ম অনুযায়ী দশটি তাঁত বসাতে পারছেন, কিন্তু যে অল্প কয়েকজন গরিব তাঁতীদের প্লট দেয়া হয়েছে, তাদের টাকা নেই তাই তারা এক দুটির বেশি তাঁত বসাতে পারেনি। অনেকে প্লট কিনে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। বিসিক যে অবৈধ হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না তা নয়। ইতোমধ্যে ৬৪টি প্লট বাতিল করা হয়েছে অবৈধ হস্তান্তর এবং তাঁত না থাকায়। কিন্তু অবৈধ হস্তান্তর ও অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়নি।

কমছে তাঁতীর সংখ্যা

রূপগঞ্জের গ্রামগুলোতে এখন প্রায় হাজার দেড়েক তাঁতী পরিবার আছে। তবে এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ। পরিসংখ্যানের অভাবে এর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা যায়নি। কিন্তু ক্রমান্বয়ে এ সংখ্যা কমছে। জামদানি শিল্প নগরীতে আছেন চার শতাধিক তাঁতী পরিবার। কথা হয় তাঁতী আজিজুর রহমানের সঙ্গে। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন জামদানি তৈরির কাজ। আবার তার বড় ভাই শিখেছিল বাপের কাছ থেকে। এভাবে বংশ পরম্পরায় তাঁতের কাজ শেখানো চলে এলেও আজিজ নিজের ছেলে মেয়েদের এ পেশায় আনেননি। এ পেশায় অন্যান্য পেশা থেকে টাকা কম বলে আজিজের মতো অন্য তাঁতীরাও নিজেদের ছেলে মেয়েদের অন্য পেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এতে তাদের মনে কষ্ট হচ্ছে, তবু জীবনের তাগিদেই তারা বাপ-দাদার পেশা থেকে ছেলেমেয়েদের দূরে রাখছেন। এতে সাগরেদ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ছে। সাগরেদ বেলালের সঙ্গে কথা হলো। সে একবছর হলো ওস্তাদের কাছে কাজ শিখছে। খাওয়া পরা আর প্রতিদিন বিশ টাকা হাত খরচ পায় সে। আরও একবছর কাজ শিখতে পারলে সে মজুরি পাওয়া শুরু করবে। বেলালের কাছ থেকেই জানা যায়, সাগরেদদের মজুরি সপ্তাহ হিসেবে হয়। প্রতিসপ্তাহে এক হাজার টাকা করে মজুরি। অর্থাৎ মাসে চার হাজার টাকা। অথচ যে কেউ গার্মেন্টস কিংবা চায়ের দোকান দিলেও এর থেকে অনেক বেশি টাকা আয় করতে পারে। বেলালের সঙ্গে কাজ শিখতে এসেছিল তারই দোস্ত জসিম যে মাত্র তিন মাস কাজ শিখে গার্মেন্টেসে চলে গেছে বেশি বেতন, ওভারটাইমের আশায়। জসিমের মতো অনেকেই নিম্ন মজুরির কারণে এখন বেশির ভাগই এ পেশা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত শঙ্কার।

হতাশ তাঁতীরা

জামদানির শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে দুঃখ, বেদনা আর বঞ্চনার ইতিহাস। অসহায়-অশিক্ষিত দরিদ্র জামদানি কারিগরদের দুঃখময় জীবনের গল্প রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাঁতী করিমের কথা থেকেই বোঝা যায় তাদের জীবনের অসীম দুঃখগাথা। আজ চল্লিশ বছর ধরে বাহারী নক্সার জামদানি বানিয়ে চলছেন তিনি। কিন্তু এ পর্যন্ত নিজের স্ত্রীকে একটিও জামদানি পরাতে পারেননি। এ শুধু আপসোস, এ যন্ত্রণাদায়ক সত্য। জামদানি তৈরির ওস্তাদ সালামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি তাঁতে দুজন শ্রমিক লাগে। ওস্তাদ ও সাগরেদ মিলে তৈরি করে জামদানি শাড়ি। যদি কোন শাড়ির দাম পাঁচ হাজার টাকা হয়, তবে দুই হাজার টাকা করে ওস্তাদ ও মহাজন ভাগ করে নেয় আর সাগরেদ পায় এক হাজার টাকা। এই দামের শাড়ি মাসে ৫-৬টির বেশি করা সম্ভব হয় না। ফলে দেখা যায়, ত্রিশ চল্লিশ বছর ধরে কাজ করার পরও একজন ওস্তাদ মাসে দশ-বারো হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারে না। এই স্বল্প আয় দিয়ে সংসার চালানো দুঃসহ তাদের জন্য। কথা হলো জামদানি শিল্পী সিরাজের সঙ্গে। সুতা, জরি, রং, সাগরেদের বেতন দেয়ার পর শাড়ি বিক্রি করে নিজের পরিশ্রমের টাকাই অনেক সময় ওঠে না বলে জানালেন তিনি। এ কাজ ছাড়া আর কিছু শিখেনি বলে তিনি এ পেশা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারছেন না। পরিবার পরিজন নিয়ে অতি কষ্টে পার করছেন জীবন। তাঁতীদের তাঁতই জীবন। অথচ মূলধনের অভাবে অনেক তাঁতীই বসাতে পারছে না তাঁত। আশা, প্রশিকাসহ বিভিন্ন এনজিও থেকে অনেকে তাঁতের জন্য ঋণ নিলেও কিস্তি হয়ে উঠেছে তাদের গলার কাঁটা।

মহাজনী প্রথার দাপট

জামদানি শিল্পকে পুরো গ্রাস করে ফেলেছে মহাজনী প্রথা। দরিদ্রপীড়িত তাঁতীরা বুকের রক্ত পানি করে যে জামদানি তৈরি করছেন, তার সুফল ভোগ করছেন টাকাপয়সাওয়ালা মহাজনরা। পিঁপড়ে খাচ্ছে লাভের গুড়ের মতো অবস্থা। অসচ্ছল তাঁতীদের শুষে নিচ্ছে মহাজনরা। জামদানি শিল্পনগরী গড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মহাজনী প্রথা বিলোপ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, অধিকাংশ প্লটই বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল মহাজনদের। প্রতিবছর যে জামদানি মেলা হয় শাহবাগে, সেখানে হতদরিদ্র তাঁতীরা অংশগ্রহণ করতে পারেন না। মহাজনদের টাকার দাপটে তাদের সবসময় হাটের ওপরই নির্ভর করতে হয়। সর্বদা থাকতে হয় প্রান্তিক তাঁতী হিসেবেই। সুমী জামদানি হাউসের কর্ণধার আবুল হাসেম মেলায় কমপক্ষে দশ থেকে বারো লাখ টাকার শাড়ি বিক্রি করেন। মেলায় স্টলের জন্য মহাজনদের বেশ পাল্লা দিতে হয় জানালেন তিনি। অন্যদিকে দরিদ্র তাঁতী আজিজ মিয়ার বহুদিনের স্বপ্ন মেলায় একটি স্টল দিবেন, কিন্তু টাকার অভাবে তিনি পারেন না। এতে মনে হয়, বিসিক মহাজনদেরই সেবা দিয়ে যাচ্ছে, দরিদ্র তাঁতীদের নয়।

জামদানি হাট ও মেলা

রূপগঞ্জের জামদানি পল্লীতে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে হাট শুরু হয়ে শেষ হয় শুক্রবার সকালে। সারা নারায়ণগঞ্জের জামদানি তাঁতীদের মিলনমেলা যেন এই হাট। ছোট ছোট টুকরিতে করে জামদানি সাজিয়ে বসে দরিদ্র্য তাঁতীরা। আর মহাজনরা বসে বান্ডিল বান্ডিল শাড়ি সাজিয়ে। সারাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা আসে এখান থেকে জামদানি শাড়ি কিনতে। অতি স্বল্পদামে তারা এখান থেকে শাড়ি কিনে নিয়ে যায়। যে শাড়ি ঢাকার কোন শপিং সেন্টারে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়, তা হাটে পাওয়া যায় মাত্র বারো থেকে তেরো হাজার টাকায়। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে জামদানি শাড়ি ক্রেতারা প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনতে বাধ্য হন। হাট ছাড়াও প্রতিবছর জামদানি মেলার আয়োজন করে বিসিক। করার মধ্যে এটুকুই করে বিসিক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছাড়াও পাকিস্তান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মেলার আয়োজন করা হয়। শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া মেলা চলবে ১০ জুলাই পর্যন্ত। এ মেলা রাজধানীবাসীর কাছে বেশ কিছু বছর ধরেই বেশ সাড়া পাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বৃদ্ধি এবং আয় বৃদ্ধির কারণে এবারের মেলায় আগের তুলনায় বেশি ক্রেতা সমাগম হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন মেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মামুনুর রশীদ।

সমস্যার মাঝেও সম্ভাবনা

জামদানি শিল্প ঘিরে আজ ঘোর অমানিশা। তাঁতীরা ভাল নেই। তাই ভাল নেই এ শিল্প। এমনিতেই জামদানি শিল্প পড়তির দিকে, তন্মেধ্য যেভাবে ফ্যাশনের পরিবর্তন ঘটছে, আগামী দিনেও যে এর চাহিদা থাকবে তা বলা যায় না। তাঁতীদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত। তারা বাপ-দাদার কাছ থেকে যে নকশা শিখেছে, তাই করে যাচ্ছে। নতুন কোন নকশা তারা জানে না। ফলে নতুন নতুন ক্রেতা তৈরি হচ্ছে না। ভারতীয় শাড়ীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অথচ তাঁতীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে নতুন নতুন নকশা শেখানো হলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এই শিল্পকে ঘিরে রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি শাড়ি রফতানি হচ্ছে। প্রতিবছর জামদানি শিল্প এলাকা থেকে ৫০-৬০ কোটি টাকার জামদানি শাড়ি রফতানি করা হয়। উপযুক্ত প্রণোদনা পেলে আরও বেশি রফতানি করা সম্ভব। কিন্তু এ জন্য চাই সরকারের সদিচ্ছা।

arspatuary@gmail.com

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫

০৫/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: