মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২২.৮ °C
 
৩০ মে ২০১৭, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

গ্রেফতারের ভয়ে ফেরার ইচ্ছে নেই তারেকের

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫
  • খালেদাও চাচ্ছেন বিদেশে থাক

শরীফুল ইসলাম ॥ পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় দেশে আসার ইচ্ছা নেই খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। মূলত গ্রেফতারের ভয়েই তিনি দেশে আসতে চাচ্ছেন না। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও চাচ্ছেন আপাতত তারেক রহমান বিদেশেই থাকুক। অথচ টানা অবরোধ কর্মসূচী চলাকালেও বিএনপি নেতারা হাকডাক দিয়ে বলতেন শীঘ্রই তারেক রহমান দেশে ফিরে বিএনপির হাল ধরছেন। জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টসহ বেশ কটি মামলায় লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তাই দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গ্রেফতার হবেন এমন চিন্তা মাথায় আছে তারেক রহমানের। এছাড়া শুধু গ্রেফতার নয় ওয়ান-ইলেভেনের মতো আবারও তার ওপর নির্যাতনের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন নেতারা মনে করছেন।

সম্প্রতি লন্ডন সফর করে এসেছেন তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট এমন একটি সূত্র জানিয়েছেন, সরকারবিরোধী টানা আন্দোলন শুরুর পর এ আন্দোলন সফল হবে মনে করে তারেক রহমান নিজেই দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। এ কারণেই তখন তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন তরুণ নেতারাসহ দলের বেশ কজন সিনিয়র নেতাও বলতে শুরু করেছিলেন শীঘ্রই তারেক রহমান দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়ায় এখন তারেক রহমান নিজেই আর দেশে ফিরে আসতে চাচ্ছেন না। তবে তিনি লন্ডনে বসে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। এর মাধ্যমে যদি কখনও অনুকূল পরিবেশ মনে করেন তখনই তিনি দেশে ফিরে আসবেন।

জানা যায়, তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন নেতারা চাচ্ছেন যে কোন উপায়ে তারেক রহমান দেশে ফিরে আসুক। এমনকি দেশে এসে তারেক রহমান কারাগারে থাকলেও তাদের আপত্তি নেই। কারণ. কারাগারে থাকলেও তারা সময় সময় তারেক রহমানকে দেখতে পাবেন এবং দলীয় কর্মকা-ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাবেন। এছাড়া কারাগারে থেকেও তার সহযোগীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে পারবেন। কিন্তু দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা চান না তারেক রহমান দেশে ফিরে আবার দলীয় কর্মকা-ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করুক।

এদিকে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজনরা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যত চেষ্টাই করুক বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া তাতে কিছুতেই সায় দিচ্ছেন না। খালেদা জিয়ার যুক্তি হচ্ছে বিএনপিকে বেকায়দায় রাখতে বর্তমান সরকার একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বেশ কটি মামলায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে। তাই তারেক রহমান এখন দেশে ফিরে এলে তাকে মামলায় ফাসিয়ে কারাগারে নিক্ষেপের পাশাপাশি নানান অপপ্রচার চালিয়ে তার ইমেজ নষ্ট করা করা হবে। আর এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গেলে দলের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দলকে আরও নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে। তার চেয়ে লন্ডনে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আরামেই থাকতে পারছে তারেক রহমান। তাই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে খালেদা জিয়া নারাজ।

জানা যায়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বছর ৫ জানুয়ারি থেকে যে টানা অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল পালন করে বিএনপি তা তারেক রহমানের ‘প্রেসক্রিপশন’ অনুসারেই করা হয়। তারেক রহমান আন্দোলনের ছক এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যে, সরকার শক্ত মনোবল নিয়ে এগিয়ে না গেলে এ আন্দোলনের সফলতা অর্জন করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব হতো। আর আন্দোলন সফল হলে সরকারকে নড়বড়ে অবস্থায় রেখে আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের দাবিও আদায় করা সম্ভব হতো। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসতেন। কিন্তু যে ছক নিয়ে তারা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা ব্যর্থ হয়। সেই সঙ্গে বিএনপি হাইকমান্ডের আশার গুড়ে বালি পড়ে।

সূত্র মতে, দল গোছানোর জন্য বিএনপি যতবারই জাতীয় কাউন্সিল করার উদ্যোগ নিয়েছে ততবারই তারেক রহমান দেশে ফিরে আসতে পারবে কিনা- এ বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। যখন দেখা গেছে তারেক রহমান দেশে ফিরে জাতীয় কাউন্সিলে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না তখনই কাউন্সিল করা থেকে পিছু হটেছে বিএনপি।

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে প্রতি ৩ বছর পর পর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাউন্সিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুসারে ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর ৩ বছর সময় শেষ হয়ে গেছে। তবে বিএনপি এ যাবত কয়েকবার নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে জাতীয় কাউন্সিল করার জন্য সময় বাড়িয়ে নিয়েছে। জানা যায় তারেক রহমান দেশে ফিরতে না পারলে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলও অনিশ্চিত।

লন্ডনে অবস্থান করে দেশের ইতিহাস ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মহল থেকে বেশ কটি মামলার আসামি তারেককে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করার দাবি জোরালো হয়। তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার দাবি করে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। সরকারের এ অবস্থান দেখে তারেক রহমানও দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে আগ্রহ হারান। আর খালেদা জিয়াও চান না এখন দেশে ফিরে তার ছেলে কারাবরণ করুক। তবে ৮ জুলাই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সৌদি আরব যাওয়ার কথা রয়েছে। তখন তারেক রহমানও লন্ডন থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৌদি আরব আসবেন। তাই মা-ছেলের সাক্ষাতের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা-না ফেরার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র মতে, তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টিও আপাতত তার দেশে ফিরে না আসার একটি কারণ। চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার পর তারেক ২০০৮ সালে সর্বশেষ পাসপোর্ট নবায়ন করেন। ওই পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয় ২০১৩ সালে। পাসপোর্ট নবায়নে জটিলতা দেখা দেয়ায় চলতি বছর তারেক রহমান লন্ডনে বসবাসের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় চান। আর এই রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ায় কারণে তারেক রহমান চাইলেও যুক্তরাজ্য সরকার তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না যুক্তরাজ্যের আদালত তার নিরাপত্তার বিষয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হবেন ততক্ষণ তারেককে দেশে ফেরত পাঠাবে না।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমান যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। প্রায় দেড় বছর কারাবরণের পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান তিনি। এর পর ১১ সেপ্টেম্বর তার মা খালেদা জিয়া জেল থেকে মুক্তি পেলেও তার সঙ্গে দেখা হয়নি তারেক রহমানের। কারণ সেদিনই চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে যান তারেক রহমান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির পর থেকেই বিএনপিতে তারেক রহমানের অনুপস্থিতি জোরেশোরে আলোচনায় আসে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, তারেক রহমান এখনও অসুস্থ। তিনি লন্ডনে অবস্থান করে উন্নত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হলেই তিনি দেশে ফিরে আসবেন। দলের কোন কোন নেতা তারেক রহমানকে শীঘ্রই দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে থাকেন তার প্রতি অতিরিক্ত ভালভাসার টানে। কিন্তু সুস্থ না হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসবেন না এটাই বাস্তব। তবে তিনি যখন পরিস্থিতি অনুকূল মনে করেন তখনই হয়ত দেশে ফিরে আসবেন।

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫

০৫/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: