২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে ॥ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ঢাকা


স্টাফ রিপোর্টার ॥ পর্যাপ্ত স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজের ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকা শহরের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এছাড়া রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও ভারিবর্ষণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির ফলে ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে স্যুয়ারেজের বর্জ্য মিশে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। রাজধানীতে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ার বিষয়টি মাথায় রেখে পয়ঃবর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে না। জনঘনত্ব বিবেচনায় মাস্টারপ্ল্যানের অভাব, ত্রুটিযুক্ত ডিজাইন ও বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে মহানগরীর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থায় মহাবিপর্যয় ধেয়ে আসছে।

শনিবার পরিবেশ সংগঠন পবা আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা এ মন্তব্য করেছেন। রাজধানীর কলাবাগানে সংগঠনের কার্যালয়ে রাজধানীর স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এম এম সফিউল্লাহ, পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোঃ আবদুস সোবহান, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ প্রমুখ। আলোচনা সভায় বক্তারা ড্রেনেজ ব্যবস্থার এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণে গ্যাস, বিদ্যুত, স্যুয়ারেজ ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ ভৌত অবকাঠামোর ত্রিমাত্রিক নক্সা করে তার ভিত্তিতে জনঘনত্ব, এলাকার পরিধি ও স্লুপ বিবেচনায় ড্রেনেজ ও পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করার আহ্বান জানান।

তারা বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন ১৩ লক্ষ ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য তৈরি হচ্ছে। যার মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন পাগলা পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগারের মাধ্যমে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি ১২ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানির গুণগত মানের অবনতি হচ্ছে। অতি দূষণে নদীর মাছ ও জলজ প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও গৃহস্থালী কাজে নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। জীবাণুজনিত দূষণে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে। রাস্তাঘাট, স্যুয়ারেজ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিদ্যুত ও পানির লাইনসহ বিভিন্ন সেবাসমূহের অবকাঠামো তৈরি ও মেরামতে সরকার জনগণের টাকা ব্যয় করছে। কিন্তু এ কাজে যে পরিমাণ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে সে তুলনায় গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল হিসেবে নগণ্য পরিমাণ আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যয় হিসাবে সরকার ভর্তুকি দিলেও ভর্তুকি বন্টনে বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে।

আলোচন সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন জনঘনত্ব বিবেচনায় মাস্টারপ্ল্যানের অভাব, ত্রুটিযুক্ত ডিজাইন ও বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে মহানগরীর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থায় মহাবিপর্যয় ধেয়ে আসছে। অপরিকল্পিতভাবে ইমারত নির্মাণ চলছেই। অথচ জনঘনত্বের সঙ্গে স্যুয়ারেজের সম্পর্ক রয়েছে। স্যুয়ারেজ, ড্রেনেজ লাইনসহ বিদ্যুত গ্যাসের নতুন সংযোগ প্রদান ও মেরামতের জন্য সারাবছরই বিশেষ করে বর্ষাকালে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকে। সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায় এবং ভারিবর্ষণে শহরের অধিকাংশ এলাকা জলাবদ্ধতায় প্রায় অচল হয়ে যায়। ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে স্যুয়ারেজের বর্জ্য মিশে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাছাড়া অপ্রতুল পয়ঃবর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

তারা বলেন, বিদ্যমান স্যুয়ারেজ সিস্টেমের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও অপরিকল্পিতভাবে নিত্যনতুন বাসাবাড়ির বর্জ্যরে সংযোগ দেয়া হচ্ছে। ধারণক্ষমতা বিবেচনা না করে নতুন নতুন সংযোগের ফলে অধিকাংশ সময়ই আগের ড্রেনের সঙ্গে নতুন লাইনের সংযোগ ম্যাচ করে না। নতুন সংযোগ বা বিদ্যমান লাইন মেরামতের সময় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে বর্জ্য রাস্তায়ই ফেলে রাখা হচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ধুলা আর বর্ষাকালে কাদা জমে জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। অথচ এ দুর্বিষহ অবস্থা বাড়ছে বিবেচনাহীন প্রকল্প ও পরিকল্পনার প্রত্যক্ষ ফসল। এ অবস্থায় পরিবেশ সংগঠন পবার পক্ষ থেকে পানি ও পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের বাঁধাসমূহ দূর করতে ড্রেনের মুখসহ ড্রেন ভালভাবে পরিষ্কার রাখাসহ বিভিন্ন সুপারিশমালা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয় পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন না করে নদী, খাল, বিল বা জলাধারে ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে পয়ঃবর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন কোন আবাসিক এলাকা করার সময় তাদের নিজস্ব পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নতুন আবাসিক প্রকল্পসমূহে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই অনুমোদন দিতে হবে। প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা হিসেবে ঢাকার খাল, নদী, জলাধারগুলো উদ্ধার করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বৃষ্টির পানি ধারণের ব্যবস্থা রেখে গৃহায়ন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা। সেই অনুসারে ইমারত নির্মাণ নীতিমালাসহ অন্যান্য নীতিমালা ও আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা।