১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

চীন-মধ্যপ্রাচ্য আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে


চীন ও আরব বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে বাণিজ্য। গত এক দশকে এই বাণিজ্য ৬শ’ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৪ সালে ২৩ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাহরাইন, মিসর, ইরান ও সৌদি আরব। সবাই অন্য যে কোন দেশের চেয়ে চীন থেকেই বেশি পণ্য আমদানি করছে। আবার ইরান, ওমান, সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলের বেশকিছু দেশের পণ্য রফতানির শীর্ষ গন্তব্য হলো চীন।

চীন তেলের জন্য তৃষ্ণার্ত। এই তৃষ্ণাই বাণিজ্যের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ২০১৫ সালে চীন বিশ্বে অশোধিত তেলের প্রধান আমদানিকারকে পরিণত হয়। তার এই তেলের অর্ধেক- দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ২০৩৫ সাল নাগাদ এ অঞ্চল থেকে চীনের তেল আমদানি এখনকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। অর্থাৎ অন্য যে কোনো দেশের তেল আমদানিকে বহুলাংশে ছাড়িয়ে যাবে।

ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোও চীনা পণ্যের উর্বর বাজারে পরিণত হয়েছে। মিসর, সিরিয়া ও ইরানের রাজপথগুলোতে চীনের তৈরি গাড়ির ভিড়। চীনা কাপড়, খেলনা ও প্লাস্টিক সামগ্রী সর্বত্র দৃশ্যমান। চীন ছোটখাটো অস্ত্রও প্রচুর বিক্রি করে।

হাইড্রোফ্র্যাকিং প্রযুক্তিতে নিজ দেশে তেল উৎপাদনে বিপ্লব ঘটায় আমেরিকা এখন নিজস্ব তেল গ্যাসের ওপর নির্ভর করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। ২০০০ সালে দেশটি ওই অঞ্চলের দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করেছেন। ২০৩৫ সালে সেই আমদানি কমে এসে দাঁড়াবে ১ লাখ ব্যারেল। তখন মধ্যপ্রাচ্যের ৯০ শতাংশ তেল যাবে এশিয়ায়, যার একটা বড় অংশ নেবে চীন। কাজেই চীন তাকাচ্ছে পশ্চিমের দিকে আর আরব দেশগুলো তাকাচ্ছে পূর্বের দিকে। চীন নেবে তেল আর দেবে বিভিন্ন পণ্য। এমনকি বিনিয়োগও। আরব নেতারা বিশেষত মিসরের আবদুল ফাতাহ আল সিসি এই বিনিয়োগ টানতে ব্যগ্র। মিসরের ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট, জরাজীর্ণ বন্দর ঠিক করতে নগদ অর্থ দরকার। চীনা কোম্পানিগুলো তেহরানের মেট্রো, মিসরের দুই বন্দর এবং সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনার মধ্যে দ্রুতগতির রেলপথ তৈরি করছে। সুয়েজ খালের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা কোম্পানি প্লাস্টিক সামগ্রী, কার্পেট ও কাপড় উৎপাদন করছে। গত ১৫ জুন মিসর ও চীনের মধ্যে এক হাজার কোটি ডলার মূল্যের নতুন প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এ তো গেল অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা। এবার আসা যাক রাজনৈতিক প্রসঙ্গে। চীন এ অঞ্চলকে শোষণ করছে, এমন ধারণা কিছু কিছু আরবের মধ্যে বিদ্যমান। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক নেতা এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে। তারা মনে করে, আমেরিকার মতো সামরিক ও কূটনৈতিক অভিসন্ধি চীনের নেই। তথাপি কেউ কেউ চায়, আমেরিকা সরে গেলে সেই শূন্যতা যেন চীন পূরণ করে।

লেবাননের মন্ত্রী এলান হাকিম মনে করেন, এ অঞ্চলে চীনের উচিত শীর্ষস্থানীয় ভূমিকা পালন করা। ছয় রাষ্ট্রের সংগঠন উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের এক কর্মকর্তা বলেন, নিরাপত্তার জন্য এই দেশগুলো দীর্ঘদিন আমেরিকার ওপর নির্ভর করেছে। এখন সেই নির্ভরতার ক্ষেত্র হিসেবে অন্যান্য দেশের সন্ধান করছে এবং সেই সম্ভাব্য দেশগুলোর সর্বাগ্রে রয়েছে চীনের স্থান।

মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন দেশের কাছে চীনের উন্নয়ন ব্যবস্থা বেশ পছন্দসই। যেমন মিসরের শৈরশাসক জেনারেল সিসি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ব্যতিরেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের টানা মডেল অনুকরণ করতে চান।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা সে সমর্থন করে না। ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছে চীন। সিরিয়ার বাসার সরকার উৎখাতের মার্কিন-ইউরোপীয় উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশটি ভেটো দিয়েছে। কিন্তু মুখে যতই অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করুক, চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যতই বাড়বে, ততই সে মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত, রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বে। চীন পছন্দ করুক আর না করুক বাস্তব অবস্থাই চীনকে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তুলবে।

চলমান ডেস্ক

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট