১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

সিরিজ বাংলাদেশের


মিথুন আশরাফ ॥ খেলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়ামজুড়ে শুধু ‘মওকা, মওকা’ই শোনা গেল। সেই ‘মওকা’ দুই ওয়ানডের একটিতেও তৈরি করতে পারল না ভারত। প্রথম ওয়ানডেতে ৫ উইকেট নেয়া মুস্তাফিজুর রহমান দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও কী দুর্দান্ত বোলিংই না করলেন। একাই ৬ উইকেট তুলে নিলেন। এমন ইতিহাসই গড়লেন, ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১১ উইকেট নেয়া একমাত্র বোলার হয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত তার গতির ঝড়ের সামনে পড়ে আবারও ভারত ব্যাটসম্যানরা হাবুডুবু খেলেন। এরপর সাকিব আল হাসান যে অপরাজিত ৫১ রান করলেন, তাতে ভারতও হারল বৃষ্টি আইনে ৬ উইকেটে।

ভারতের মতো দলকে প্রথম ওয়ানডেতেও ৭৯ রানের বড় ব্যবধানে হারাল বাংলাদেশ, দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও হেসে খেলে জিতল। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জিতে নিল। র‌্যাঙ্কিংয়ে ৭ নম্বরে থাকা নিশ্চিত করে ২০০৬ সালের পর আবার ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলার টিকেটও পেয়ে গেল বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে ভারতকেও এখন ‘বাংলাওয়াশে’র স্বাদ দেয়ার পালাও তৈরি হয়ে গেল।

‘বাংলাওয়াশ’ কী জিনিস সেই স্বাদ ভারতকে দিতে পারবে বাংলাদেশ? দ্বিতীয় ওয়ানডেতে শিখর ধাওয়াানের ৫৩, মহেন্দ্র সিং ধোনির ৪৭ রানে যখন ভারত ৪৫ ওভারে ২০০ রানেই অলআউট হয়ে গেল, এরপর বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের সামনেও জিততে ২০০ রানের টার্গেটই দাঁড় হলো; তখন থেকেই ‘বাংলাওয়াশ’ শব্দটি সবার মুখে মুখে উচ্চারণ হতে থাকল। বুধবার সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে জিতলেই যে ভারতকে ‘বাংলাওয়াশ’ চেনানো যাবে। পর পর দুই ওয়ানডেতে হারানোর পর তৃতীয় ওয়ানডেতেও ভারতের বিপক্ষে জেতার প্রত্যাশা তাই করা যেতেই পারে। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সাকিব, লিটন কুমার দাস (৩৬), সৌম্য সরকার (৩৪), সাব্বির রহমানের (২২*) দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে মাত্র ৩৮ ওভারেই ৪ উইকেট হারিয়ে ২০০ রান করে জয় তুলে নিতে গিয়ে যে ভারতকে পাত্তাই দিল না বাংলাদেশ।

প্রথমবারের মতো ভারতের বিপক্ষে সিরিজ জয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। এর আগে ভারতের বিপক্ষে তিনটি সিরিজ হেরে, চতুর্থ সিরিজে এসে জিতল বাংলাদেশ। ৫৯তম ওয়ানডে সিরিজ খেলে এর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে ১৮টিতে সিরিজ জয় করেছে। সেই সঙ্গে দেশের মাটিতে টানা ১০ ওয়ানডেতে জেতার ইতিহাসও গড়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের পর দেশের মাটিতে টানা ১০ ওয়ানডেতে জিতেছে বাংলাদেশ। দেশের মাটিতে সেই সঙ্গে ৩৩তম সিরিজ খেলে ১৪তম সিরিজ জয়ও হলো বাংলাদেশের।

ভারত ক্রিকেটে পরাশক্তি। এ মুহূর্তে যে অবস্থা তাতে মাঠের ভেতর পরাশক্তি বলা যাচ্ছে না। তবে মাঠের বাইরে এখনও দলটি পরাশক্তিই। ক্রিকেট সম্পর্কিত যে কোন বিষয়ে ক্ষমতা তাদের যে কোন দেশের চেয়ে বেশি। এ দলটিকে যখন কোন প্রতিপক্ষ পায়, লক্ষ্য থাকে একটিই; কিভাবে হারানো যায়। তা যে দলই প্রতিপক্ষ থাকুক। মাঠের বাইরে ভারতকে হারাতে না পারলেও মাঠের ভেতর হারিয়ে সেই জবাবটুকু তো দিতে চায়।

যখন ভারতের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ, তখন সেই হারানোর আশা আরও বেশি করে থাকে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের পর তো ভারতকে হারাতে পারলেই ‘ডাবল আনন্দ’ মিলে যাওয়ার একটা বিষয়ও আছে। তাই ভারতকে যখন পর পর দুই ওয়ানডেতে হারিয়ে দিল বাংলাদেশ, পুরো জাতির আনন্দের সঙ্গে ক্রিকেটারদের ‘নাচে-গানে’র আনন্দও যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

প্রথম ওয়ানডেতে যখন বাংলাদেশ জিতেছে তখনই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেছে। কিন্তু প্রথম ওয়ানডেতে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল যে প্রতিশোধ নেয়ার তাড়না আরও বেড়ে যায়। আবার প্রতিশোধ শব্দটি অন্তরে জেগেই থাকে। ভারত অধিনায়ক ধোনি যে মুস্তাফিজুর রহমানকে ধাক্কা দিলেন, ক্রিকেট বিশ্বেই আসলে এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। যখন ধোনির সঙ্গে ২০ বছরের তরুণ পেসার মুস্তাফিজেরও শাস্তি হয়েছে, অপরাধ না করেও শাস্তি পেতে হয়েছে; তখন তারও মাঠে জবাব দেয়ার একটি বিষয় ছিল। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররাও যেন মনে মনে সেই প্রতিশোধ পুষে রেখেছিলেন। তাই তো এতটা আত্মবিশ্বাস খেলার শুরু থেকেই মিলেছে। যে আত্মবিশ্বাসে আবারও মুস্তাফিজ টপাটপ উইকেট নিতে থাকেন। এমনকি ধোনির উইকেটটিও তুলে নেন সাতক্ষীরার তরুণ এ পেসার।

ধোনিকে যেন উচিত জবাবই দিয়ে দিলেন। ধোনির উইকেট যখন শিকার করলেন মুস্তাফিজ, তখন পুরো স্টেডিয়ামে ‘মুস্তাফিজ, মুস্তাফিজ’ রবই উঠেছে। ভারত ইনিংসে শুধু ধাওয়ানই (৫৩) অর্ধশতক করতে পেরেছেন। আর কোন ব্যাটসম্যানই ঝলক দেখাতে পারেননি। শুরুতে নাসির হোসেন (২/৩৩), এরপর মুস্তাফিজ যে একের পর এক উইকেট নিতে থাকেন, ৬টি উইকেট নিয়ে নেন। বৃষ্টিতে খেলা প্রায় ২ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। মুস্তাফিজ এর আগেই ৫ উইকেট তুলে নিয়ে জিম্বাবুইয়ের ব্রায়ান ভিট্টরির সমান অবস্থানে উঠে যান। ভিট্টরির মতো ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেতে ৫ উইকেট করে নেন। কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর যে মুস্তাফিজের ১ বল বাকি ছিল, সেই বলে আরেকটি উইকেট নিয়ে ভিট্টরিকেও ছাড়িয়ে যান এ পেসার। ভারত ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই রোহিত শর্মাকে আউট করার পর ৩৬ ওভারে গিয়ে সুরেশ রায়না, এরপর এক এক করে ধোনি, আক্সার প্যাটেল, রবীচন্দ্রন অশ্বিন, ভুবনেশ্বর কুমারের উইকেট শিকার করেন মুস্তাফিজ। রুবেল হোসেনও এদিন ২টি উইকেট নেন।

ভারতের ইনিংস শেষ হতেই বাংলাদেশের জয় যে নিশ্চিত তা সবার ধারণাই হয়ে যায়। এর পরও গত বছর জুনে বৃষ্টিভেজা ম্যাচে ভারতকে ১০৫ রানে অলআউট করে দিয়েও যে ৫৮ রানে অলআউট হয়ে জিততে পারেনি বাংলাদেশ, সেই ম্যাচের স্মৃতিও খানিক উকি দেয়। কিন্তু সেই দল যে এখন আর বাংলাদেশ নয়। দলের নেতাও যে এখন পরিবর্তন হয়েছে। অধিনায়ক এখন মাশরাফি। যিনি আত্মবিশ্বাসীর জ্বালানি সবার মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন, ভারত সেরা দল এনেও কিছুই করতে পারছে না। বোলাররা যেমন ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ ছন্নছাড়া করে দিচ্ছেন, ব্যাটসম্যানরাও তেমনি ভারত বোলারদের পাত্তাই দিচ্ছেন না। ৩৪ রানে তামিম (১৩), ৮৬ রানে সৌম্য, ৯৮ রানে লিটনকে সাজঘরে ফেরাতে সক্ষম হলো ভারত, কিন্তু এরপর যে চতুর্থ উইকেটে মুশফিক-সাকিব মিলে ৫৪ রানের জুটি গড়লেন, সেখানেই আসলে ভারতের ক্ষীণ আশা-ভরসাও শেষ হয়ে গেল। দলের ১৫২ রানের সময় মুশফিক আউট হওয়ার পর সাকিব-সাব্বির মিলে খেলাই শেষ করে দিলেন। জয় হয়ে গেল। কিন্তু বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের দেখে মনে হলো, এ আর নতুন কী; এমন ভাব! জয় সেভাবে উদযাপন করছেন না।

প্রথম ওয়ানডেতে ভারতকে হারানোর পর যে উল্লাস হয়েছে, জয় নিশ্চিত হতেই সেই উৎসব নেই। শেষে মাশরাফি সব ক্রিকেটারকে নিয়ে একত্র করে গোলাকার হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খানিক সময় নাচলেন। এবং মুস্তাফিজকে সব ক্রিকেটাররা কাঁধে তুলে নিলেন। জয়ের নায়ক যে তিনিই। এমনই বোলিং করেছেন মুস্তাফিজ; কোনভাবেই তাকে ঠেকানো যায়নি। এক পেসার মুস্তাফিজের কাছেই বলতে গেলে সিরিজ হেরে গেল ভারত। তাতে ভারত ক্রিকেটারদের মাথায় নিচু হয়ে গেল। বাংলাদেশে খেলতে আসতেই চাচ্ছিলেন না দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররা। এসে লজ্জাই মিলল। এখন কেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, জিম্বাবুইয়ে, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তানের পর ভারতেরও ‘বাংলাওয়াশ’ হওয়ার পালা। ভারতের বিপক্ষে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সিরিজে হারিয়ে এর মধ্যেই নিজেদের ইতিহাসের সেরা প্রাপ্তি ঘরে তুলেছে বাংলাদেশ। যদি ভারতকে ‘বাংলাওয়াশ’ করা যায় তাহলে সেই প্রাপ্তি আরও বড় হবে বাংলাদেশের। সেই প্রাপ্তির অপেক্ষাই এখন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর ॥

ভারত ইনিংস ২০০/১০; ৪৫ ওভার (ধাওয়ান ৫৩, ধোনি ৪৭, রায়না ৩৪, কোহলি ২৩, জাদেজা ১৯; মুস্তাফিজ ৬/৪৩, রুবেল ২/২৬, নাসির ২/৩৩)।

বাংলাদেশ ইনিংস ২০০/৪; ৩৮ ওভার (সাকিব ৫১*, লিটন ৩৬, সৌম্য ৩৪, মুশফিক ৩১, সাব্বির ২২*, তামিম ১৩; অশ্বিন ১/৩২)।

ফল ॥ বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী।

ম্যাচ সেরা ॥ মুস্তাফিজুর রহমান (বাংলাদেশ)।