২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নতুন বন্ধু


পাড়ায় আমাদের বয়সী একটা ছেলে নতুন এসেছে। তোমরা যারা না জানো, তাদের জন্য বলছি- আমাদের একটা দল আছে মানে একটা গ্যাং আছে! যে কোন কাজ আমরা দলের সবাই মিলেমিশে করি, আর তার সুবিধা-অসুবিধা সবাই মিলেই ভাগ করে নিই। পাড়ায় নতুন কোন ছেলে এলে আমাদের প্রথম কাজ হয় তাকে আমাদের আস্তানায় (একটা পুরনো বাড়িতে আমরা এ আস্তানা গড়েছি) ডেকে নিয়ে একটু ভড়কে দেয়া। তারপর দুদিন যেতে না যেতেই সে ছেলেটিই আমাদের সবার প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠে। এখন আসল যে সমস্যাটা হলোÑ নতুন এই ছেলেটিকে আমরা এখন পর্যন্ত ভড়কে দিতে পারিনি। আর সেটা না পারলে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার প্রশ্নই বা আসে কোত্থেকে! ওকে ভড়কে দেয়ার জন্য আমরা ফর্মুলা পরিবর্তন করেও বিশেষ ফায়দা লাভ করতে পারিনি। আমাদের আস্তানায় ডেকে নেয়া সম্ভব নয়। ওর বাবাটা যে সারাক্ষণ ওর সঙ্গে সঙ্গে লেগে থাকেন! আর আমরা সবাই আমাদের পরিবার থেকে শিক্ষা পেয়েছিÑ বড়দের সঙ্গে খারাপ কোন ব্যবহার করা ঠিক নয়। এখন, তাহলে উপায়?

এ ক্ষেত্রে উপায় একটাইÑ এটা সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিÑ ওকে বাইরে একা পেলে বা যেখানেই সুযোগ পাই সেখানেই ওকে ভয় দেখাতে হবে। শুরু হলো আমাদের অভিযান। খেলার মাঠে আমরা জোরে জোরে ওর গায়ে বল ছুড়ে মারি। ওর বাবা গ্যালারিতে বসে থাকেন বলে কিছু করতে পারেন না। পুকুরে গোসল করতে গেলে আমরা কেউ ডুব দিয়ে ওর হাত পা টেনে ধরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সমস্যা। ওকে একা তেমন একটা পাওয়া যায় না। আর পুকুরে নামলে ওর বাবাও সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। ও সাঁতার কাটলে ওর বাবাও সাঁতার কাটেন। আমাদের ভেতরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। এবার সরাসরি এ্যাকশনে নামতে হবে। ঠিক করলাম, যে করেই হোক ওর বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ওকে আমাদের আস্তানায় নিয়ে আসতে হবে!

যেদিন অভিযানে নামব সেদিন আমার ছোটবোনটি আমাকে পেছন থেকে ডাক দিল। তক্ষুণি মেজাজ সপ্তম আসমানে উঠল। পেছন থেকে কেউ ডাক দেয়া মানেÑ কাজে ব্যর্থতা অনিবার্য! অথচ আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছি। বোনটি আমার কাছে এসে বলল, ‘দাদা, পাড়ায় যে নতুন ছেলেটি এসেছে, ওর সম্পর্কে কিছু জানিস?’

মুহূর্তেই চমকে উঠলাম। এটা কি কাকতাল, নাকি ও আমাদের গোপন বিষয়টা জেনে গেছে?

কী জবাব দেব বুঝতে না পেরে খেঁকিয়ে উঠলাম, ‘কেন, কী হয়েছে?’

ছোট বোনটি আমাকে ভ্রুক্ষেপই করল না। বলল, ‘ওর বাবাটা একটু কেমন যেন, তাই না?’

আমি মাথা ওপর নিচ দোলালাম। ও কী বলতে চায় জানা দরকার।

ও বলে চলল, ‘ওর বাবার ও অবস্থা কেন হয়েছে জানÑ ওর জন্যই। ওর বাবা অমন ছিলেন না। তিনি একটা ভাল সরকারী চাকরি করতেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ দুর্ঘটনায়...’

‘কী হয়েছে উনার?’ কৌতূহল দমাতে না পেরে জানতে চাইলাম আমি।

‘সেটাই তো বলছি। সময় দিবি তো! তাড়া আছে নাকি কোন?’

‘না, নেই।’ চুপসে গেলাম আমি।

‘একদিন ছেলেটি রাস্তা দিয়ে ওর বাবার সঙ্গে যাচ্ছিল। ভীষণ ব্যস্ত সড়ক। ছেলেটি একটু সামনে ছিল। হঠাৎ বিপরীত পাশ থেকে একটা গাড়ি এসে ছেলেটিকে ধাক্কা দেয়। তার আগেই ওর বাবা ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। ভাগ্য ভাল ছেলেটির তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। কিন্তু ওর বাবার স্নায়ু তা মেনে নিতে পারেনি। তিনি মনে করতে থাকেনÑ ছেলের ওই দুর্ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী। তিনি এক মুহূর্ত সন্তানের দেখাশোনা করতে পারেননি বলেই...। তাই তিনি সর্বদা ছেলেটির পেছনে আঠার মতো লেগে থাকেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন ব্যবসা করেন। এই হলো ওদের গল্প।’

ছোট বোনটি চলে গেল। আমার পা দুটি স্থির হয়ে রইল। ছোট-খাট গড়নের মধ্য বয়স্ক লোকটি ছবি ফুটে উঠল আমার চোখের সামনে। যিনি একজন সামান্য বাবা। কিন্তু সন্তানের জন্য তার অসামান্য ভালবাসা।

সেদিন রাতে আমাদের দলের সিদ্ধান্ত হলোÑআমরা বাপ-বেটা দুজনকেই আমাদের বন্ধু বানাব। আর তার প্রথম ধাপ তো সবারই জানাÑ এবার বাবা দিবসে ওদের এখানে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসা হবে। তারপর দুজনকেই আমরা উপহার দেব।