২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সরকারী ২১ প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৩৩ হাজার কোটি টাকা


রহিম শেখ ॥ রাষ্ট্রায়ত্ত ২১ প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কাছে। গেল বছর ১১ সরকারী প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি বাবদ দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনেক লোকসানী প্রতিষ্ঠানকে সরকার প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখছে। এর মূল কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের দক্ষতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এ কারণে প্রতি বছর উৎপাদনের তুলনায় অপচয় হচ্ছে বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠানে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে সংস্থাগুলোকে লাভজন করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৫ প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২১টি প্রতিষ্ঠানের কাছে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা বকেয়া ঋণের পরিমাণ হলো ৩২ হাজার ৯৭১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে বর্তমানে ব্যাংকের খেলাপী (শ্রেণীকৃত) ঋণের পরিমাণ হলো ১৬৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা। যা ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য মতে, সর্বোচ্চ ঋণগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির কাছেই রয়েছে মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি, টাকার অঙ্কে যা ১১ হাজার ১৫২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ঋণগ্রস্তের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৬২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর পর বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে বকেয়া ঋণ ৫ হাজার ১০৬ কোটি ১১ লাখ টাকা, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের (বিএসএফআইসি) বকেয়া ঋণ ৩ হাজার ২১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) বকেয়ার ঋণ ২ হাজার ৩১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) বকেয়া ঋণ ১ হাজার ২১৯ কোটি ৮ লাখ টাকা, বিডব্লিউডিবির বকেয়া ঋণ ৯৩৯ কোটি ৩ লাখ টাকা, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশনের (বিওজিএমসি) ঋণ ৩৯৬ কোটি ১২ লাখ টাকা, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনের (বিএসইসি) ঋণ ৩০৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, বিবিসির বকেয়া ঋণ ৩০১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, বিটিএমসির বকেয়া ঋণ ২৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, ডেসার ঋণ ৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা, ঢাকা ওয়াসার বকেয়া ঋণ ৭১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সমুদ্র পরিবহন কর্পোরেশনের (বিএসসি) ঋণ ৩০ কোটি ৯০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) ঋণ ৬২ লাখ টাকা, সিপিএর ঋণ ৭০ কোটি ৬১ লাখ টাকা, এমপিএর ঋণ ৬৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বকেয়া ৬৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা, বিটিবির ঋণ ৫৫ কোটি ১২ লাখ টাকা, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) ঋণ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ঋণ ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে না পারলে অপচয় হ্রাস পাবে না। তিনি বলেন, গত অর্থবছরের তুলনায় ঋণ ও ভর্তুকি কিছুটা কমেছে। অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই সংস্থাগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে লাভজনক করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশি দায়ী। তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় ঋণ ও ভর্তুকি কিছুটা কমেছে। তবে এটা আরও কমা উচিত।

সমীক্ষায় খেলাপী ঋণের তালিকায় দেখা গেছে, বিপিসির খেলাপী ঋণ ১৪ লাখ টাকা, বিটিএমসির ২৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বিএসইসির ৪০ লাখ টাকা, বিএসএফআইসির ৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, বিআরটিসির ৬০ লাখ টাকা, টিসিবির ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, বিএডিসির ২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং বিটিবির ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ঋণগ্রস্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের পেছনে সরকারকে বছরের পর বছর মোটা অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বাড়তি বরাদ্দ দেয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না উপরন্তু প্রতি বছরই তাদের লোকসানের পাল্লাও ভারি হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে ভর্তুকিও বাড়ছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১১টি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে সরকার ১ হাজার ২৯১ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। সংস্থাগুলোর মধ্যে বিজেএমসিকে ৮৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিসি ৫০ লাখ টাকা, আরডিএ ৪০ লাখ টাকা, বিআইডব্লিউটিএ ১৪৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা, বিএসসিআইসি ৭০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, বিএসবি ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা, ইপিবি ২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, বিএডিসি ২৩০ কোটি ১৩ লাখ টাকা, বিডব্লিউডিবি ৭৫১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, এনএইচএ, বিএসআরটিআই ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ভর্তুকি পেয়েছে।