২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ফুটপাথের আত্মকাহিনী


আমি একটা ফুটপাথ। ছোটবেলায় কোন এক ব্রিটিশ বাবু নাম দিয়েছিলেন বোধহয় ‘ফুটপাথ’। সেই তবে থেকেই আমি যে জায়গায় সে জায়গাতেই আছি। শুধু দিনে দিনে বেড়েছে আমার অনেক ‘বন্ধু ফুটপাথ’। তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই আমার মতো একই হাল! একই অভিজ্ঞতা! আমরা একেকজন একেকটা কালের সাক্ষী। আমি তোমাদের ভাষা আন্দোলন দেখেছি ১৯৫২ সালে। সেই থেকে দেখছি তোমাদের প্রভাতফেরি- খালি পায়ে এগিয়ে বেদিতে ফুল দেয়া রাত ১২টায়- আমার খুব ভালো লাগে। কেউ কেউ যখন আমার কোলে বসে একটু জিরোয় তখন আমার অনেক মায়া হয়। আমার বুকে দাঁড়িয়ে কেউ যখন আমার শরীরের ধার ঘেঁষা আরেক বন্ধু দেয়ালকে তোমাদের কবিদের লেখা বাণীতে সাজায়, খুব আনন্দ হয় আমাদের তখন। মনে হয় তোমরা দেশকে কত ভালোবাস! তোমাদের জন্য আমার অনেক গর্ব হয়। তোমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি নাকি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস? এদেশের মেয়েরা নাকি এভারেস্ট জয় করেছে? তোমাদের একসঙ্গে গেয়ে ওঠা জাতীয় সঙ্গীত নাকি ‘গিনেস বুকে’ ঠাঁই পেয়েছে? অথচ তোমরাই পয়লা বৈশাখের মতো এমন দিনে আমার ফুটপাথ বন্ধুর কাছে দাঁড়িয়ে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করো! ছিঃ ছিঃ! এ লজ্জা কোথায় রাখব? তখন, তোমরা কী তাই ভাবতে আমার ঘৃণা হয়। সেদিন একজনকে গাইতে শুনেছি-

আলোর নিচে ঘুমিয়ে আছে কে?

ওরা ফুটপাথের মেয়ে

এখন ওদের চেয়ে

কে বিপন্ন অবসন্ন

ফুটপাথের মেয়ে...তখন মনে হলো আমি তোমাদের কারও কারও জীবনে কত্ত অপরিহার্য! ঘরহারাদের জন্য আমি মায়ের মতো আশ্রয়! অথচ এই তো এ বছর একুশের বইমেলার শেষের দিকে সোহরাওয়ার্দীর পাশে আমার এক ফুটপাথ বন্ধুর বুকের ওপর কী নৃশংস কা-টাই না ঘটাল তোমাদের কেউ! এদেশের এক মেধাবী বিজ্ঞান লেখকের কলম বন্ধের উদ্দেশ্যে তার মস্তিষ্ককেই টার্গেট করা হলো! পবিত্র রক্তে কলুষিত করল একটা অতীব প্রয়োজনীয় ফুটপাথ?

তোমাদের রাজা আসে রাজা যায়! অনেক কিছুর নাম বদলায়- ভবনের নাম, সড়কের নাম ইত্যাদি। তবে সেই হিসেবে আমি ভাগ্যবান। আমার নাম বদলায়নি। যদিও আমার দুর্দশা বেড়েছে অনেক। তবু আমি এখনও ফুটপাথ নামেই বেঁচে আছি। তোমাদের একটা ব্যাপার আমার খুব ভালো লাগে- সেই বায়ান্ন থেকে একটা গান প্রতিবছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত একইভাবে বাজতে থাকে- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি।’ যা এখনও বিকৃত হয়ে যায়নি।

ধানম-ি, ঢাকা থেকে