১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রাজাকার হাসান আলীর ফাঁসি


স্টাফ রিপোর্টার ॥ কিশোরগঞ্জের ‘রাজাকার’ পলাতক সৈয়দ মো. হাসান আলীকে ফাঁসি দিয়েছে আদালত।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হকও আদালতে উপস্থিত রয়েছেন।

এর আগে বেলা সোয়া ১১টায় যুদ্ধাপরাধ মামলায় ১২৫ পৃষ্ঠার রায়ের প্রারম্ভিক বক্তব্য পড়া শুরু করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।

একাত্তরে কিশোরগঞ্জে ২৪ জনকে হত্যা, ১২ জনকে অপহরণ ও আটক এবং ১২৫টি ঘরে লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে হাসান আলী ওরফে হাছেন আলীর বিরুদ্ধে।

আসামি পলাতক থাকায় তাকে আদালতে হাজির করার কোনো বিষয় এদিন ছিল না। তিন বিচারক বেলা ১১টা ১০ মিনিটে এজলাসে এলেও আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান তখনও উপস্থিত না হওয়ায় রায় পড়া শুরু করতে বিলম্ব হয়।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান প্রসিকিউশনের কাছে আসামিপক্ষের আইনজীবীর বিষয়ে জানতে চান। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আদালতকে বলা হয়, শুকুর খান ‘পথে আছেন’।

পরে তার অনুপস্থিতিতেই প্রারম্ভিক বক্তব্য শুরু করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম।

তিনি বলেন, “আসামির অনুপস্থিতি হতাশাজনক। তার উপস্থিতিতে বিচার হলে আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেত এবং বিচারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তো।”

বিচারক বলেন, যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচারে গঠিত এ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ‘দুর্বলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে গবেষণার’ সুযোগ নেই।

“কিন্তু আপনারা যারা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার, দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করার সুযোগ আছে। এটা কেবল সুযোগ নয়, আপনাদের দায়িত্বও বটে।”

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের তিন নম্বর সেকশনে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে ‘ইনহিউম্যান অ্যাক্টস’ এর কথা বলা হলেও তার ব্যাখ্যা নেই। এই রায়ে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

প্রারম্ভিক বক্তব্য শেষে বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক রায়ের সংক্ষিপ্তসার পড়েন।

এ রায়কে কেন্দ্র করে সকালে ট্রাইব্যুনাল এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও আগের মতো রাস্তায় পুলিশের কড়াকড়ি নেই। আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবী ও সংবাদকর্মীদের ভিড়ও তেমন চোখে পড়েনি।

আসামির অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের চতুর্থ মামলার রায় এটি। এ নিয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মোট ১৯টি মামলার রায় হয়।

এর আগের মামলাগুলোর পলাতক আসামিদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আজাদ, একাত্তরের দুই বদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীন, ফরিদপুরের রাজাকার কমান্ডার জাহিদ হোসেন খোকনের মৃত্যুদণ্ড এবং জাতীয় পার্টির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল জব্বারের আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় আসে।

গতবছর ১১ নভেম্বর হাসান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার কাজ শুরু হয়। আসামির অনুপস্থিতিতেই এ মামলার কার্যক্রম চলে।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ গতবছর ২১ অগাস্ট হাসান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেন। ২৪ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেয়।

পরোয়ানা জারির পরও পুলিশ হাসান আলীকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় ট্রাইব্যুনালের আদেশে তাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেয় প্রসিকিউশন। তাতেও তিনি হাজির না হওয়ায় বিচারক আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেন।

আসামির পক্ষে মামলা লড়ার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে আব্দুস শুকুর খানকে আইনজীবী নিয়োগ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

হাসান আলীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানার রাজাকার কমান্ডার ছিলেন তিনি। ওই এলাকায় তিনি পরিচিত ছিলেন ‘রাজাকারের দারোগা’ ও ‘রাজাকার ওসি’ হিসেবে।

সৈয়দ হাসান আলীর বাবা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বাবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অখণ্ড পাকিস্তানের ধারণা মাথায় নিয়ে তিনি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানা সদর দখল করে ক্যাম্প বসায়। হাসান আলী তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেন। পরে তিনি কিশোরগঞ্জ মহকুমার তাড়াইল থানায় রাজাকার কমান্ডার হিসেবে নিয়োজিত হন।

তদন্ত সংস্থা বলছে, হাসান আলী তার সহযোগীদের নিয়ে তাড়াইল থানার বিভিন্ন এলাকা এবং কিশোরগঞ্জে নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, জোর করে অর্থ আদায় ও ধর্মান্তরিত করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান। তার নির্দেশেই তাড়াইলে হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগেও তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।