১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

মাইক্রোতে তুলে নিয়ে তরুণী গণধর্ষণে তোলপাড়


আজাদ সুলায়মান ॥ রাজধানীতে রাতে টহল পুলিশের প্রধান কাজই হচ্ছে রাজপথের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রতিটি থানার একাধিক টহল ডিউটির গাড়ি সারারাত ডিউটিতে রাখা হয়। ভাটারা থানারও চারটি টিম বৃহস্পতিবার রাতে এলাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে টহল দিচ্ছিল। তারপরও রাত মাত্র নয়টার সময়েই দুর্বৃত্তরা সবার সামনে কমান্ডো স্টাইলে কুড়িল বাসস্ট্যান্ড থেকে গারো তরুণীকে তুলে নেয় মাইক্রোবাসে। চলন্ত মাইক্রোবাসেই চালানো হয় তার ওপর পাশবিক নির্যাতন। পাঁচ লম্পট পালাক্রমে তাকে গণধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে উত্তরার জসীমউদ্দিনের মোড়ে তাকে ফেলে চম্পট দেয় মাইক্রোবাসটি। পরদিন ভিকটিম নিজে ভাটারা থানায় গিয়ে মামলা না করা পর্যন্ত পুলিশ এ ঘটনা জানতেও পারেনি। শনিবার বিকেলে মেয়েটিকে ঢাকা মেডিক্যালে প্রাথমিক পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত মিলেছে। তিনি এখন মেডিক্যালে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় এখনও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। যদিও একজন ধর্ষণকারীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে বলে পুলিশের দাবি।

অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর পরই মেয়েটি কয়েকটি থানায় গিয়ে মামলা দায়েরের চেষ্টা চালায়। কিন্তু কোন থানাই এ মামলা নেয়নি। বারো ঘণ্টা পর ভাটারা থানা মামলা নিতে বাধ্য হয়। তখনও তাকে ব্যাপক জেরার মুখে পড়তে হয়।

এদিকে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে আদিবাসীসহ রাজধানীর নারী সংগঠনগুলো। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে যৌন নিপীড়নবিরোধী ব্যানারে এক মানববন্ধন ও আলোক প্রজ্বলনের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এছাড়া যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে প্রধান সড়কে শনিবার বিকেলে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে ঢাকায় অবস্থানরত গারো আদিবাসীরা। এসব কর্মসূচীতে সবার দাবি ছিল- দোষীদের গ্রেফতার ও বিচার করা।

মেডিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন ॥ শনিবার দুপুরে তরুণীটির ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডাঃ হাবিবুজ্জামান চৌধুরী জনকণ্ঠকে জানান, বেলা ১১টায় ভাটারা থানা পুলিশ ওই তরুণীকে ফরেনসিক বিভাগে নিয়ে আসে। ফরেনসিক বিভাগের ডাঃ মমতাজ আরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত প্রতিবেদন এক সপ্তাহের মধ্যে দেয়া যাবে।

এ বিষয়ে ঢামেকের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সমন্বয়কারী ডাঃ বিলকিস বেগম জানান, ফরেনসিক পরীক্ষার পরে তরুণীটি এখন ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসা ও ডিএনএ টেস্টের জন্য তাকে শনিবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে সেখানে ভর্তি করা হয়।

ওসিসির সমন্বয়ক ডাঃ বিলকিস বেগম বলেন, গারো ওই তরুণীর চিকিৎসা সেবা ও ডিএনএ টেস্টের জন্য ওসিসিতে ভর্তি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সিনিয়র সহকারী কমিশনার লাকী আক্তার বলেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই তরুণীর ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাকে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে ভাটারা থানা থেকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ভাটারা থানার পরিদর্শক মোঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ধর্ষণের শিকার হওয়া ওই তরুণীকে শুক্রবার রাতেই ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।

ভাটারা থানার দারগা তাপস কুমার ওঝা বলেন, ওই তরুণী যমুনা ফিউচার পার্কের একটি শপিংমলে চাকরি করেন। ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার জন্য বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড রাস্তায় বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় পাঁচ যুবক তার মুখ চেপে ধরে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়।

একজন শনাক্ত ॥ চাঞ্চল্যকর এ কা-ে একজনকে শনাক্ত করা গেছে বলে পুলিশের দাবি। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তার পরিচয় প্রকাশ করছে না পুলিশ।

জানতে চাইলে মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) খন্দকার লুৎফুল কবির শনিবার জনকণ্ঠকে জানান, এই ঘটনার তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করছে। একজনের নাম পাওয়া গেলেও তদন্তের স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।

শনিবার দুপুর পৌনে দুইটার দিকে গুলশানে নিজ কার্যালয়ে বসে খন্দকার লুৎফুল কবির কয়েকজন সাংবাদিককে বলেন, গাড়িতে তোলার পর ধর্ষণকারীদের মুঠোফোনে একটি কল আসে বলে পুলিশকে জানায় ভুক্তভোগী ওই তরুণী। ওই সময় ধর্ষকদের আলাপে তিনি একজনের নাম শুনতে পান বলে আমরা জানতে পারি। মার্কেটের যে দোকানে ওই তরুণী কাজ করতেন সেখানে কোন সিসি ক্যামেরা ছিল না। আর রাস্তায় যেখান থেকে তাকে গাড়িতে তোলা হয় সেখানেও কোন সিসি ক্যামেরা ছিল না। তবে ওই মার্কেটের সকল সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের কাজ চলছে। তদন্ত কাজ এগিয়ে নিতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশসহ বেশ কয়েকটি টিম কাজ শুরু করছে। ভুক্তভোগীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ তদন্ত করছে। ওই তরুণীকে গাড়িতে উঠানোর পর কোন কোন রাস্তায় গাড়িটি চলেছে সে স্থানগুলোকেও তদন্তের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

এই ধরনের ঘটনা সাধারণত একজন পরিদর্শক পদবি মর্যাদার কর্মকর্তা তদন্ত করে থাকেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রেও সেটা মানা হয়েছে। খুব দ্রুতই ধর্ষণকারীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

কোথায় ছিল টহল পুলিশ? শনিবার কুড়িল বিশ্বরোড ও যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকার লোকজনের সামনে আলাপ করে জানা যায়, রাত মাত্র নয়টায় পথচারীর এত ভিড়ের মাঝেও একটা মাইক্রোবাসে তোলা হয় ওই তরুণীকে। সে চিৎকার করার চেষ্টা চালিয়েছে। মুহূর্তেই সেখানে লোকজনের ভিড় জমে। একটি মেয়ে অপহরণ হয়েছে বলে বলাবলি করতে থাকে। তখনও থানা পুলিশের টহল টিম সেখানে পৌঁছেনি। এরপরও সেখানে কোন টহল পুলিশের গাড়ি দেখা যায়নি। মূলত টহল পুলিশের ব্যর্থতার ফলেই এমন ন্যক্কারজনক কা- ঘটিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে দুুর্বৃত্তরা।

ওই এলাকার এক প্রত্যক্ষদর্শী বাসিন্দার মতে, ‘এখানকার যুমনা ফিউচার পার্ক এলাকা বৃহস্পতিবার রাতে এমনিতেই জমজমাট থাকে। রাত নয়টা সাড়ে নয়টার দিকে সাধারণত ফিউচার পার্কের আশপাশের রাস্তায় বাস মিনিবাস প্রাইভেট কার ও রিক্সার প্রচুর ভিড় থাকে। মেয়েটিকে বাসের জন্য বাসস্ট্যান্ড থেকে সামান্য একটু পশ্চিম দিকে সিনহা সিএনজি স্টেশনের কাছাকাছি এগিয়ে যেতে দেখেছে অনেকে। সেখানে দাঁড়ানো ছিল অনেকক্ষণ। এ সময় হঠাৎ মাইক্রোবাসটি পেছন থেকে এসে তার পাশে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই ভেতর থেকে দুই যুবক বের হয়ে তার মুখ চেপে ধরে। মেয়েটি চিৎকার করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুহূর্তেই তাকে গাড়িতে তুলে নিয়েই পশ্চিম দিকে চলে যায়। ওখান থেকে চলন্ত গাড়িতে কুড়িল ফ্লাইওভার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের পথ। ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে গাড়িটি উত্তরার দিকে ছুটে যেতে দেখেছে অনেকে। মেয়েটির উদ্ধৃতি দিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মোঃ সাজ্জাদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, মাইক্রোবাসটি কুড়িল ফ্লাইওভারের ওপর দিয়েই এয়ারপোর্টের দিকে যায়। মেয়েটির চোখ বা হাত বাঁধা ছিল না। তাকে যখন একের পর এক সবাই ধর্ষণ করছিল, তখনও সে সুস্পষ্ট আশপাশের অন্যান্য যানবাহন ও পথচারীকে দেখেছে। গাড়িটি তখন খুবই ধীরে ধীরে চলে। খিলক্ষেতের রাস্তা ধরে বিমানবন্দর গোলচক্কর পেরিয়ে উত্তরা জসীমউদ্দিন মোড়ে যাবার পর তাকে ফেলে দেয়া হয়। তারপর সে একটি রিক্সাযোগে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ধলা এলাকার বাসায় পৌঁছে। পরদিন শুক্রবার সকাল নয়টায় ভাটারা থানায় এসে সব ঘটনা খুলে বলে এবং মামলা রেকর্ড করা হয়। এখানে ভিকটিম নিজেই বাদী হন। মামলা নং ২৬।

শনিবার রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ আসামিদের ধরার জন্য অভিযান চালায় ওই এলাকায়। পুলিশ মেয়েটির কর্মস্থল ফিউচার পার্কের ফ্যাশন কোম্পানি স্মার্টেক্সের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে।

প্রতিবাদের ঝড় ॥ এ ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে প্রধান সড়কে শনিবার বিকেলে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে ঢাকায় অবস্থানরত গারো আদিবাসীরা। কর্মসূচী পালনকালে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানানো হয়। কর্মসূচীতে তিন শতাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

মানববন্ধন কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখেন অনিত্য মানখিন, হেষ্টিং রেমা, শুভজিৎ ঘাগ্রা, তগর দ্রং, পরাগ রিছিল, দীপন দিও, অবলা পাথাং প্রমুখ। এ সময় বক্তারা বলেন, আদিবাসীরা কারো ক্ষতি করে না। তারা নিজেদের অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়। কিন্তু অব্যাহত শোষণ, নির্যাতন, খুন ও ধর্ষণের ঘটনা তাদের অসহায় করে তুলেছে। গ্রামে ভূ-সম্পত্তি হারিয়ে জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হয়েও নিরাপত্তা পাচ্ছে না তারা। জনাকীর্ণ স্থান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণের ঘটনা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ।

একই দাবিতে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করে-নারী মুক্তি কেন্দ্র, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও নারী পক্ষ। পৃথক পৃথক বিবৃতিতে এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ঘটনার উপযুক্ত তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। উদীচী, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়নসহ কয়েকটি সংগঠন আজ রবিবারও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একই কর্মসূচী পালন করবে।

শনিবার নারী মুক্তির উদ্যোগে প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে যৌন নিপীড়নবিরোধী নামক সংগঠন।

এ ঘটনার প্রতিবাদে নারীপক্ষের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সারারাত মেয়েটিকে নিয়ে তার পরিবারের সদস্যরা উত্তরা, খিলক্ষেত ও গুলশান থানায় গেলেও কেউ মামলা নেয়নি। এছাড়া ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারেও নেয়া হয়েছে দেরিতে। এতে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়েছে। এসব অবহেলা ও গাফিলতিরও বিচার করতে হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: