২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সোনার কাঠি


রূপকথায় আছে, রাক্ষসের যাদুতে রাজকন্যা ঘুমিয়ে আছেন। যে পুরীতে আছেন সে সোনার পুরী, যে পালঙ্কে শুয়েছেন সে সোনার পালঙ্ক, সোনা মানিকের অলঙ্কারে ভর্তি তাঁর গা। কিন্তু কড়াকড়ি পাহারা, পাছে কোন সুযোগে বাহিরের থেকে কেউ এসে তাঁর ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়। তাতে দোষ কি! দোষ এই যে, চেতনার অধিকার যে বড়ো। সচেতনকে যদি বলা যায়, ‘তুমি কেবল এইটুকুর মধ্যেই চিরকাল থাকবে, তার এক পা বাইরে যাবে না তা হলে তার চৈতন্যকে অপমান করা হয়। ঘুম পাড়িয়ে রাখার সুবিধা এই যে, তাতে দেহের প্রাণটা টিকে থাকে, কিন্তু মনের বেগটা হয় একেবারে বদ্ধ হয়ে যায়, নয় যে অদ্ভুত স্বপ্নের পথহীন ও লক্ষ্যহীন অন্ধলোকে বিচরণ করে।

আমাদের দেশের গীতিকলার দশাটা এই রকম। সে মোহরাক্ষসের হাতে পড়ে বহুকাল থেকে ঘুমিয়ে আছে। যে ঘরটুকু যে পালঙ্কটুকুর মধ্যে এই সুন্দরীর স্থিতি তার ঐশ্বর্যের সীমা নেই, চারিদিকে কারুকার্য, সে কত সূক্ষ্ম কত বিচিত্র। সেই চেড়ীর দল, যাদের নাম ওস্তাদি, তাদের চোখে মুখ নেই, তারা শত শত বছর ধ’রে সমস্ত আসা যাওয়ার পথ আগলে ব’সে আসে, পাছে বাহির থেকে কোনো আগন্তুক ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।

তাতে ফল হয়েছে এই যে, যে কালটা চলছে রাজকন্যা তার গলায় মালা দিতে পারে নি, প্রতিদিনের নুতন নতুন ব্যবহারে তার কোনো যোগ নেই। সে আপনার সৌন্দর্যের মধ্যে বন্দী, ঐশ্বর্যের মধ্যে অচল।

কিন্তু তার যত ঐশ্বর্যে যত সৌন্দর্যই থাক্, তার গতিশক্তি যদি না থাকে তা হলে চলতি কাল তার ভার বহন করতে রাজি হয় না। একদিন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে পালঙ্কের উপর অচলাকে শুইয়ে রেখে সে আপন পথে চলে যায়; তখন কালের সঙ্গে কলার বিচ্ছেট ঘটে। তাতে কালের দারিদ্র্য কলারও বৈকল্য।

আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি আমাদের দেশে গান জিনিষটা চলছে না। ওস্তাদরা বলছেন, ‘গান জিনিষটা তো চলবার জন্য হয়নি, সে বৈঠকে বসে থাকবে, তোমরা এসে সময়ে কাছে খুব জোরে মাথা নেড়ে যাবে।’ কিন্তু মুশকিল এই যে, আমাদের বৈঠকখানার যুগ চলে গেছে, এখন আমরা যেখানে একটু বিশ্রাম করতে পাই সে মুসাফিরখানা। যা-কিছু স্থির হয়ে আছে তার খাতিরে আমরা স্থির হয়ে থাকতে পারব না। আমরা যে-নদী বেয়ে চলেছি সে নদী চলছে; যদি নৌকোটা না চলে তবে খুব দামী নৌকা হলে তাকে ত্যাগ করে যতে হবে।

সংসারে স্থাবর অস্থাবর দুই জাতের মানুষ আছে, অতএব বর্তমান অবস্থাটা ভালো কি মন্দ নিয়ে মতভেদ থাকবেই কিন্তু মত নিয়ে করব কী। যেখানে একদিন ডাঙা ছিল সেখানে আজ যদি জল হয়েই থাকে তবে সেখানকার পক্ষে দামী চৌঘুড়ির চেয়ে কলার ভেলাটাও যে ভালো। পঞ্চাশ বছর আগে একদিন ছিল যখন বড়ো বড়ো গাইয়ে বাজিয়ে দূরদেশ থেকে কলকাতা শহরে আসত। ধনীদের ঘরে মজলিস বসত ঠিক সময়ে মাথা নাড়তে পারে এমন মাথা গুন্তিতে নেহাত কম ছিল না। এখন আমাদের শহরে বক্তৃতাসভার অভাব নেই, কিন্তু গানের মজলিস বন্ধ হয়ে গেছে। সমস্ত তান-মান-লগ্ন সমেত বৈঠকি গান পুরোপুরি বরদাস্ত করতে পারে এত বড়ো মজবুত লোক এখানকার যুবকদের মধ্যে প্রায় দেখাই যায় না।

‘চর্চা নেই’ ব’লে জবাব দিলে আমি শুনব না। মন নেই বলেই চর্চা নেই। আকবরের রাজত্ব গেছে এ কথা আমাদের মানতেই হবে। খুব ভালো রাজত্ব, কিন্তু কী করা যাবেÑ সে নেই। অথচ, গানেতেই যে সে রাজত্ব বহাল থাকবে, এ কথা বললে অন্যায় হবে। আমি বলছিনে আকবরের আমলের গান লুপ্ত হয়ে যাবে- কিন্তু এখানকার কালের সঙ্গে যোগ রেখে তাকে টিকিতে হবে। সে যে বর্তমান কালের মুখ বন্ধ করে দিয়েই নিজেরই পুনরাবৃত্তিকে অন্তহীন করে তুলবে তা হতেই পারবে না।

সাহিত্যের দিক থেকে উদাহরণ দিলে আমার কথাটা স্পষ্ট হবে। আজ পর্যন্ত আমাদের সাহিত্য যদি কবিকঙ্কণচ-ী, ধর্মমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, মনসার ভাসানের পুনরাবৃত্তি নিয়ত চলতে থাকত তা হলে কী হত। পনেরোআনা লোক সাহিত্য পড়া ছেড়েই দিত বাংলার সকল গল্পই বাসবদত্তা- কাদম্বরীর ছাঁচে ঢালা হত তা হলে জাতে ঠেলার ভয় দেখিয়ে সে গল্প পড়াতে হত।

কবিকঙ্কণচ-ী-কাদম্বরীর আমি নিন্দা করছি নে। সাহিত্যের শোভাযাত্রার মধ্যে চিরকালই তাদের একটা স্থান আছে; কিন্তু যাত্রাপথের মনটা জুড়ে তাহারাই যদি আড্ডা করে বসে, তা হলে পথটাই মাটি আর তাদের আসরে কেবল তাকিয়ে পড়ে থাকবে, মানুষ থাকবে না।

বঙ্কিম আনলেন সাতসমুদ্র পারের রাজপুত্রকে আমাদের সাহিত্য রাজকন্যার পালঙ্কের শিয়রে। তিনি যেমনি ঠেকালেন সোনার কাঠি অমনি সেই বিজয়বসন্ত লায়লা মজনুর হাতির দাঁতে বাঁধানো পালঙ্কের উপর রাজকন্যা নড়ে উঠিলেন। বসতিকালের সঙ্গে তাঁর মালাবদল হয়ে গেল তারপর থেকে তাঁকে আজ আর ঠেকিয়ে রাখে কে।

যারা, মনুষ্যত্ত্বের চেয়ে কৌলীন্যকে বড়ো করে মানে তারা বলবে, ঐ রাজপুত্রটা যে বিদেশী। তারা এখনও বলে, এ সমস্তই ভুয়ো বস্তুতন্ত্র যদি কিছু থাকে তো সে ঐ কবিকঙ্কণচ-ী, কেননা এ আমাদের খাঁটি মাল। তাদের কথাই যদি সত্য হয় তা হলে এ কথা বলতেই হবে নিছক খাঁটি বস্তুতন্ত্রকে মানুষ পছন্দ করে না। মানুষ তাকেই চায় যা বস্তু হয়ে বস্তু গেড়ে বসে না, যা তার প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে চলে, যা তাকে মুক্তির স্বাদ দেয়। বিদেশের সোনার কাঠি যে জিনিসকে মুক্তি দিয়েছে সে তো বিদেশী নয়, সে যে আমাদের আপন প্রাণ। তার ফল হয়েছে এই যে বাংলাভাষাকে ও সাহিত্যকে একদিন আধুনিকের দল ছুঁতে চাইত না এখন তাকে নিয়ে সকলেই ব্যবহার করেছে ও গৌরব করছে। অথচ যদি ঠাহর করে দেখি তবে দেখতে পাব, গদ্যে পদ্যে সকল জায়গাতেই সাহিত্যের চালচলন সাবেক কালের সঙ্গে সম্পূর্ণ বদলে গেলে। যাঁহারা তাহাকে জাতিচ্যুত বলে নিন্দা করেন, ব্যবহার করবার বেলা তাঁরা বর্জন করতে পারেন না।

সমুদ্রপারের রাজপুত্র এসে মানুষের মনকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে জাগিয়ে দেয় এটা তার ইতিহাসে চিরদিন ঘটে আসছে। আপনার পূর্ণ শক্তি পাবার জন্যে বৈষম্যের আঘাতের অপেক্ষা তাকে করতেই হয়। কোনো সভ্যতাই এটা আপনাকে আপনি সৃষ্টি করে নাই। গ্রীসের সভ্যতার গোড়ায় অন্যসভ্যতা ছিল এবং গ্রীস বরাবর ইজিপ্ট ও এশিয়া থেকে ধাক্কা পেয়ে এসেছে। ভারতবর্ষে দ্রাবিড়-মনের সঙ্গে আর্য-মনের সংঘাত ও সম্মিলন ভারতসভ্যতা-সৃষ্টির মূল উপকরণ, তার উপরে গ্রীস রোম পারস্য তাকে কেবলই নাড়া দিয়েছে। য়ুরোপীয় সভ্যতার যে-সব যুগকে পুনর্জন্মের যুগ বলে সে সমস্তই অন্য দেশ ও অন্য কালের সংঘাতের যুগ। মানুষের মন বাহির হতে নাড়া পেলে তবে আপনার অন্তরকে সততাকে লাভ করে এবং তার পরিচয় পাওয়া যায় যখন দেখি সে আপনার অধিকার বিস্তার করেছে। এই অধিকার বিস্তারকে একদল লোক দোষ দেয়, বলে ওতে আমরা নিজেকে হারালুম; তারা জানে না, নিকেজে ছাড়িয়ে যাওয়া নিজেকে হারিয়ে যাওয়া নয়, কারণ বুদ্ধিমাত্রই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া।

সম্প্রতি আমাদের দেশে চিত্রকলার যে নবজীবন লাভের লক্ষণ দেখছি তার মূলেও সেই সাগরপারের রাজপুত্রের সোনার কাঠি আছে। কাঠি ছোঁয়ার প্রথম অবস্থায় ঘুমের ঘোরটা যখন সম্পূর্ণ কাটে না তখন আমরা নিজের শক্তি পুরোপুরি অনুভব করি নে তখন অনুকরণটাই বড়ো হয়ে উঠে; কিন্তু ঘোর কেটে গেলেই আমরা নিজের জোরে চলতে পারি। সেই নিজের জোরে চলার একটা লক্ষণ এই যে, তখন আমরা পরের পথেও নিজের শক্তিতেই চলতে পারি। পথ নানা, অভিপ্রায়টি আমরা শক্তিটি আমার যদি পথের বৈচিত্র্য রুদ্ধ করি, যদি একই বাঁধা পথ থাকে, তা হলে অভিপ্রায়ের স্বাধীনতা থাকে না। তা হলে কলের চাকার মতো চলতে হয়। সেই কলের চাকার পথটাকে চাকার স্বকীয় পথ ব’লে গৌরব করার মতো অদ্ভুত প্রহসন আর জগতে নাই।

আমাদের সাহিত্য চিত্রে সমুদ্রপারের রাজপুত্র এসে পৌঁছেছে, কিন্তু সংগীতে পৌঁছায় নি। সেইজন্যে আজও সংগীত জগতে দেরি করেছে। অথচ আমাদের জীবন জেগে উঠেছে। সেইজন্যে সংগীতের বেড় টলমল করছে। এ কথা বলতে পারব না, আধুনিকের দল গান একেবারে বর্জন করেছে। কিন্তু তারা যে গান ব্যবহার করছে, যে গানে আনন্দ পাচ্ছে, সে গান জাত-খোয়ানো গান। তার শুদ্ধাশুদ্ধ বিচার নেই। কীর্তনে বাউলে বৈঠকে মিলিয়ে যে জিনিস আজ তৈরি হয়ে উঠছে সে আচারভ্রষ্ট। তাকে ওস্তাদের দল নিন্দা করছে। তার মধ্যে নিন্দনীয়তা নিশ্চয়ই অনেক আছে। কিন্তু অনিন্দনীয়তাই যে সব চেয়ে বড়ো গুণ তা নয়। প্রাণশক্তি শিবের মতো অনেক বিষ হজম ক’রে ফেলে। লোকের ভালো লাগছে, সবাই শুনতে চাচ্ছে, শুনতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছ নাÑ এটা কম কথা নয়। অর্থাৎ গানের পঙ্গুতা ঘুচল, চলতে শুরু করল : প্রথম চালটা সর্বাঙ্গসুন্দর নয়, তার অনেক ভঙ্গি হাস্যকর এবং কুশ্রী, কিন্তু সব চেয়ে আশার কথা যে, চলতে শুরু করেছে সে বাঁধন মানছে না। প্রাণের সঙ্গে সম্বন্ধই যে তার সবচেয়ে বড়ো সম্বন্ধ, প্রথার সঙ্গে সম্বন্ধটা নয়, এই কথাটা এখনকার এই গানের গোলমেলে হাওয়ার মধ্যে বেজে উঠেছে। ওস্তাদের কারদানিতে আর তাকে বেঁধে রাখতে পারবে না।

দ্বিজেন্দ্রলালের গানের সুরের মধ্যে ইংরেজি সুরের স্পর্শ লেগেছে বলে কেউ কেউ তাকে হিন্দুসঙ্গীত থেকে বহিষ্কৃত করতে চান। যদি দ্বিজেন্দ্রলাল হিন্দুসঙ্গীতে দিদেশী সোনর কাঠি ছুঁইয়ে থাকেন, তবে সরস্বতী নিশ্চয়ই তাঁকে আশীর্বাদ করবেন। হিন্দুসঙ্গীত বলে যদি কোন পদার্থ থাকে তবে সে আপনার জাত বাঁচিয়ে চলুক; কারণ তার প্রাণ নেই, তার জাত আছে। হিন্দুসঙ্গীতের কোনো ভয় নেই। বিদেশের সংস্রবে সে আপনাকে বড়ই করে পাবে। চিত্তের সঙ্গে চিত্তের সংঘাত আজ লেগেছেÑ সেই সংঘাতে সত্য উজ্জ্বল হবে না, নষ্টই হবে, এমন আশঙ্কা যে ভীরু করে, যে মনে করে সত্যকে সে নিজের মাতামহীর জীর্ণ কাঁথা আড়াল করে ঘিরে রাখলে তবেই সত্য টিকে থাকবে, আজকের দিনে সে যত আস্ফালনই করুক, তাকে পথ ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হবে। কারণ, সত্য হিন্দুর সত্য নয়, পল্তেয় করে ফোঁটা ফোঁটা পুঁথির বিধান খাইয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় না; চারিদিকে মানুষের নাড়া খেলেই সে আপনার শক্তিকে প্রকাশ করতে পারে।

১৩২২, জ্যৈষ্ঠ ৭