২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

থাই গণকবরে অন্তত ১০ বাংলাদেশীর মরদেহ ছিল


ফিরোজ মান্না ॥ থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের সংখলা প্রদেশে গহীন অরণ্যের গণকবরে কম করে হলেও ১০ বাংলাদেশীর মরদেহ ছিল। ওই গহীন অরণ্যে আরও গণকবর রয়েছে বলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ওই গহীন অরণ্যে এখনও বিভিন্ন দেশের ৮/৯শ’ জীবিত নাগরিক রয়েছে। সোমবার সকালেই উদ্ধার হওয়া নরসিংদীর আনুজারের (২৮) সঙ্গে ব্যাঙ্ককের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা কথা বলে এমন তথ্য জেনেছেন।

সূত্র জানায়, গত শুক্রবার স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে সাদাও জেলার একটি দুর্গম এলাকায় অভিযান চালিয়ে দালালদের একটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের পাশে একটি গণকবরের সন্ধান পায় পুলিশ। মানবপাচারের শিকার হয়ে বাংলাদেশ, মিয়ানমারসহ এ অঞ্চলের অভিবাসীরা অবৈধ পথে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী এই এলাকায় পৌঁছে জিম্মি হয় বলে ধারণা করা হয়। গণকবর খুঁড়ে ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় গণকবরের পাশ থেকে আনুজার ছাড়াও উদ্ধার করা হয় দুই কিশোরকে।

দূতাবাস কর্মকর্তাদের কাছে মানবপাচারকারীদের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আনুজার বলেন, দালালদের খপ্পরে পড়ে আমরা এখানে এসেছিলাম। পরে আমাদের কাছে দালাল চক্র মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। যারা এই টাকা দিতে পারেনি তাদের ওপর দিন-রাত অমানসিক নির্যাতন চালায় দালাল চক্র। নির্যাতনের কারণে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নিষ্ঠুর নির্যাতনের হাত থেকে বেশ কয়েক জন কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বেঁচে যাওয়া আনুজার বাংলাদেশ দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অমানসিক নির্যাতনের বর্ণনা দেন। আনুজার জানান, তিনি মনে করেন পরিত্যক্ত ক্যাম্পটির পাশের গণকবরে অন্তত ১০ বাংলাদেশী ও ৩০ রোহিঙ্গার মরদেহ রয়েছে। ওই এলাকায় আরও গণকবর থাকতে পারে বলেও তিনি জানান। থাইল্যান্ডের গহীন অরণ্যের ওই পরিত্যক্ত ক্যাম্পটি মোট আট দালালের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আনুজার বলেন, এই ক্যাম্পের দালালরা হচ্ছেÑ আহমদ আলী, আনওয়ার ও সরিম-ইদা। দালালদের কয়েক রোহিঙ্গা আর কয়েক মালয়েশিয়ান। আনুজারকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও এখন তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

রয়্যাল থাই পুলিশের ফরেনসিক সায়েন্স উপদেষ্টা জেনারেল জারামপোর্ন সুরামান্নে জানান, সীমান্তের পাহাড়ী এলাকায় খুঁজে পাওয়া গণকবর থেকে এখন পর্যন্ত ২৬ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকৃত ২৬ মরদেহের মধ্যে ২৫টির ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এদের লিঙ্গ শনাক্তও করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সম্প্রদায়, জাতীয়তা বা কোন পরিচয় জানা যায়নি বলে জানান জারামপোর্ন। অভিযানে উদ্ধার হওয়া ১৪ ও ১৭ বছর বয়সী দুই কিশোর জানায়, তারা আট মাস ধরে ওই ক্যাম্পে বন্দী ছিল। শুক্রবার থাই নিরাপত্তা বাহিনী অভিযানে গেলে দালালরা জিম্মিদের নিয়ে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। মানবপাচারকারীদের হাতে এখনও ৮শ’ শরণার্থী বন্দী আছে বলে তারা মনে করে। এদের মধ্যে কত জন বাংলাদেশের সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। যেখানে গণকবরটির সন্ধান মিলেছে, সেটি আসলে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প। মালয়েশিয়ায় পাচারের আগে এখানে মাটির গর্তে বাঁশের ছাউনি দিয়ে রাখা হতো অভিবাসীদের।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া সীমান্তে গত শুক্রবার আবিষ্কৃত গণকবরটির কাছে মুমূর্ষু অবস্থায় যে যুবককে উদ্ধার করা হয়েছে, সে বাংলাদেশী বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে ব্যাঙ্ককের বাংলাদেশ দূতাবাস। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে কথা বলেছেন। উদ্ধার হওয়া আনুজার বাংলাদেশী বলে দাবি করেছেন। আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

রবিবার সাগরপথে ইউরোপ গমনেচ্ছু সাড়ে তিন হাজার অবৈধ অভিবাসীকে ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার করেছে ইতালির কোস্টগার্ড। গত মাসে এই ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ৮শ’ অভিবাসী মারা গেছেন। মারা যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে কয়েক বাংলাদেশীও ছিলেন। এখানে উদ্ধার হওয়াদের মধ্যেও বাংলাদেশী থাকতে পারেন।

বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে যত অভিবাসন বিষয়ক দুর্যোগের খবর পাওয়া গেছে, সব জায়গাতেই ঘটনার শিকার বাংলাদেশীদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর কারণ হিসেবে বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন বিষয়ক কর্মসূচীর প্রধান হাসান ইমাম বলছেন, অভিবাসী বাংলাদেশীদের মূল গন্তব্য যেসব দেশ, সেখানে নিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়া যখনই ব্যাহত হয়, তখনই অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এছাড়া দেশে কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকার কারণেও বৈধ বা অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতার একটি অন্যতম কারণ। তবে, ঠিক কত লোক প্রতিবছর অবৈধভাবে বিদেশে যায়, সে বিষয়ে সঠিক কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। বেশির ভাগই প্রতারণার শিকার হন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: