১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রান্তিক কৃষকই মূল চালিকাশক্তি


কৃষি বর্তমানে আমাদের দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাত্র ২০.০% দিচ্ছে (মৎস্যসহ)। অথচ এ খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে প্রায় ৬০.০% মানুষ। বিশ্বে যত ধরনের প্রযুক্তি আছে, তার প্রায় সবই আমাদের কৃষিতে এসে গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে দেশীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন ধরনের বীজ, যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতি। কিন্তু সকল কৃষক কি তা সমানভাবে ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে? পাচ্ছে না। তার কারণ মালিকানার বৈষম্য। আমাদের কৃষিতে এ বৈষম্য বর্তমানে প্রকট রূপ ধারণ করেছে। দেশের প্রায় ৭০.০% কৃষক হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক, যাদের ভূমির পরিমাণ অর্থনৈতিক জ্যোতের আকারের অনেক নিচে, তারা মূলত বরগা বা ভাগ চাষী। বাকি ৩০.০% এর মালিকানাধীন ভূমির পরিমাণ মোটামুটিভাবে অর্থনৈতিক জ্যোতের কাছাকাছি। তবে কোনক্রমেই তা উন্নত দেশের মতো নয়। আমাদের কৃষিতে একটি অত্যন্ত শক্ত মধ্যস্বত্ব¡ভোগী শ্রেণী বিদ্যমান আছে। বিভিন্ন কৃষি উপকরণ ও উৎপাদিত ফসলের বাজার মূলত এরাই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আমাদের প্রান্তিক কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও লাভবান হতে পারছে না।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং কৃষকের তথা প্রান্তিক কৃষকের সহায়তার জন্য স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন নামে পুনর্গঠন করেছিলেন। এর মাধ্যমে আমাদের দেশের কৃষকদের ন্যায্য মূল্যে অথবা বিনামূল্যে সেচযন্ত্রসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সরবরাহ শুরু করেছিলেন। কৃষক ভাইদের জন্য তিনি ভর্তুকিরও ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারগুলো বিশেষ করে জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে সকল ধরনের ভর্তুকি তুলে দেয়। বিএডিসিকে তছনছ করে দেয়। এর মালিকানাধীন সমস্ত সেচযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ পানির দামে ব্যক্তি মালিকদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এ সংস্থাটিকে একেবারে পঙ্গু করে দেয়। ফলে দেশ ক্রনিক খাদ্য ঘাটতির ফাঁদে আটকে যায়। ১৯৯৬ এ শেখ হাসিনার সরকার এসে সাম্রাজ্যাবাদীদের আপত্তি সত্ত্বেও বিএডিসিকে আবার চাঙ্গা করে এবং কৃষিতে কৃষককে দেয়া যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও ভর্তুকি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করে। ২০০৮ এ শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ১০ টাকায় ব্যাংকে হিসাব খোলা, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি আরও অনেক নতুন সুবিধাদি কৃষককে দেয়া হয়। ফলে দেশ আবার খাদ্যশষ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।

এত কিছুর পরেও বাজার অর্থনীতির কারণে আমাদের প্রান্তিক কৃষক মার খাচ্ছে। ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। লাভবান হতে পারছে না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য কৃষির সমবায়ীকরণের কোন বিকল্প নেই। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে আমাদের দেশের ১২৫টি তৎকালীন থানায় বহুমুখী সমবায় গঠন করার কর্মসূচী হাতে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত মালিকানা বজায় রেখে যৌথ চাষাবাদের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

বর্তমান বিশ্বে প্রায় সব উন্নত দেশেই সমবায় আছে-হোক তা পুঁজিবাদী বা সমাজতন্ত্রী। কর্মকা-ের ধরনে কিছু প্রার্থক্য থাকলেও মূল লক্ষ্য এদের এক। আর তা হচ্ছে উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেক্সই উৎপাদন। এখানেই বঙ্গবন্ধুর সমবায় চিন্তা বর্তমান বাংলাদেশ কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের প্রান্তিক কৃষককে মধ্যস্বত্বভোগীদের কবল থেকে রক্ষার জন্য এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য যত দ্রুত সম্ভব কৃষির সমবায়ীকরণ করতে হবে। তিন ধরনের সমবায় গড়ে তুলতে হবে : (ক) উৎপাদন সমবায়; (খ) সরবরাহ সমবায় এবং (গ) বিপণন সমবায়। আমূল ভূমি সংস্কার প্রবর্তন করে মালিকানা ব্যবস্থায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমস্ত খাস জমি, জলাশয়, নদ-নদী এমনকি সাগর উৎপাদন সমবায়ের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী। আমরা যত দ্রুত এটা অনুধাবন করতে সক্ষম হব ততই তা দেশের জনগণের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ

অর্থনীতি সমিতি