২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের


ইসরাইলী-ফিলিস্তিনী শান্তি প্রক্রিয়া, যা দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্ত হওয়ার কথা, সেটি এখন রয়েছে লাইফ সাপোর্টে । সংঘাতে জড়িত দু’পক্ষেরই ভ্রান্ত পদক্ষেপ আছে। তবে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গত মার্চ মাসের গোড়ার দিকে তাঁর নির্বাচনী প্রচারকালে যে অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিলেন, তাতে এই প্রক্রিয়া শিকেয় তুলে রাখা হয়েছে। নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি থাকতে ফিলিস্তিন কখনই রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে না। এমনকি ভোটাভুটি হয়ে যাওয়ার পরও তিনি এই মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করছিলেন। তাঁর এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্যের সরাসরি বিপরীত।

প্রায় দুই দশক ধরে মার্কিন নীতির লক্ষ্য হচ্ছে ফিলিস্তিন সমস্যার একটা দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান। জর্জ ডব্লিউ বুশই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ২০০২ সালে এক ভাষণে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে টেকসই এবং অসামরিকীকৃত ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি বলেছিলেন ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। এই রাষ্ট্র ফিলিস্তিনী জনগণের প্রাপ্য। এতে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা জোরদার হবে। ইসরাইলী জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায়ও তা অবদান রাখবে।’ আজ উভয় পক্ষের বলতে গেলে সকল আমেরিকান রাজনীতিবিদ প্রকাশ্যে এই অবস্থানকে সমর্থন করেন। কিন্তু নেতানিয়াহু পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্যকে কিভাবে এগিয়ে নেবে?

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ ইসরাইলকে শাস্তি দেয়া নয়। বরং এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা হবে। ফিলিস্তিন সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভের প্রধান উৎস দূর হবে। এতে করে মার্কিন নীতি নির্ধারকদের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অগ্রাধিকারের দিকে নজর দেয়া সহজতর হবে। যেমন আইএসকে পরাজিত করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশদারিত্ব জোরদার করে তোলা। তাছাড়া তুরস্ক, মিসর, জর্দান ও সৌদি আরব সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়া সহজতর হবে। এর মধ্য দিয়ে ইসরাইল ও তার প্রতিবেশীদের এই সঙ্কেত দিয়ে দেয়া হবে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার আপন স্বার্থে কাজ করবে। এমনকি সেই স্বার্থ যদি তার নিকট মিত্রের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সংঘাতময় হয়, তাহলেও করবে। একই সঙ্গে দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের মধ্য দিয়ে ইসরাইলের নিজের নিরাপত্তাও জোরদার হবে।

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া হলে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটা সমস্যারও সমাধান হবে। সেটা হলো একদিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি মার্কিন সমর্থনের সরকারী নীতি এবং অন্যদিকে সেই নীতিকে নস্যাৎ করে দেয়া ইসরাইলী সরকারের প্রতি মার্কিন সমর্থন থেকে উদ্ভূত বিভাজন রেখা।

নেতানিয়াহু দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের প্রতি লোক দেখানো সমর্থন জানালেও এর আগে তিনটি মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে এই ফর্মুলা বানচাল করার জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি শুধু ইহুদী বসতির সম্প্রসারণই ঘটাননি, উপরন্তু নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের রক্তাক্ত পন্থায় দমন করেছেন এবং পশ্চিম তীর ও গাজা ভূখ-ের মধ্যে বিভেদ বাড়িয়ে তুলেছেন। ফিলিস্তিনীদের কাছে তিনি কোন আশার বাণী শোনাননি। এ অবস্থায় অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ২০১০ সালে পূর্ববর্তী দফা আলোচনা ভেস্তে যাবার পর ফিলিস্তিনী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অন্যান্য দেশ ও জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাতে শুরু করেন। এখন নেতানিয়াহু সেখানে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন এবং অনেকে যা আগে থেকেই ধারণা করেছে যে, তিনি কখনই ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র জন্ম নিতে দেবেন না। সেখানে এটা অতি পরিষ্কার যে, ওয়াশিংটন দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের লক্ষ্য অর্জন করতে চাইলে অবশ্যই বিকল্প পথের সন্ধান করতে হবে।

উভয়পক্ষ কয়েক দশক ধরে যুক্তি দেখিয়ে আসছে যে, এই সংঘাত অবসানের একমাত্র পথ হলো ইসরাইলী ও ফিলিস্তিনীদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা। কিন্তু নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত অন্তত এই প্রত্যক্ষ আলোচনার পথ রুদ্ধ। ফিলিস্তিনীদের মৌলিক দাবি যিনি প্রত্যাখ্যান করেন, তেমন একজন ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফিলিস্তিনীরা কিছুতেই আলোচনায় বসবে না। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, জীবিত এমন একজনও ফিলিস্তিনী নেই, যিনি বিশ্বাস করেন নেতানিয়াহুর সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনার কোন আশা আছে। সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ওবামাও অনেকটা একই কথা বলেছেন।

এই বাস্তবতায় যেখানে কিছুই অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তেমন ধরনের আরেক দফা আলোচনার উদ্যোগ নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে অর্থহীন হবে। তবে জাতীয় সীমান্ত, জেরুজালেম বিভাজন, ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তুদের নিজ আবাসভূমিতে ফিরে পাওয়ার অধিকার, ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দান, ইহুদী বসতির ভবিষ্যত এবং যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো ইস্যুগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য ফিলিস্তিনী ও ইসরাইলীদের শেষ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ সংলাপে ফিরে যেতেই হবে। এছাড়া ভিন্ন আর কোন পথ খোলা নেই।

চলমান ডেস্ক