২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

পাগলা ট্রেন নাকি ভৌতিক ট্রেন


রাজবাড়ী-ফরিদপুর যাত্রীবাহী আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি অটো ব্যাক গিয়ারে পড়ে উল্টোদিকে চলেছে প্রায় ২৬ কিলোমিটার পথ। এক ঘণ্টা চলার পর ট্রেনের টিটিই আনোয়ার হোসেনের প্রচেষ্টায় থেমে যায় ট্রেনটি। ব্যাপার বুঝে যাত্রীরা মহাআতঙ্কিত হলেও কেউ জানালা-দরজা পথে লাফ দেয়নি- দিতে দেয়া হয়নি। চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এরকম ঘটনাটি আমি দৈনিক জনকণ্ঠে পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছি। ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়া ছিল। অটোমেটিক উল্টোযাত্রার খবরে ট্রেনের যাত্রীরা যেমনই হতবিহ্বল-আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তেমনি শত শত উৎসুক জনতাও রেলওয়ে স্টেশনে ভিড় জমায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ছুটে আসে পুলিশ বাহিনী ও ফায়ার ব্রিগেড। ট্রেনের গার্ড ট্রেনে ছিলেন না। চালক দু’জন ইঞ্জিন স্টার্টে রেখে চা পান করতে গিয়েছিলেন দোকানে। তবে এরকম একটি মজার তথ্য চাঞ্চল্যকর-ভীতিকর ট্রেনযাত্রার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি এবং আরও বহুজনে। সম্ভবত ১৯৬৩ সালের ঘটনা। বাগেরহাট রেলস্টেশন থেকে একটি ট্রেন এভাবেই চলতে শুরু করেছিল। সেক্ষেত্রেও ড্রাইভার (বিহারী দু’জনে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে চা পান করছিলেনÑ গার্ড সাহেব তো সাহেবই, তিনি তো আসবেন ট্রেন ছাড়ার ২-৩ মিনিট আগে) সবাইকে চমকে দিয়ে প্রচ- গর্জনে বাষ্প উগরাতে উগরাতে চলতে শুরু করল ইঞ্জিন, পেছনে ৫টি বগি। ড্রাইভার দু’জন ব্যাপার বুঝে যখন দৌড় শুরু করেছিল তখন ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে চলেছে পিসি কলেজ স্টেশনের দিকে। মাত্র ১ কিলোমিটার দূর তো! পিসি কলেজ স্টেশন পেরিয়ে ট্রেন পড়ল পুঁটিমারী বিলের ভেতরÑ সামনে ষাটগম্বুজ স্টেশন। ততক্ষণে ‘টরটপ্পা’ দিয়ে বাগেরহাটের স্টেশনমাস্টার ষাটগম্বুজসহ যাত্রাপুর-সিংগাতী-ফকিরহাট-বাহিরদিয়া-সামন্তসেনা-কর্ণপুর ও শেষ স্টেশন রূপসা নদীর পূর্বপাড়ের রূপসা স্টেশনে মেসেস পাঠিয়ে দিয়েছেন। দু’জন তরুণ মোটরসাইকেলে চেপে প্রায় ট্রেনটির সমান্তরালে এগিয়ে চেষ্টা করছিল লাফ দিয়ে ইঞ্জিনে উঠা যায় কিনা! একজন উঠেও ছিল। কিন্তু রেল ইঞ্জিনের সে তো কিছুই জানে না। উল্টো নাড়াচাড়ায় ট্রেনটির গতি গিয়েছিল বেড়ে। ষাটগম্বুজ থেকে শুরু করে রূপসা পর্যন্ত (রূপসা-বাগেরহাট দূরত্ব মাত্র ৩১ কিলোমিটার) ওই দুই তরুণ ছড়িয়ে দিয়েছিল আজব-তাজ্জব সংবাদটি। কী দারুণ কা-! আমরাও ক’জন ছুটেছিলাম গ্রামের উত্তরপ্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া (পূর্ব-পশ্চিমে) রেল সড়কের দিকে। ওমা! রেলপথের দু’পাশ জোড়া উৎসুক কৌতূহলী মানুষ। ভূতে চালিয়ে দিয়েছে ট্রেন! নাকি কোন জাদুকর! নাকি ইঞ্জিনের মাথা গরম হয়ে গেছেÑ পাগলা ইঞ্জিন নাকি! ওই দুই তরুণ রেল সড়কের সমান্তরালে বয়ে যাওয়া পিচের সরু পথটা ধরেই পৌঁছেছিল রূপসা স্টেশন পর্যন্ত। বাষ্পীয় ইঞ্জিন। কয়লা ঠিকমতো না পড়লে থেমে যাবে আপনা-আপনি। যদি আসে রূপসা পর্যন্ত! তাহলে তো সিøপার দিয়ে তৈরি গার্ডার ভেঙ্গে লাফ দেবে রূপসা নদীর বুকে। হ্যাঁ, এরকম অভিজ্ঞতা সবার ছিল। ওই ঘটনার মাত্র কিছুদিন আগে পাকিস্তানের দোর্দ- প্রতাপশালী ও পূর্ব পাকিস্তানীদের চোখে মহান বীরপুরুষ জেনারেল আইয়ুব খান খুলনায় এসেছিলেন।মানুষের যাতায়াতের জন্য দুটো ট্রেনকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে (মিটার গেজ ট্রেন তো! ৫+৫=১০টি বগি। আগে-পিছে দুটো পিচ্চি ইঞ্জিন জুড়ে দেয়া হয়েছিল) বাগেরহাট-রূপসায় ভোরবেলা থেকেই খেপ মারা শুরু করেছিল। ওরে মানুষ! ছাদে মানুষ। বগির জোড়ায় মানুষ। ট্রেন আর দেখা যায় না। ট্রেনে উঠতে না পেরে বহু মানুষ ৭/৮/১০ মাইল হেঁটে সেদিন খুলনার বড় মাঠে (সার্কিট হাউস ময়দান) হাজির হয়েছিল। আমরা কয় চ্যাংড়া বাঁদর ফকিরহাট থেকে বাঁদরের কৌশলেই চড়ে এসেছিলাম ছাদে। ছাদে বসে দেখেছিলাম সেদিন- শত শত মানুষ পিচের পথটা ধরে হেঁটে চলেছে যেন পুণ্যতীর্থের দিকে। ফকিরহাট পার হয়ে বাহিরদিয়া স্টেশনে যেতে মাঝামাঝি জায়গায় পড়ে বিখ্যাত ‘বুড়ির বটতলী’ নামক বটগাছটিÑ যেটা দুটো বিশাল মোটা মোটা ডাল রেললাইনের অল্প উপর দিয়ে হাতের মতো প্রসারিত করে রেখেছিল দক্ষিণ দিকে, গাছটি ছিল পিচের রাস্তার পাশে, রেললাইনের উত্তর পাশে। ১৯১৫ সালে ইংরেজরা যখন শুরু করেছিল এই মিটার গেজ রেলপথ নির্মাণ কাজ, তখন তো বটেই- ১৯১৮ সালে যখন রেল চলাচল উদ্বোধন হয় তখনও ওই ডাল দু’খানি কাটতে সাহস পায়নি। ইংরেজ সাহেবরা তো আর ডাল কাটবে না। কাটবে বিহারী বা বাঙালী শ্রমিকরা, তারা গলায় রক্ত উঠে রক্ত বমি করতে করতে মৃত্যুর ভয়ে ডাল কাটতে রাজি হয়নি। বুড়ির বটতলার সেই বুড়ির নাকি জ্যান্ত পীর (বটগাছটা আজও আছে, ২০১৫ সাল)। অতএব, প্রসারিত ডাল দু’খানা রয়েই গিয়েছিল। ওইদিনই একটা ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে (ডাল লেগে) অনেকেই আহত-নিহত হয়েছিল ওই বুড়ির বটতলায়। ওই ট্রেনটিও সেদিন ব্রেক ফেল করে রূপসা স্টেশনের গার্ডার ভেঙ্গে রূপসা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। তবুও সেদিন বিশাল জনসভা হয়েছিল খুলনার বড় মাঠে। আইয়ুব খান ভাষণ দিয়েছিল উর্দুতে। কিছুই বুঝিনি। অনুবাদ ভাষণ দিয়েছিল খান আবদুস সবুর খান। বাংলা তো! বুঝেছিলাম। আশ্চর্য! ওই ভাষণে বুড়ির বটতলা বা রূপসার বুকে ঝাঁপ দেয়া ট্রেনের আহত-নিহতদের জন্য একটি বাক্যও উচ্চারিত হয়নি। অথচ সবাই আসছিল মহান (?) এই বীরপুরুষকে দেখতে।

ফিরে আসি পাগলা ট্রেনটির কথায়। ষাটগম্বুজ-যাত্রাপুর-সিংগাতী-ফকিরহাট পার হয়ে ট্রেনটি সেদিন আপনা-আপনি থেমে গিয়েছিল সেই বুড়ির বটতলা থেকে অল্প দূরে। ট্রেনের সঙ্গে বহু মানুষের সঙ্গে সেদিন আমরা ক’জনও দৌড়েছিলাম মজা পেয়ে। সবার মতো আমিও ভেবেছিলাম সেদিনÑ নিশ্চয়ই বুড়ির বটতলার বুড়ির কেরামতি! অবশ্য রাজবাড়ীর ট্রেনটার মতো মিটার গেজের ওই ট্রেনের যাত্রীরা অক্ষত ছিল না- অনেকেই আতঙ্কে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছিল। শত শত মানুষ এসে ট্রেনটিকে থামানোর জন্য নানানরকম যৌক্তিক ও হাস্যকর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। এই ট্রেনটি নিয়ে পরবর্তীতে আমি একটা গল্প লিখেছিলাম ‘পাগলা ট্রেন’ নামে। দাদাভাই রোকনুজ্জামান খান দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে কয়েকটি কিস্তিতে ছেপেছিলেন সেটা। পরবর্তীতে গ্রন্থভুক্ত হয়।