২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সহিংসতায় ক্ষতি ১৭ হাজার কোটি টাকা ॥ বিশ্বব্যাংক


অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা (২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ফলে ২০১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে, যা স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করলে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারত। এমন তথ্যই দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি এসব তথ্য তুলে ধরে। প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি ধরে রেখে আগামীতে প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে হলে নারীর কর্মসংস্থানে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে এটিই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার প্রধান অথনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, উৎপাদনে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেবা খাত, এ খাতের ক্ষতি ৬৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে শিল্প খাত, এ খাতের ক্ষতি ২৫ শতাংশ এবং তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত, এ খাতের ক্ষতি ৭ শতাংশ। তিনি জানান, আগামী অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি আবার উর্ধমুখী হবে। আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট, প্র্যাকটিস ম্যানেজার শুভম চৌধুরী ও যোগাযোগ কর্মকর্তা মেরেরিন এ মাহবুব। ইউহানেস জাট বলেন, বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভাল করেছে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় সোচ্চার ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, নতুন ব্যাংক আসছে ব্রিকস এবং এআইবি ব্যাংক, এতে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে। আমরা একে স্বাগত জানাই। কেননা, প্রতিবছর অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা বিশ্বব্যাংক বা বর্তমান অন্যান্য সংস্থার পক্ষে সহায়তার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে নতুন ব্যাংক দুটো এই গ্যাপ পূরণ করবে। পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে।

প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বিপত্তির মধ্য দিয়ে গেছে। এ বিপত্তির মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যতম। তারপরও সামষ্টিক ও ব্যাষ্টিক অর্থনীতিতে সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি যে অবস্থায় রয়েছে এটি খারাপ নয়, তবে এ অবস্থা ধরে রাখতে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে অর্থনীতির অনেক সূচক খুবই ইতিবাচক ছিল। সূচকগুলো যেভাবে উন্নতি করছিল তাতে আমরা ধারণা করেছিলাম প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ তো হবেই, তারও বেশি হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নতির সে ধারায় বাধা সৃষ্টি করেছে। আর এ অস্থিরতা দেখা দেয় অর্থনীতির সোনালী সময়। অস্থিরতায় উৎপাদন ক্ষেত্রে ২.২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এ বিষয়ে অনেক ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাব হয়ত আরও বেশি হবে। কিন্তু আমরা মোটামুটি একটি যৌক্তিক হিসাব বের করার চেষ্টা করেছি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ফাঁদে আটকে গেছে। এ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। অর্থাৎ বর্তমান জিডিপির ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ বিনিয়োগ আছে। এটি বাড়িয়ে ৩৩ থেকে ৩৪ শতাংশ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বর্তমানে ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ নারী শ্রমশক্তিতে নিয়োজিত। যদি এটি বাড়িয়ে আগামী দশ বছরে ৪৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে প্রতিবছর প্রবৃদ্ধি বাড়বে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। আর ৭৫ শতাংশে নিতে পারলে বাড়বে ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ৮২ শতাংশে নিয়ে যেতে পরলে প্রবৃদ্ধি ঘটবে ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই একমাত্র সমাধান নয়। তাই টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মুদ্রা বিনিময় হার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রাখা, আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, বেসরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অবকাঠামো খাতে সংস্কার, অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) উন্নয়ন করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৪ সালের মার্চে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, তা ২০১৫ সালের মার্চে কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে। সম্প্রতি খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কিছুটা অস্থিতিশীল হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে আছে। চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে কোন ঋণ নেয়নি। বরং ২৫ মার্চ পর্যন্ত ১০ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা সরকার ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছে। মুদ্রানীতিতে সংযত নীতিমালা অব্যাহত আছে। মুদ্রানীতির যে লক্ষ্য তা থেকে বিচ্যুতির সম্ভাবনা নেই। তবে মুদ্রানীতিতে এত সংযত হয়েছে; যে কারণে ব্যাংক সুদের হার বেড়েছে। এখানে যদি সম্প্রসারণমুখী হতো তাহলে সুদের হার কমত। এটাই স্বাভাবিক ধারণা। তবে বাংলাদেশে সুদের হার অস্বাভাবিক বেশি নয়। তারল্যের তুলনায় সুদের হার আরও কমতে পারত। কিন্তু নানা কারণে সেটি হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে ইউহানেস জাট বলেন, বাজেট সাপোর্ট পেতে হলে সরকারকে বিদ্যুত, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করতে হবে। সেই শর্তেই সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ঘাটতি অর্থায়নের কোন সমস্যা হয়নি। রিজার্ভে হাত দিতে হয়নি। এ থেকে বোঝা যায়, বহির্বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি আছে। তবে রফতানির ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পোশাক খাতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ও ইউরোর দাম কমায় এ চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। টাকার মান ইউরোর তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে গেছে। এতে যারা ইউরোতে রফতানি করছেন তারা টাকা কম পাচ্ছেন, আর যারা ডলারে রফতানি করেন, তাদেরকে ক্রেতারা বলছে দাম কমাও।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: