২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এই সময়ের কবিতা বাংলা ও বাঙালীর হৃৎরচনা


বাংলা ও বাঙালী নিয়ে ভাবনাটা বিশ শতকের ষাট দশকেই প্রকট হয়ে ওঠেছিল। বাঙালীর জাগরণ ঘটেছিল নিজের দিকে ফিরে তাকাবার। তার ভূখণ্ড, তার ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জাতীয়তাবোধ এই সময়ে জাগ্রত হয়ে ওঠে। ‘আমি কে, তুমি কে, বাঙালী, বাঙালী’- এমন স্লোগান প্রকম্পিত হয়েছে রাজপথে। চেতনায় তা নাড়া দিয়েছে প্রতিটি বাঙালীকে। কবি সাহিত্যিক শিল্পীসহ পেশাজীবী বাঙালীর মধ্যে স্বদেশ চেতনা ও স্বদেশীয়ানা ধরে রাখার মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিল। সে সময়ের রাজপথে সেøাগানে কণ্ঠ মেলাতেন তরুণ কবি এক; বাঙালী জাতীয়তাবাদে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেছিলেন। নতুন সাহিত্য আন্দোলনে ব্রতী হয়েছিলেন। গাটছড়া বেঁধেছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে। তাঁর সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকায় সহযোগী হিসেবে নিজেকে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। স্বতন্ত্র ধারায় নিজে প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। অধ্যাপক সায়ীদের সঙ্গ-প্রসঙ্গ এই কবিকে পরবর্তীকালেও অনুপ্রাণিত করেছে। সাহিত্যকর্ম এবং সাহিত্যকর্মী- দুটোই ধারণ করে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের মৌলিক রচনার পাশাপাশি বাঙালী জাতীয়তাবোধ তাড়িত হয়ে বাংলা ও বাঙালীর হৃদয়রচনাকে গ্রন্থিত করেছেন। প্রচুর ধৈর্য, নিষ্ঠা, কর্মকুশলতা, মনন এবং সর্বোপরি যাচাই-বাছাই বোধ তীব্র বলেই একক প্রচেষ্টায় একটি নতুন ধরনের এবং জরুরী ও প্রয়োজনীয় কাজ করে যাচ্ছেন। এর গুরুত্ব যে কতটা তা সময়ই বলে দেবে। কবি ও বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদির নামটি সেই ষাটের দশকের শেষদিকে ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার কারণে চেনা। তারপর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যথেচ্ছ ধ্রুপদ’ প্রকাশের পর নিউমার্কেটের নলেজ হোম থেকে কিনেছিলাম সেই ১৯৭৪ সালে। কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সে বেশ মনোযোগী পাঠকের মতো পড়ে বোঝার চেষ্টা করতে হয়েছে। অন্যরকম কবিতা। অন্যরকম তার ভাষা। কত কম শব্দে কত অর্থবহতা প্রবাহিত করা যায়, তার নমুনা গ্রন্থটিতে পেয়েছি সেকালে, যখন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। শিক্ষকতা ছেড়ে সাংবাদিকতায় এসে তাঁর লেখনী নানা বিষয়কে ধারণ করেছে। হেন বিষয় নেই যা কবি সাযযাদ কাদিরের কলমে ধরা পড়েনি। ছোট গল্প লিখেছেন। ঢাকার বেতার টিভিতে যেমন, মঞ্চেও তাঁর লেখা নাটকের দর্শক হিসেবে দক্ষতা দেখেছি। ইতিহাস থেকে কল্পবিজ্ঞান যার বিষয়, সেই তিনি সত্তর দশকে অনুবাদ করলেন বেস্টসেলার উপন্যাস এরিখ সেগালের ‘লাভস্টোরি’। ব্যাপক কাটতি হয় গ্রন্থটির। আর এ সময়ে ঢাকায় মুক্তি পায় এই কাহিনী নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি। সাযযাদ কাদির নামটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু জনপ্রিয় হবার ইচ্ছে-আকাক্সক্ষা ধাতে নেই বলে নিরলস সাহিত্যচর্চা, গবেষণা এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রচুর গ্রন্থও প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিকতায় কলাম লেখক হিসেবেও নিজের গ্রহণযোগ্যতা পাঠকের কাছে প্রমাণ করেছেন।

‘এই সময়ের কবিতা’ শিরোনামে বাংলা ভাষায় রচিত কবিদের জীবন বৃত্তান্তসহ কবিতা সঙ্কলিত করেছেন তিনিতিনটি খণ্ডে। তিন খণ্ডে মানে ২০১৩ সালে প্রথম খ-টি বেরোয়। ব্যাপক পাঠক সাড়া পাবার পর ২০১৪ ও ২০১৫-তে অপর দুটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ও তার পূর্বকাল হতে সর্বশেষ একুশ শতকের তরুণ কবির কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। সম্পাদক সাযযাদ কাদির প্রথম খণ্ডটি প্রকাশকালে যে চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজটি শুরু করেছিলেন, পরবর্তী দু’খণ্ডে তা আরও প্রসারিত হয়েছে। সর্বশেষ সংখ্যায় কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের কবিতাবিষয়ক সাক্ষাতকার সংযোজন করা হয়েছে।

কেন এই সঙ্কলন প্রকাশ? প্রথম খ-ে উল্লেখ করেছেন, ২০০০ সালে এই সময়ের কবিতা সঙ্কলনের কাজ শুরু করেন। কিন্তু একযুগ পর ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়। সঙ্কলনটি নানা রকম পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রতি খ-ে ১০০ কবির কবিতা রয়েছে। কবির নামের আদ্যক্ষরে দিয়ে সাজানো গ্রন্থটিতে কবির জন্মতারিখ, জন্মস্থান, শিক্ষা, পেশাসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রকাশকালসহ গ্রন্থের নাম রয়েছে। শুধু কবিতা নয়, কবির সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্তও মেলে। যা কবি ও কবিতার অভিধান বা কোষ হিসেবে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হবে। যদিও তথ্য ঘাটতি রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। অবশ্য এসব সংশোধন সম্ভব যথাযথ তথ্য পেলে। শুরুতেই বিশ্ব বাংলার কবিতা বার্ষিকী হিসেবে সঙ্কলনটি প্রকাশের পরিকল্পনা নিলেও প্রতিবছর তা প্রকাশ হচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ থেকে এই একুশ শতকের কবির কবিতার ভাব, ভাষা ও নির্মাণ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসুদের কাছে এই সঙ্কলনগুলো গুরুত্ব বহন করবে। সম্পাদক অবশ্য বলেছেন, বিশ্ব বাংলা ও বাঙালীকে একটি সঙ্কলনের বুকে ঐক্যসূত্রে গাঁথার স্বপ্ন নিয়ে এই সঙ্কলন ত্রয়ী প্রকাশিত। ষাটের দশকের বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও অধ্যাপক সায়ীদের প্রভাবজাত লেখক কবি সম্পাদক সাযযাদ কাদির তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। যেখানে সাহিত্য নিয়ে আলোচনাও হয়। সঙ্কলন ত্রয়ী পাঠকালে এমন অনেক কবিকে পেয়েছি যাদের কবিতা এই প্রথম পাঠ করলাম। আবার অনেককাল আগে পড়া কবিতাও নতুন করে পাঠের সুযোগ হলো। সঙ্কলনটি প্রবহমান বাংলা কবিতার উত্তরণ এবং তার প্রসার ও প্রকাশ ভঙ্গির একটা নিদর্শন। বাংলা কবিতার এক শতকের বেশি সময়ের কবিদের অনেকের নাম বিস্মৃত আজ। অনেকের গ্রন্থ আর মেলে না। সাযযাদ কাদির সেসব কবিদের কবিতাও সংগ্রহ করে ছেপেছেন। গ্রন্থে সন্নিবেশিত কবিতাগুলো কবিদের প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা কিনা। সে প্রশ্ন ভিন্ন। সাযযাদ কাদির প্রবাসে কিংবা সুদূর বিহারে, অসমে বসবাসরত বাঙালী কবিদের কবিতাও সঙ্কলিত করেছেন। সঙ্কলন তিনটি বাংলা ভাষায় রচিত কবিদের কবিতার ও জীবন বৃত্তান্তের আকর গ্রন্থ হিসেবেও গুরুত্বের দাবিদার। সাহস প্রকাশনী সাযযাদ কাদিরের পরিশ্রমকে গ্রন্থবদ্ধ করে একটি সাহসী কাজই করেছেন। প্রতিবছর প্রকাশিত হোক এই ধারার সংকলনটি প্রত্যাশা থাকবেই পাঠকের, কবিদেরও।