১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

নাছির-মনজুরের প্লাস মাইনাস, ভাগ্য নির্ধারিত হবে যেভাবে


মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বিগত নির্বাচনের উল্টোচিত্র বিরাজ করছে। ২০১০ সালে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত এ কর্পোরেশনের নির্বাচনে সরকারী দল আওয়ামী লীগে গ্রুপিং ও বিরোধিতা থাকায় দলের সমর্থিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। পক্ষান্তরে বিরোধী দল বিএনপিতে গ্রুপিং থাকলেও প্রার্থিতা নিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলমের বিজয় নিশ্চিত হয়। ওই নির্বাচনের পর ক্ষমতার মেয়াদ শেষে আগামী ২৮ এপ্রিল এ কর্পোরেশনের নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আসন্ন এ নির্বাচনকে ঘিরে এবার উল্টোচিত্র লক্ষণীয়। আওয়ামী লীগ কোন্দল বাদ দিয়ে ঐক্যের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছে। পক্ষান্তরে বিএনপিতে প্রার্থিতা নিশ্চিতকরণ নিয়ে বিরোধিতা থাকায় তা নিয়ে নীরব গ্রুপিং ও বিরোধিতার জন্ম নিয়েছে, যদিও তার প্রকাশ্য বিস্ফোরণ ঘটেনি। এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির পক্ষে নগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ডাঃ শাহাদাত হোসেন ছিলেন অন্যতম প্রার্থী। তিনি বহু আগে থেকেই তাঁর প্রার্থিতার বিষয়টি মিডিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ছিটকে পড়তে হয়েছে। ২০১০ সালের নির্বাচনেও তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু রাজনীতির জটিল সমীকরণে ওই নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী ঘরানার এম মনজুর আলমকে ভাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে তাঁকে মেয়র পদে সমর্থন দেয় এবং তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রীতিমতো চমকও সৃষ্টি করেন।

ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথা মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরাজয়ের নেপথ্যে কাজ করেছিল দলের গ্রুপিং ও কোন্দল। স্থানীয় শীর্ষপর্যায়ের কয়েক নেতা অনেকটা প্রকাশ্যেই মহিউদ্দিনের বিরোধিতা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েক নেতা জমিজমা বিষয়ক বিরোধকে কেন্দ্র করে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিপক্ষে চলে গেলে দলীয় গ্রুপিংয়ের সঙ্গে তাদের সংযোগ ঘটে। ফলশ্রুতিতে নির্বাচনে তিনি হেরে গিয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন। যা শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশজুড়ে কোন মহলের কাক্সিক্ষত ছিল না। এর প্রধান কারণ, মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্রবীণ এবং শক্তিশালী একজন নেতা। আর মনজুর আলম ছিলেন তারই শিষ্য এবং টানা তিনবারের নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার। ওই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত অনেকের ধারণায়ও আসেনি মনজুর আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশ পেলে দেখা গেল, তিনি প্রায় ৯৫ হাজার ভোটে বিজয়ী হয়েছেন।

জানা যায়, মনজুর আলম বিএনপির কার্যক্রম নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী যেমন ছিলেন না, তেমনি নেতৃবৃন্দও তাঁকে কাছে টেনে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শীর্ষ নেতার সংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী ছিলেন না। যে কারণে মনজুরকে নিয়ে একটি কথা চালু হয় যা হচ্ছে- তিনি ‘না ঘরকা না ঘটকা’। মেয়র পদে বিএনপির সমর্থনে আসীন থাকলেও তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী, জন্মদিন থেকে শুরু করে সবকিছুই পালন করেছেন নির্বিঘেœ। এটা নিয়েও বিএনপির অভ্যন্তরে তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তির কমতি ছিল না। চট্টগ্রামে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা অন্যতম তাঁদের কেউই এ নির্বাচনে কোন না কোন কারণে অংশ নিতে নারাজ। কারণ তাঁদের মধ্যে প্রায় সবাই অতীতে মন্ত্রিত্বের পদে আসীন ছিলেন। এর পাশাপাশি দলীয় গ্রুপিংতো রয়েছেই। এক্ষেত্রে মনজুর আলম কোন গ্রুপের কাছে একক হয়ে কাজ করেননি, যে কারণে স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের সকলের সহচার্য তিনি লাভ করে গেছেন। কিন্তু নগর বিএনপির একটি অংশ ডাঃ শাহাদাতের পক্ষে থাকায় তাঁরা ছিলেন মনজুর আলমের বিরোধী। কিন্তু সার্বিক দিক বিবেচনায় এনে দলের হাইকমান্ড আবারও মনজুর আলমকে মেয়র পদে সমর্থন দিয়েছে। ২০ দলীয় জোটও এ সমর্থনে শরিক হয়েছে। তবে নীরবে যে গ্রুপিং ও কোন্দল তার অবসান ঘটেছে বলা যাবে না।

সঙ্গত কারণে এবারের নির্বাচনে গতবারের বিপরীত চিত্রই দৃশ্যমান। গতবারের নির্বাচনে দলের বিরোধী একটি অংশ মহিউদ্দিনের ভাগ্য বিপর্যয়ের জন্য যেমন দায়ী বলে চিহ্নিত তেমনি এবার মনজুর আলমের ভাগ্যেও অনুরূপ কিছু হলে তা অনুরূপ ঘটনারই অবতারণা বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে চট্টগ্রামে দু’দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাল্লা প্রায় সমান সমান। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা প্লাস পয়েন্টে রয়েছেন যে, তাঁরা ক্ষমতায়। পক্ষান্তরে বিএনপির দুর্ভাগ্য যে, সরকারবিরোধী টানা অবরোধ-হরতাল করতে গিয়ে যে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে তাতে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী মামলার আসামি হয়ে কেউ জেলে, কেউ গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে। আবার অনেকে মাঠে নামতে সাহসও হারিয়ে ফেলেছে। এসব বিষয় মনজুর আলমের জন্য মাইনাস পয়েন্ট হিসেবে এখনও কাজ করছে। আ জ ম নাছিরের প্লাস পয়েন্ট আর মনজুর আলমের মাইনাস পয়েন্ট ছাড়াও এবার নতুন ভোটার হয়েছে প্রায় সোয়া লাখ। এছাড়া এবারের নির্বাচন সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে দেয়া হয়েছে। গেলবার ছিল সরকারী ছুটির আগের দিন। আর নির্বাচনের দিন ছিল ছুটি, যে কারণে চট্টগ্রামের বাইরের যেসব লোকজন কর্পোরেশন এলাকায় কাজ করেন এবং ভোটার হয়েছেন তারা টানা কয়েক দিনের ছুটি পেয়ে নিজ নিজ বাড়িঘরে চলে যান।

এ কারণেও ওই সময়ের সরকারী দল সমর্থিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে একটি বড় অংশের ভোট কোন কাজে আসেনি। গেলবারের ওই চিত্র বিবেচনায় এনে এবার সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে ভোটের দিন নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন- এ কথা স্বীকার করেছেন আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। এছাড়া মনজুর আলমের এক টার্ম কর্মকালীন প্লাস মাইনাস পয়েন্ট দু’টোই রয়েছে। পক্ষান্তরে আ জ ম নাছির উদ্দিনের এ পদের কর্মের জন্য কোন মাইনাস পয়েন্ট নেই। কেননা, তিনি প্রথমবারের মতো এ পদে নির্বাচন করছেন। সব মিলিয়ে প্লাস মাইনাস, দলীয় সমর্থন, নতুন ভোটার, সচেতন ভোটার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েই মেয়র পদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে বলে রাজনৈতিক মহলের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা।