১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কেন এমন করল লুবিৎজ?


গত কয়েকটি দিন ধরে বিশ্বের সব মিডিয়ায় আন্দ্রিয়াজ লুবিৎজের নাম বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। এটাই চেয়েছিল লুবিৎজ। দেড়শ’ প্রাণের বিনিময়ে আজ সর্বত্র লুবিৎজের নাম! তাকে পৃথিবীর মানুষ জানবে, তার কথা বলবে, এমনটাই আশা ছিল তার। আর সেই আশা পূরণ করতেই বেছে নিয়েছিল প্লেন ক্রাশ ঘটানোর মতো জঘন্য পথ। ফান্সে আল্পস পর্বতমালায় বিধ্বস্ত জার্মানউইংসের যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনায় কো-পাইলট লুবিৎজসহ ১৫০ যাত্রী মারা যায়। আর এর মধ্য দিয়েই ২৮ বছর বয়সী লুবিৎজ নিজেকে সারাবিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলতে পেরেছে। তবে ভিলেন হিসেবে। অনেকেই লুবিৎজকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করছেন। বিমান দুর্ঘটনায় পোড়া লাশের গন্ধে যখন বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে, যখন স্বজন হারাদের আর্তনাদে প্রকৃতিও শোকার্ত হয়ে উঠেছে, তখন তদন্তকারীরা লুবিৎজের আত্মঘাতী হামলার কথা প্রকাশ করে মানুষকে বিস্মিত, মূঢ় করে দিয়েছে। জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের। লুবিৎজের সঙ্গে সঙ্গে জার্মানউইংশ কর্তৃপক্ষের দিকেও যাচ্ছে অভিযোগের তীর।

একজন মানসিক রোগীকে কিভাবে বিমানের কো-পাইলট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, তা নিয়ে প্রশ্নবান ছুটে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের দিকে। ডাক্তাররা তার মানসিক রোগের সার্টিফিকেট দিলেও, সে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে তা লুকিয়ে রেখেছিল বলে অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে জার্মানউইং। কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষার সার্টিফিকেট কেন লুবিৎজ বহন করবে, তা কেন ডাক্তার ও বিমান কর্তৃপক্ষের মধ্যে সরাসরি আদান-প্রদান হয়নি। এসব প্রশ্নের সদুত্তর মিলছে না। তবে মিলছে লুবিৎজের এ হীন কর্ম করার মূল কারণ।

বিমান দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারীরা বিমানের যাত্রীদের ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেয়া শুরু করেন। এবং কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ার মতোই চাঞ্চল্যকর সূত্রের সন্ধান পেয়ে যান তারা কো-পাইলট লুবিৎজের ফেসবুক এ্যাকাউন্ট ঘাটতে ঘাটতে। লুবিৎজ সম্পর্কে নানা বিচিত্র তথ্য খুঁজে পায় তারা। ছোটবেলা থেকেই লুবিৎজ পাইলট হতে চেয়েছিলেন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে এলএসসি ওয়েস্টারওয়ার্ল্ড বিমান চালনা ক্লাবে প্রশিক্ষণের জন্য যোগ দিয়েছিল লুবিৎজ। লেখাপড়া শেষ করে বিশ বছর বয়সে জার্মান বিমান সংস্থা লুফথানসায় প্রশিক্ষণার্থী বিমানচালক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর কো-পাইলট হিসেবে কাজ করলেও পাইলট হতে পারছিল না লুবিৎজ। এই না পারাটা তাকে দিন দিন বিষণœ করে তুলছিল। বিষণœতা একটা সময় তাকে করে তুলেছিল মানসিক রোগী । এর চূড়ান্ত পরিণতি এই জঘন্য কর্ম।

এছাড়া লুবিৎজের প্রাক্তন প্রেমিকার জার্মানীর একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকার থেকেও বোঝা যায়, লুবিৎজ মানসিক বিষণœতায় ভুগছিলেন। নিজের মানসিক রোগের কারণে পাইলট হওয়ার বাসনা পূরণ না হওয়ায় মানসিক বিষণœতা তাকে পেয়ে বসেছিল। এরসঙ্গে নিজেকে সারাবিশ্বের কাছে পরিচিত করার বাসনা যুক্ত হয়ে তার মাঝে এরকম হীনবৃত্তি তৈরি করেছিল। এই দুটি কারণের সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে নতুন আরেকটি কারণ। সেটা হলো, সবে ধন নীলমণি কো-পাইলটের চাকরি হারানোর ভয়। নিজের মানসিক অসুস্থতার কথা জানাজানি হলে চাকরি হারিয়ে ফেলতে পারেন, এই ভাবনাও তাকে প্ররোচিত করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। লুবিৎজ কোন ডায়েরি রাখত না। কিন্তু তার হাতের লেখা একটি ছোট্ট কাগজে নিজের হতাশার কথাই ব্যক্ত করেছে সে। মানসিক রোগ তার স্বপ্ন পূরণের পথে শুধু বাধাই নয়, চাকরিই চলে যেতে পারে, ভবিষ্যতের এই দুর্ভাবনা তাকে আরও বেশি বিষণœ করে তুলছিল। সে তার রোগ সারানোর জন্য বেশ কয়েকজন ডাক্তারেরও শরণাপন্ন হয়েছিল। কিন্তু কোনভাবেই কমছিল না তার অসুস্থতা। এজন্য লুবিৎজ আত্মহত্যা কিংবা ইচ্ছাকৃত প্লেন দুর্ঘটনা ঘটনোর পরিকল্পনা আগেই করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন বিদেশী মিডিয়ায় লুবিৎজের শৈশবের এবং বিমান প্রশিক্ষণকালীন সময়ের হাসিখুশি ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব ছবি দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কষ্টকর যে, এই ছেলেটির মাঝে এত বড় পৈশাচিক সত্তা আছে, এত জঘন্য কর্ম সে করতে পারে কিন্তু সে করেছে। এটাই সত্য। যা জার্মানীর বিমানসংস্থার দুর্বলতা।