১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

দ্য বয়েজ ইন দ্য বোট


ত্রিশ দশকের বিশ্বমন্দায় আমেরিকানরা যখন হাপিত্যেশ করে দিন গুজরান করছিল, তখন তাদের মাঝে আশার বাণী ছড়িয়েছিল ১৯৩৬ সালের অলিম্পিক গেমসে নৌকাবইচ দলের সোনা জয়। পুরো জাতি আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল কিছু সময়ের জন্য। হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত, কাজ হারানো মানুষের চিত্তে নতুন করে জেগে ওঠার প্রেরণা দিয়েছিল সে বিজয়। উজ্জীবিত করে তুলেছিল জীবনসংগ্রামের লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়ার। শুধু খেলা জয়ের মধ্যে এই বিজয়ের প্রভাব সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো একটি জাতির ওপরই প্রভাব তৈরি করেছিল ব্যক্তিক ও সামষ্টিকভাবে। সেই বিজয়ের খুঁটিনাটি নিয়েই ড্যানিয়েল জেমস ব্রাউন লিখেছেন ‘বয়েজ ইন দ্যা বোট’ বইটি। নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার এই বইটি নন-ফিকশনধর্মী।

সাক্ষাৎকার ও ডকুমেন্ট বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে জেমস ব্রাউন এই বইটি রচনা করেছেন। বইটিতে তিনি সে সময়কার অর্থনীতি, রাজনীতি, মানুষের জীবনধারাসহ বিভিন্ন বিষয় এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই অলিম্পিক খেলার স্থানটি। পাঠক যেন দেখতে পায়, আটজন প্রতিযোগী নৌকা চালাচ্ছে, তাদের চোখে-মুখে জয়ী হওয়ার তীব্র বাসনা খেলা করছে। কোচ তাঁদের জোরে জোরে নির্দেশনা দিয়ে চলছেন, আর তাঁরা প্রত্যয় নিয়ে সে নির্দেশনা পালন করছেন সর্বশক্তি নিয়ে। একে একে সব প্রতিযোগী নৌকাবাইচে হারিয়ে তাঁরা বিজয়ী হয়েছেন। পুরো গ্যালারির দর্শকরা আনন্দে মাতম করছে। সোনার মেডেল নিতে বিজয়ী মুখগুলো মঞ্চে উঠছে এবং তা হিটলারের সামনেই। এই জয়ের মধ্যে দিয়ে সেই আটজন খেলোয়াড় যেন দোর্দ-প্রতাপশালী হিটলারকে পরাজিত করে ফেলছে। পাঠকের চোখে এভাবেই সে সময়টাকে দেখিয়ে দেন জেমস ব্রাউন। ঠিক সিনেমার থ্রিলারের মতো করে তিনি পাঠকের সামনে তাঁর নন-ফিকশন এই বইটিকে উপস্থাপন করেছেন।

জেমস ব্রাউন এই বইটি লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন প্রতিবেশী মধ্য ষাট বয়সী নারী জুডি নাম্নী এক নারীর কাছ থেকে। জুডির কাছ হতেই জানেন যে, তার বাবা ১৯৩৬ সালের অলিম্পিক মেডেল জয়ী দলের একজন খেলোয়াড় ছিলেন। নাম জোয়ি রানটজ। ব্রাউন তঁাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন। জানতে পেরেছিলেন সে অলিম্পিকের অনেক খুঁটিনাটি। সেই সাক্ষাৎকার তাকে এই বিষয়টি নিয়ে বই লিখতে উৎসাহিত করেছিল। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট আরও অনেকের সাক্ষাতকার নিয়ে ও তথ্য ঘেঁটে সেগুলোকে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যেমে বইটি রচনা করেছেন।

নৌকাবাইচের আটজন খেলোয়াড় মধ্যে জোয়ি রানটজ ছিলেন অন্যতম। জোয়ির শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। লাঞ্ছনা-যাতনা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সৎমায়ের সংসারে প্রতিনিয়ত অত্যাচার-বঞ্চনা তাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছিল। অভাব-অনটন, নিপীড়নের মধ্যে দিয়েই বেড়ে ওঠেন জোয়ি। আত্মপ্রত্যয়ী কিশোর জোয়ি সব প্রতিকূলতাকে জয় করে নেন। জীবনসংগ্রামে তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস ছিল কিশোরী জয়েস। সুন্দরী জয়েসের ভালবাসা জোয়িকে শক্তি যুগিয়েছিল সকল প্রতিকূলতাকে টপকে যেতে। জোয়ি নৌকা চালাতে ভালবাসতেন। বেশ দ্রুতগতিতে নৌকা চালানোর দক্ষতাই তাকে নৌকাবাইচ খেলোয়াড়ে পরিণত করে। কাঠুরে, জাহাজঘাটার শ্রমিক আর কৃষকদের সন্তানদের নিয়ে গড়া নৌকাবাইচ দলের অন্যান্য খেলোয়াড়দের সমন্বিত চেষ্টায় তারা একের পর এক প্রতিযোগিতায় জিততে থাকে। অভিজাত শ্রেণীর খেলোয়াড়দের তারা হারাতে থাকে। একটা সময় তারা অলিম্পিক গেমসেও অংশগ্রহণ করে। এই গেমসে সোনার মেডেল জয় করে পুরো জাতিকে তারা আনন্দে ভাসিয়েছিল। জোয়ির জীবন আখ্যান তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে ব্রাউন সে সময়কার মানুষের দুরবস্থা বিশেষ করে বিশ্বমন্দায় পতিত মানুষের করুণ দশার চিত্রই শুধু আঁকেননি, তিনি তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের চিত্রও এঁকেছেন।

পুরো টুর্নামেন্টে অনেক ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনার অন্তরালেও অনেক ঘটনা ঘটেছিল। সেসব ঘটনা জেমস ব্রাউন তাঁর এই বইটি তুলে ধরেছেন। অলিম্পিক গেমসকে নিয়ে যে রাজনীতি হয়েছিল সে আঁচ ব্রাউনের এই বইটিতে পাওয়া যায়। ইহুদীবিদ্বেষী দোর্দ-প্রতাপশালী হিটলারের দেশ জার্মানির বার্লিনে সেই অলিম্পিক গেমসটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গেমসটির ওপর বিশ্ববাসীরই নজর ছিল। কেননা সে সময়টা জার্মানির দম্ভে সারাবিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠছিল। সেই জার্মানিতেই গেমসটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় একে ঘিরে চলছিল বেশ জল্পনা-কল্পনা। হয়েছিল অনেক ষড়যন্ত্র। পাতানো খেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল রাজনৈতিকভাবে আমেরিকাকে হেয় করার জন্য। হিটলারের মন্ত্রী গোয়েবল এ নিয়ে অনেক মিথ্যাচার করেছিলেন। এতে তার স্ত্রীও কম যাননি। কিন্তু সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমেরিকার হতদরিদ্র তরুণরা হিটলারের সামনেই তার দেশ থেকে সোনার মেডেল জয় করে নেয়। হিটলারকে তারা খেলার মধ্যে দিয়েই ধরাশায়ী করেছিল সেদিন। জেমস ব্রাউন তার এই বইটিতে সে কাহিনীই অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেন। বইটি আমেরিকান তরুণদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে। সে সময়কার আট তরুণ কিভাবে অদম্য প্রচেষ্টায় নৌকাবাইচ খেলায় সোনার মেডেল জয় করে হিটলার তথা পুরো জার্মানিকে পরাজিত করেছিল, সে কাহিনী তরুণ পাঠকদের মনে বেশ কাটতে সক্ষম হয়েছে। এটি কোন থ্রিলারধর্র্মী বই কিংবা উপন্যাস নয়। সাক্ষাতকার ও তথ্যভিত্তিক বই। তবুুও ঘটনার গভীরতা আর রচনার নিপুণতা পাঠককে বইটির প্রতি বেশি আকৃষ্ট করেছে। তাই তো জেমস ব্রাউন রচিত এই বইটি উঠে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের তালিকায়।