১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়াই অহঙ্কার


সাজেদ রহমান, যশোর থেকে ॥ স্বীকৃতি না পেলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়ার অহঙ্কার নিয়েই বেঁচে আছেন মোকছেদ আলী শিকারি। দেশমাতৃকার টানে একাত্তরে যে হাতে ছিল থ্রি নট থ্রি দেশ স্বাধীনের পর জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে মোকছেদ আলী শিকারি সেই হাতে তুলে নেন কাস্তে, কোদাল আর ঝুড়ি।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক দেন দরবার করে আজও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি তিনি। তাই তিনি পান না কোন ভাতা কিংবা কোন সুযোগ-সুবিধা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোকছেদ আলী শিকারি বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জের বারইখালী ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সুতালড়ী গ্রামের মৃত এরফান উদ্দীন শিকারির ছেলে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ চোখের জ্যোতি হারানো মোকছেদ আলী শিকারি অর্থকষ্টে স্ত্রী আর নাতনিকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকার টানে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া ২২ বছরের টকবগে তরুণ মোকছেদ আলী শিকারি আজ যশোর শহরের একটি বেসরকারী কলেজের সাইকেল স্ট্যান্ডের নামমাত্র বেতনে পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোকছেদ আলী শিকারি ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার স ম কবির আহম্মেদ মধুর নেতৃত্বে সুন্দরবন শিবিরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে সাব সেক্টর কমান্ডার স ম কবিরের কাছে অস্ত্র জমা দেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী স্বাক্ষরিত দেশরক্ষা বিভাগের স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র প্রাপ্ত হন। এ সনদপত্র ইস্যু নম্বর কেএইস-২০৫৮৩১, সনদপত্র ক্রমিক নম্বর ১৫১৮৪২। যে সনদপত্র বাগেরহাট ক্যাম্প থেকে ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ প্রদান করা হয়।

মোকছেদ আলী শিকারী একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত ও সমাদৃত। অভাবের তাড়নায় কাজের আশায় দেশ স্বাধীনের পাঁচ বছর পর যশোরে আসেন। যশোরে এসে হাতে কাস্তে, কোদাল আর ঝুড়ি সঙ্গে নিয়ে দিনমজুরের কাজ করে দিন কাটাতেন তিনি। এ সময় তিনি নাজির অহেদ মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় পান। কিছুদিন পর যশোর সদরের নওদাগা গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকীর বাগানবাড়ী দেখাশোনার দায়িত্ব পান। প্রায় ২৭ বছর ধরে এ বাগানবাড়িতে বাস করে নিষ্ঠার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বর্তমানে বাগানবাড়ি দেখাশোনার পাশাপাশি যশোর পালবাড়ীর একটি বেসরকারী কলেজে সাইকেল স্ট্যান্ডের পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করছেন।

সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা মোকাম্মেল হোসেন ফকির গেজেট নম্বর ৩০৫৫, শাহ আলম বাবুল গেজেট নম্বর-৩০২৫, আবদুল জলিল খান গেজেট নম্বর- ৩০৫৩, মজিবর আকন গেজেট নম্বর-২৯৫০, আশ্বাব আলী গেজেট নম্বর-২৯৫৭, সেকেন্দার আলী গেজেট নম্বর-৩০৬৬, মুনছুর খান গেজেট নম্বর-৩১৪১ বাদশা হালদার গেজেট নম্বর ৩০৪০, নাছির আহমেদ সাখাওয়াত হোসেন সকলের সঙ্গেই কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এলাকায় না থাকার কারণে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোকছেদ আলী শিকারি মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী স্বাক্ষরিত স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্রপ্রাপ্ত হলেও চূড়ান্ত মুক্তিযোদ্ধার সনদ পাননি। মুক্তিযোদ্ধা গেজেটভুক্ত হয়ে মোকছেদ আলী শিকারি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন আশাবাদ ব্যক্ত করেন সহযোদ্ধারা। একই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জের বারইখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আউয়াল খান মহারাজ। একই আশাবাদ ব্যক্ত করেন যশোরে আশ্রয় দেয়া নওদা গ্রামের বাসিন্দা যশোর পুলিশ বিভাগ থেকে এলপিআর এ যাওয়া আবু বক্কর সিদ্দিকী। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও অনেকেই গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সরকারী সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তারা অজ্ঞতা আর অর্থ ও লোকবলের অভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না। এটা জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য। তিনি মোকছেদ আলী শিকারির মতো সকল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি চান।

দারিদ্র্যতার যাঁতাকলে পিষ্ঠ বয়সের ভারে ন্যুব্জ মোকছেদ আলী শিকারির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনতে চাইলেই তেজোদীপ্ত কণ্ঠে অন্যরকম আবেগে বলে চলেন দেশমাতৃকা রক্ষায় সহযোদ্ধাসহ তার বীরত্বগাঁথা। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নেয়া গর্বের ব্যাপার। স্মৃতিময় অতীত নিয়ে কথা বলতে বলতে একসময় ডুকরে কেঁদে ওঠেন। আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে ওঠেন সহযোদ্ধারা অনেকেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেয়ে মনোকষ্ট নিয়ে বেঁচে আছেন আবার অনেকেই মারা গেছেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার গৌরব নিয়েই বেঁচে আছি। তিনি মরে যাওয়ার আগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করেন।