২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বাংলাদেশকে না জানিয়েই টিপাইমুখ বাঁধের নক্সা পরিবর্তন হচ্ছে


রশিদ মামুন ॥ বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখেই টিপাইমুখ জলবিদ্যুত প্রকল্পে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ভারত। পরিবর্তনে বাংলাদেশের ওপর কী কী প্রভাব পড়তে পারে, তা এখনও নিশ্চিত করেনি দেশটি। বরাক থেকে পানি প্রত্যাহারে বাংলাদেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় ভারতের অসহযোগিতায় যৌথ সমীক্ষাও হচ্ছে না।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশে টিপাইমুখের প্রভাব নিরূপণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হচ্ছে উন্মুক্ত এবং ইন্টারনেটের তথ্যর ওপর। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের অভাবে টিপাইমুখে ড্যাম নির্মাণে বাংলাদেশের ওপর পরিবেশগত প্রভাবে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। ভারতের অসহযোগিতায় যৌথ সমীক্ষা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ শুক্রবার সন্ধ্যায় জনকণ্ঠকে বলেন, ভারত যৌথ সমীক্ষা করবে কি করবে না, এ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। আমরা এখন যৌথ সমীক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে এককভাবে সমীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের ‘একাডেমিক নলেজ শেয়ারিং’ এর জন্যও এটা দরকার। আমাদের কী ক্ষতি হবে না হবে, সেটা আমাদের নিজেদের জানতে হবে। প্রকল্পে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছেÑ এ বিষয়ে বাংলাদেশ কিছু জানে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগেই তো বললাম তাদের সঙ্গে আমাদের যৌথ সমীক্ষাটি আর হচ্ছে না।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে বরাক নদীর ওপরে টিপাইমুখ বাঁধ তৈরি হলে বাংলাদেশের ওপর তার কী প্রভাব পড়তে পারে সেটি নির্ণয় করার জন্য দুই দেশ একটি যৌথ সমীক্ষার জন্য একমত হয়। জানা যায়, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) এবং সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল এ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফর্মেশন সার্ভিসেসকে (সিইজিআইএস) পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করে। একই বছর আগস্টে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে দুই দেশের সাব গ্রুপের আলোচনায় যৌথ সমীক্ষার কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়। ওই সময় জানানো হয়, ভারত এই সমীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করবে। টিপাইমুখে ড্যাম নির্মাণে কৃষি, মৎস্য, নৌ-চলাচল, পরিবেশের ওপর প্রভাব নিরূপণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। বলা হয়েছিল দুই বছরে এই যৌথ সমীক্ষার কাজ শেষ হবে। সেই হিসেবে আইডব্লিউএমের সমীক্ষার সময়সীমাও গত ২৪ জানুয়ারি শেষ হয়েছে আর সিইজিআইএসের সময় শেষ হচ্ছে আগামী জুনে। কিন্তু এখন এসে এই সমীক্ষা থেকে সরে আসার কথা বলা হচ্ছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে টিপাইমুখ জলবিদ্যুত প্রকল্পের সমীক্ষার অগ্রগতি পর্যালোচনায় এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে জানানো হয় ভারত তথ্য না দেয়া পর্যন্ত সমীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন বৈঠকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এতে বলা হচ্ছে, ভারতীয় পক্ষ তাদের জানিয়েছে বর্তমান আঙ্গিকে টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা নাও হতে পারে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু সমস্যার কারণে পরিবর্তন আনা হতে পারে। পরিবর্তিত তথ্য-উপাত্ত চূড়ান্ত হলে তা বাংলাদেশকে জানানো হবে।

সূত্র জানায়, পদ্মা এবং তিস্তায় ভারত পানি অপসারণ করায় দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুময়তা দেখা দিয়েছে। গঙ্গার সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি থাকলেও তিস্তায় এখনও এমন চুক্তি করে ওঠা সম্ভব হয়নি। যদিও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সফরের মধ্য দিয়ে তিস্তা সঙ্কটের বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছে। ঢাকা থেকে ফিরে মমতা তিস্তার বিষয়ে উদ্যোগী হতে কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠি দিয়েছেন। একই সঙ্গে টিপাইমুখে জলবিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের আগেই বাংলাদেশের ওপর প্রভাব নিরূপণ করা জরুরী।

যে কোন পরিস্থিতিতে টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ করার বিষয়ে ভারত বদ্ধপরিকর। এ অঞ্চলে ২২ হাজার হেক্টর বনভূমির ৭৮ লাখ গাছ কেটে ফেলার জন্য আবেদন ভারতের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বন উপদেষ্টা কমিটি অনুমোদন করেনি। তবে ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় যদি প্রয়োজন মনে করে তাহলে বন উপদেষ্টা কমিটির এ সুপারিশ অগ্রাহ্য করতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারে। আর এটা করা হলে বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাক নদীর উজানের অববাহিকা অঞ্চলটিতে মূলত আদিবাসীদের বসবাস। অধিকাংশ অধিবাসীর পেশা কৃষি। বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা এই অঞ্চলটি ভারতের অন্যান্য অংশের চেয়ে অনগ্রসর। এ অঞ্চলের উন্নতির জন্য শক্তির সরবরাহ এবং কৃষির বিকাশে সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ১৯৫৫ সালে টিপাইমুখে বরাক নদীর ওপর ড্যাম নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়।

টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় ১৯৯৩ সালের দিকে কিন্তু ভারতের কিছু অঞ্চলসহ বাংলাদেশের নদী-প্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাবের কথা আলোচিত হওয়ায় প্রস্তাবনাটির কিছুটা স্তিমিত হয়। যদিও পরবর্তীকালে ভারত আবার প্রকল্পের নির্মাণপ্রক্রিয়া শুরু করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিপাইমুখ জলবিদ্যুত উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব বিচেনায় আনা হয়নি। ফলে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের মোট আয়তনের ছয় ভাগ হাওড় এলাকাসহ মেঘনা অববাহিকায় দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় তৈরি হবে। জনগণের প্রতিবাদকে গুরুত্ব না দিয়ে গায়ের জোরে টিপাইমুখ ড্যাম করা হলে তা হবে পরিবেশ, প্রতিবেশ জলপ্রবাহ ও প্রাণীবৈচিত্র্য বিষয়ক আন্তজার্তিক আইনসমূহের লঙ্ঘন। এছাড়া টিপাইমুখ প্রকল্প যেখানে নেয়া হয়েছে সে এলাকাকে বিশেষজ্ঞরা ভূমিকম্পপ্রবণ বলে উল্লেখ করেছেন।

কৃষি ও পরিবেশের ওপর সবচেয়ে প্রভাব পড়বে। কারণ হাওড় অঞ্চলে গভীর পানিতে টিকে থাকা মুমূর্ষু ধান, বৈচিত্র্য ও মাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। হাওড়ের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করচগাছ, জলাবন করচের বাগ হারাবে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। টিপাইমুখ বাঁধের ফলে হাওড় অঞ্চলে পানি প্রবাহের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়বে, ফলে উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: