২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

গেইলের খেইল


গেইলের খেইল ক্রিকেট বিশ্ব কম দেখেনি। টেস্টে ৩৩৩, টি২০তে ১১৭, ক্লাব টি২০তে অপরাজিত ১৭৫ রানের ব্যক্তিগত ইনিংস। তিন ভার্সনে ৩৭৪ ছক্কা। দু-দুটি ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানো রোহিত শর্মার দিকে তাকিয়ে তবু আফসোস হতো। সেটিও পূর্ণ হলো। তাও বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ টুর্নামেন্টে! বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরির অনন্য কীর্তি গড়লেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং-দানব। ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্যানবেরায় ২১৫ রানের অতিমানবীয় ইনিংস উপহার দেন তিনি। ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট্রে ট্রিপল সেঞ্চুরি, ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি ও টি২০তে সেঞ্চুরির বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ৩৫ বছর বয়সী বাঁহাতি উইলোবাজ।

১৪৭ বলের ইনিংসটি ছিল ১০টি চার ও ১৬টি ছক্কা দিয়ে সাজানো। বিশ্বকাপে এটাই ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান ও ডাবল সেঞ্চুরির প্রথম ঘটনা। রেকর্ড গড়ে গেইলের ফর্মে ফেরার দিনে নির্ধারিত ৫০ ওভারে তার দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২ উইকেটে ৩৭২ রানে পাহাড় গড়ে, পায় ৭৩ রানের বড় জয়। রেকর্ড পার্টনারশিপ জুটির পথে সেঞ্চুরি তুলে নেন সঙ্গী মারলন স্যামুয়েলসও। বিশ্বকাপে তার আগের দুই ইনিংসে করেন ৩৬ ও ৪ রান। গেইলকে নিয়ে তাই কথা হচ্ছিল। সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ তারকা। জবাব দিয়ে ফেরেন নিজের মতো করে। গড়েন নব-ইতিহাস। কেবল ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংসই নয়, গেইলের অবিশ্বাস্য ব্যাটিংয়ের দিনে স্যামুয়েলসের সঙ্গে জুটিতে সর্বোচ্চ রানসহ রেকর্ড হয়েছে আরও কয়েকটি। ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলার পথে ব্রায়ান লারার (১০,৩৪৮) পর দ্বিতীয় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান হিসেবে ৯ হাজার রানের মাইলফলক অতিক্রম করেন গেইল (৯,০৮৪)। ২৬৬তম ওয়ানডেতে এটি তার ২২ নম্বর সেঞ্চুরি ইনিংস। বিশ্বকাপে আগের সর্বোচ্চ ছিল গ্যারি কার্স্টেনের। ১৯৯৬-এ ওয়ালপিন্ডিতে আরব আমিরাতের বিপক্ষে ১৮৮ রানে অপরাজিত ছিলেন সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান তারকা। ১৮৩, ১৮১ ও ১৭৫* রান নিয়ে রেকর্ডের তালিকায় পরের তিনটি স্থানে আছেন যথাক্রমে সৌরভ গাঙ্গুলী (১৯৯৯), ভিভ রিচার্ডস (১৯৮৭) ও কপিল দেব (১৯৮৩)।

ক্যানবেরার মানুকা ওভালে গেইলের ইনিংসটা ঠিক তার মতো ছিল না। সাধারণত শুরু থেকেই প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে থাকেন ৩৫ বছর বয়সী জ্যামাইকান তারকা ব্যাটসম্যান। ফর্মে ফিরতে কাল শুরু করে দেখেশুনে। প্রতিপক্ষ ফিল্ডার ও বোলারদের বদান্যতায় একাধিকবার জীবনও পান, যেটির সদ্যবহার করেন রেকর্ড গড়ে! ২৬ বলে ২৪ রান করা গেইল হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ৫১ বলে, ৪ চার ও ২ ছক্কায়। এমনকি সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতেও ছিলেন ধীরস্থির। ১০৫ বলে সেঞ্চুরি পূরণের পথে চার ও ছক্কা মারেন সমান ৫টি করে। সেই তিনিই ২১৫ রানে শেষ করেন ১৪৭ বলে! ভয়ঙ্কর মূর্তিটা ফুটে ওঠে তখনই। যেখানে চারের চেয়ে ছক্কা বেশি (এবি ডিভিলিয়ার্স ও রোহিত শর্মার সঙ্গে রেকর্ড ১৬টি ছক্কা), সেই ইনিংস কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে মাঠে উপস্থিত ও টিভির সামনে দর্শকরা তা দেখেছেন। পরের শতরান যোগ করার পথে গেইলের ব্যাটিংকে হাইলাইটস বলেই ভ্রম হয়েছে।

গোটা ইনিংস ছিল গেইলের কীর্তিগাথায় ভরপুর। বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড, ওয়ানডেতে যৌথভাবে সর্বাধিক ছক্কার মার, একই দিনে ক্যারিবিয়ান তারকা প্রবেশ করেছেন ৯ হাজারি রানের ক্লাবেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইতিহাসের জৌলুস বাড়িয়েছেন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ঙ্কর ব্যাটসম্যান। শুরুতে চেনা গেইল ছিলেন খুবই শান্ত, ক্ল্যাসিক্যাল। খেলেছেন মধ্য ব্যাটে, মাঝে মধ্যে অবশ্য খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে ছক্কাও হাঁকিয়েছেন। এভাবেই পেরিয়েছেন হাফ সেঞ্চুরির কোটা, অতঃপর তুলে নিয়েছেন ২২তম সেঞ্চুরি। ১০৫ বলে। এর পরই রক্ষণাত্মক খোলসটাকে একেবারে ছুড়ে ফেলে স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। স্যামুয়েলস অন্যপ্রান্তে কেবল যোগ্য সহায়তাই দিয়েছেন। আর চেনা গেইল একের পর এক ছক্কায় ভাসিয়ে দিয়েছেন প্রতিপক্ষকে। ১০০ থেকে ২০০ রানে পৌঁছাতে মাত্র ৩৩টি বল খেলেছেন, ১৩৮ বলে গড়েছেন দ্রুততম ডাল সেঞ্চুরির নতুন রেকর্ডও! আগের দ্রুততম ছিল শেবাগের, ১৪০ বলে।

একে একে নিজের ক্যারিয়ার সেরা, এরপর বিশ্বকাপের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরিসহ অনেক কিছু। পেছনে ফেলেন গ্যারি কার্স্টেনের ১৮৮ রানের রেকর্ড। ভারতীয়দের বাইরে প্রথম কোনও ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি হাকান গেইল। ওয়ানডে ইতিহাসে এটি পঞ্চম ডাবল সেঞ্চুরি। আগের চারটিই ভারতীয়দের। যার মধ্যে দুটি আবার রোহিত শর্মার। গ্রেট শচীন টেন্ডুলকরের সৌজন্যে প্রথমবারের মতো ডাবল সেঞ্চুরি দেখেছিল ওয়ানডে ক্রিকেট, গোয়ালিয়রে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। পরের বছর ২০১১ সালে বিরেন্দর শেবাগ ২১৯ রান করে শচীনকে পেছনে ফেলেন, ২০১১ সালে ইন্দোরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ২০১৩ সালের নবেম্বরে ব্যাঙ্গালোরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় ভারতীয় হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি (২০৯) হাঁকান রোহিত শর্ম। এক বছরের ব্যবধানে গত নবেম্বরে কলকাতায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৬৪ রানের অতিমানবীয় ইনিংস। একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে দু-দুটি ডাল সেঞ্চুরির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হিসেবে রোহিতের সেই ইনিংস এখনও অক্ষত। স্যামুয়েলসকে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে তোলেন ৩৭২ রান। বিশ্বকাপ তো বটেই, ওয়ানডে ইতিহাসে যে কোন জুটিতেই সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড এটি! বিশ্বকাপে আগের সর্বোচ্চ ৩১৮ রানের জুটি ছিল সাবেক ভারতীয় জুটি রাহুল দ্রাবিড় ও সৌরভ গাঙ্গুলীর, ১৯৯৯-এ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। সর্বোপরি ওয়ানডেতে আগের সর্বোচ্চ জুটি ৩৩১ রানের, শচীন ও দ্রাবিড়ের, ১৯৯৯-এ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ‘আমার ওপর অনেক চাপ ছিল। রান আসছিল না ব্যাটে। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো এত মানুষ আমার ব্যাটে রান দেখতে চেয়েছে। টুইটারে বার্তার পর বার্তা আসছিল। সবাই চেয়েছিল আমি পারফর্ম করি। আনন্দিত যে তাদের উল্লাস করার মতো কিছু দিতে পেরেছি।’ অনুভূতি জানিয়ে বলেন গেইল।