মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১২ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বাংলা গদ্যে ক্রান্তিকাল

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • তাপস মজুমদার

সুসমাচার দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। এবার একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে মাসব্যাপী আয়োজিত বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের ব্যবস্থা করেছিল। আর তাতে অন্য অনেকের সঙ্গে আমন্ত্রিত হয়ে ঢাকায় এসেছিলেন ফাদার পল দ্যতিয়েন, যিনি ফাদার দ্যতিয়েন নামে সমধিক পরিচিত। ফাদার দ্যতিয়েন সম্পর্কে বলার আগে দু’একটি কথা বলে নিতে চাই বাংলা একাডেমি সম্পর্কে। বিভিন্ন জাতীয় পত্রপত্রিকায় দীর্ঘদিন থেকে লেখালেখি ও চাপ সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে এবার বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এক রকম বাধ্য হয়েছিল আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করতে। সে জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও প-িতকে। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৭৪ সালে এ রকম একটি আয়োজন করেছিল বাংলা একাডেমি, যাতে বিশিষ্ট সাহিত্যিক অন্নদা শঙ্কর রায়সহ অনেক খ্যাতিমান কবি ও লেখক অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপর অজ্ঞাত কারণে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তা থেকে বিরত থাকে। সম্ভবত এ ক্ষেত্রে দেশীয় কতিপয় কবি-সাহিত্যিকসহ মহলবিশেষের চাপ ছিল। সে সময়ে বাংলা একাডেমির বইমেলায় যে রকম একটি উদার-উন্মুক্ত পরিবেশ ছিল, তাও অচিরেই বন্ধ হয়ে যায় একশ্রেণীর দেশীয় লেখক ও কবিদের দাবি এমনকি আন্দোলনের মুখে। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক চাপ ও বিক্ষোভ ছিল দেশীয় প্রকাশকদের, যার অনিবার্য পরিণতিতে বইমেলা শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয় নিছক দেশীয় বইমেলায়, যেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল ভাল হয়েছে কী খারাপ, তার চূড়ান্ত রায় হয়তো এখনই বলা যাবে না। এর জন্য সম্ভবত আমাদের আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। তবে আদৌ যে ভাল কিছু অথবা ইতিবাচক কোন ফল অর্জিত হচ্ছে না, এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বলছে, আপাতত দু’বছর পর পর তারা আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করবে। এই সিদ্ধান্তটাও ঠিক মেনে নেয়া যায় না। প্রতিবছরই নয় কেন? মনে রাখা আবশ্যক, কোন একটি দেশে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের একটি প্রায় অবাধ ও মুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করা না হলে সেসব ঠিক উৎকর্ষ লাভ ও বিকশিত হয় না। অন্তত অনিবার্য বিশ্বায়নের কালে তো নয়ই।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। শুরু করেছিলাম ফাদার দ্যতিয়েনকে দিয়ে। ফাদার দ্যতিয়েন বোধকরি বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকদের কাছে ততবেশি পরিচিত নন। তবে যে শ্রেণীর পাঠক উভয় বাংলার শিল্প-সাহিত্যের খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা তাঁর সম্পর্কে বিলক্ষণ জানেন বৈকি। আমরা ঠিক জানি না, ফাদার এবারই প্রথম বাংলাদেশ সফরে এলেন কিনা! পাদ্রিরা তো নিঃস্বার্থভাবে অথবা পুণ্যার্জনের অভিপ্রায়ে সারা দুনিয়ায় ধর্ম প্রচার করে বেড়ান। তবে ফাদার দ্যতিয়েনের ক্ষেত্রে বিরল ব্যতিক্রম, সম্ভবত বিরলতম এবং একামেবাদ্বিতীয়ম। ফাদার অত্যন্ত স্বাদু গদ্য লেখেন, যা এক কথায় একেবারে পাঠকের হৃদয়-মন ছুঁয়ে যায়। গদ্য যে কত প্রাঞ্জল, সুললিত, মিষ্টি, নির্ভার, নির্মেদ, ছন্দময়, ধ্বনিমাধুর্যম-িত সর্বোপরি গীতল-শিতল ও মানবিক হতে পারে, তা ফাদার দ্যতিয়েনের গদ্য না পড়লে ঠিক বোঝা যায় না। এক কথায় অপূর্ব, অভূতপূর্ব, মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়স্পর্শী। আমরা যদি এক্ষণে সময় পেতাম এবং ভাবনার অবসর পাওয়া যেত, তাহলে ফাদার দ্যতিয়েনের গদ্য সম্পর্কে বিশদ বলার প্রায় অক্ষম প্রচেষ্টা করতাম। সারকথা বলি, ফাদারের গদ্য খুবই সৃজনধর্মী, একেবারে নিজস্ব ঢং ও রীতিনীতির, যা প্রকারান্তরে মৌলিক বলা চলে। এখানে একটি বিনীত প্রশ্ন রাখতে চাই পাঠকের দরবারে, উভয় বাংলায় বর্তমানে ফাদারের মতো মৌলিক গদ্যচর্চা করেন ক’জন? বলহ সুজন, যে জানো সন্ধান!

এক্ষণে আমাদের উইলিয়াম কেরি ও শ্রীরামপুর মিশনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে অনিবার্য। তারও আগে ফাদার দ্যতিয়েন সম্পর্কে আরো দু’চার কথা বলে নেই। ফাদার মূলত বেলজিয়ামের নাগরিক। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি পা রাখেন স্বাধীন ভারতে। শ্রীরামপুরের বাসন্তী গ্রামে। তখন নাকি সেখানে বাঘের দেখা পাওয়া যেত। সেখানেই শুরু ফাদারের বাংলা শেখা। পরে আরো শেখার জন্য শান্তিনিকেতনে গেলেও সেখানকার পরিবেশ ও শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর ভাল লাগেনি। তাঁর দাবি এবং তা যথার্থই বটে, তিনি যা কিছু শিখেছেনÑ স্ব-উদ্যোগে ও স্ব-চেষ্টায়। তবে তাতে অবশ্যই অভিনিবেশ ও আন্তরিকতা, নিরলস শ্রম ও নিষ্ঠা বিমিশ্রিত ছিল। ১৯৫৯ সাল নাগাদ তিনি ‘সাহেবের ডায়েরি ছেঁড়া পাতা’ লিখে পাঠিয়ে দেন দেশ পত্রিকা বরাবরে, যার সম্পাদককে তিনি আদৌ চিনতেনই না। অনেকের ধারণা, সম্পাদকের সঙ্গে চেনা-পরিচয় না থাকলে বুঝি লেখা ছাপানো যায় না। ধারণাটা যে কতটা ভুল, ফাদার তা প্রমাণ করেন। দু’দিনের মাথায় তিনি দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের একটি পোস্টকার্ড পান, যাতে লেখা ছিল ‘ইউ হ্যাভ ওপেনড এ ভিসতা ইন বেঙ্গলি লিটারেচার’। ফাদার তাঁর এই ডায়েরির ছেঁড়া পাতা দিয়ে খুলে দিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক নতুন দিগন্ত।

এবার শ্রীরামপুর মিশন, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ ও উইলিয়াম কেরির কথা একটু বলি। সুকুমার সেন বাংলা সাহিত্যে গদ্য গ্রন্থটির শুরুতেই আক্ষেপ করে লিখেছেন, যে কোন সভ্য দেশের সাহিত্যে পদ্যের আবির্ভাব সংঘটিত হয়েছে গদ্যের পরে। কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক এর উল্টো। প্রাচীনকালে সংস্কৃত ভাষার সাহিত্যে দীর্ঘদিন গদ্য মাথা তুলতে পারেনি। অনুরূপ অবস্থা লক্ষণীয় বাংলা ভাষার সাহিত্যেও। ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে গদ্য ছিল অজানিত। ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, রাজা-বাদশাহর ফরমান, দলিল-দস্তাবেজ ইত্যাদিতে যৎসামান্য গদ্য প্রচলিত থাকলেও, সেসব ছিল দুর্ভেদ্য ও দুষ্পাঠ্য। ধর্মশাস্ত্র থেকে শুরু করে চিকিৎসাশাস্ত্রÑ সবই চলতো পদ্য কার্যক্রমে। সংস্কৃত ভাষায় অনুষ্টুপ ছন্দ এবং বাংলা পয়ারের প্রায় সর্বত্র ছিল অবাধ গতায়াত।

এই প্রায় জগদ্দল অবস্থার মধ্যে ১৮০০ সালের জানুয়ারিতে শ্রীরামপুরে ব্যাপ্টিস্ট মিশন ও প্রেসের প্রতিষ্ঠা হয়। মিশনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রথম জন টমাস ১৭৯১ সালে দেশে গিয়ে সপরিবারে নিয়ে আসেন প্রধানতম কর্মী উইলিয়াম কেরিকে (১৭৬১-১৮৩৪)। পাদরি কেরির বিদেশে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম প্রচার প্রধান উদ্দেশ্য হলেও, মূলত তাঁর হাত ধরেই বাংলা গদ্যের সূত্রপাত ও ক্রমবিকাশ। মিশনের প্রথম প্রচেষ্টা হলো বাইবেলের অনুবাদ প্রকাশ, যা ছাপা হয় ১৮০১ সালে। প্রথম দিকে দুর্ভেদ্য হলেও, ক্রমচর্চা ও ঘষা-মাজার মাধ্যমে তা সহজ হয়ে আসতে থাকে। অচিরেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা শিক্ষা দেয়ার জন্য ১৮০০ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় কলেজ অব ফোর্ট উইলিয়ম। পরের বছর কলেজে বাংলা বিভাগ খোলা হলে এর প্রথম অধ্যক্ষ হন উইলিয়াম কেরি এবং তাঁর অধীনে দুজন দেশীয় প-িত ও ৬ জন দেশীয় সহকারী নিযুক্ত হন। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। প্রসঙ্গত বলি, বাংলা মুদ্রণ অক্ষরের সৃষ্টিকর্তা চার্লস উইলকিনসের কাছে হরফ তৈরি শেখেন শ্রীরামপুরের পঞ্চানন কর্মকার। কলকাতা ও শ্রীরামপুরে যেসব মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল সেগুলোর হরফ তৈরি করতেন পঞ্চানন। উল্লেখ্য, ইংরেজীতে বাংলা ব্যাকরণ প্রথম মুদ্রিত হয় ১৭৭৮ সালে, যাতে প্রথম বাংলা হরফ বা টাইপ ব্যবহৃত হয়। মোট কথা, বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে উইলিয়াম কেরির কৃতিত্ব হচ্ছে উদ্যোগ, সংকলন, অনুবাদ ও সংশোধনীতে। সর্বোপরি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম গল্প সংগ্রহ হিসেবে কেরির ইতিহাসমালার সবিশেষ মর্যাদা রয়েছে ও থাকবে। কেননা এর বিষয়বস্তু মনোরম, রচনাভঙ্গি সহজ ও সাবলীল। তাঁর সমকক্ষ কোন বাঙালী গদ্য লেখক সে সময় ছিল না।

ফাদার উইলিয়াম কেরি থেকে ফাদার দ্যতিয়েন। দু’জনই পাদরি- একজন ইংল্যান্ডের, অন্যজন বেলজিয়ামের। দু’জনের সময়ের ব্যবধান দুস্তর। তবে দুঃখজনক হলো, মৌলিক, নিজস্ব ঢং ও রীতির বাংলা গদ্য এখন আর প্রায়ই কেউ লেখেন না। অথচ খ্রিস্ট মিশনারির হাত ধরে যে বাংলা গদ্য সাহিত্যের সূত্রপাত ও বিকাশ, তাকে এক সময় পরিপুষ্ট ও সমৃদ্ধ করে তুলেছেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, প্রমথ চৌধুরী, এমনকি পরবর্তীকালে বিভূতি, মানিক, তারাশঙ্কর, সতীনাথ, কমলকুমার, অমিয়ভূষণ, জগদীশ গুপ্ত, সমরেশ বসু এমনকি সুনীল-শীর্ষেন্দু-সন্দীপন পর্যন্ত। কিন্তু এখন? অধুনা তথা হাল-আমলের সাহিত্য- গল্প-উপন্যাসের গদ্য? হায়, নিজস্ব ঢং ও মৌলিক রীতি-প্রকরণের গদ্য প্রায় কেউই লেখেন না। এমনকি কেউ লেখার চেষ্টাও করেন না। ফাদার দ্যতিয়েনকে, আপনি এখন যেসব লেখা পড়েন, তাতে কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেন ভাষার মধ্যে- জিজ্ঞাসা করা হলে রীতিমতো বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, জঘন্য জঘন্য, জঘন্য। যত উপন্যাস, যত ছোট গল্প- সব ইংরেজী শব্দ, ইংরেজী বাক্য, ইংরেজী প্যারাগ্রাফ- বাংলা অক্ষরে লিখিত। আমি আর পড়ি না। দোআঁশলা। এখনকার লেখকরা ভাষাকে রক্ষা করছেন না।

ফাদারের প্রশ্ন আমাদেরও, কী করে রক্ষা করা যাবে বলুন? পূজা ও ঈদ সংখ্যায় যদি একজন লেখক আট-দশটা করে উপন্যাস আর দশ-বারোটি করে গল্প লেখেন, তাহলে আর যাই হোক না কেন, কোন অবস্থাতেই মান ধরে রাখা যায় না, যাবে না। তা তিনি যত প্রতিভাবান এবং বিজ্ঞ লেখকই হোন না কেন? এবারের বইমেলাকে উপলক্ষ করে এই বিনীত প্রশ্নটি রইল সব লেখকের উদ্দেশে।

প্রকাশিত : ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ:
রোহিঙ্গাদের জন্য সেফ জোনের প্রস্তাব সারা বিশ্ব গ্রহণ করেছে ॥ বিএনপির আপত্তি কেন? || গন্তব্যে পৌঁছেছে পদ্মা সেতুর সুপার স্ট্রাকচারবাহী ভাসমান ক্রেন || শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে বড় পরিবর্তন আসছে, আট সদস্যের কমিটি || আগামী বাজেট হবে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার ॥ অর্থমন্ত্রী || বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ৭২ পয়সা বৃদ্ধির সুপারিশ || মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে পাঠদান চলছে জোড়াতালি দিয়ে || মংডুতে ৩ গণকবরের সন্ধান ॥ দুদিনে এসেছে আরও ২০ হাজার || বৃষ্টিতে ভিজছে শিশুরা, খাবার জোগাড়ে অনেকে নেমেছে ভিক্ষায় || চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল নির্মাণে গতি সঞ্চার || আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের খপ্পরে ৫ শ’ তরুণ মেক্সিকো সীমান্তে ||