১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নগর জীবনে বসন্ত


নগর জীবনে প্রকৃতির অনুরণনের স্পন্দন কত যে গভীর ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয় তা শুধুই অনুভূতির বিষয়। ঋতু বৈচিত্র্যের বহুমাত্রিকতা এই শ্যামল বাংলার পথে-প্রান্তরে কী নিবিড় আবেশ মথিত গুঞ্জনে যে বেজে ওঠে তা কেবল জানে বাংলার আবেগসিক্ত মন। ঋতু মানেই ভিন্ন একটা রঙের নদীতে ভেসে যাওয়া কিশোরীর কাগজের গহীনে ‘বউ কথা কও’ পাখির গুঞ্জন। ঋতু মানেই কিশোরের লাল, নীল মার্বেলের মর্মরে এক আঁজলা গোল আয়নার উল্টোপিঠে বর্ণিল ছবির মুগ্ধ তাজমহল। বিক্রেতার বাঁশির মনকাড়া সুরের পিছনে পিছনে হারিয়ে আসা সারা দুপুর। ঋতু মানেই নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়া দুরন্ত শৈশবের হাফ্প্যান্টের ছেঁড়া বাতায়নে ফড়িঙের ডানার রাঙা তালি তাপ্পি আর স্কুল পালানো পাঠশালার দুষ্টু বালকের চঞ্চল-ভয়ার্ত মুখাবয়ব। ঝোপের ভিতর হারিয়ে ফেলা ঘুমন্ত লাটিম আর চরে চরে ভোকাট্টা ঘুড়ির পিছু ঝাঁক বেঁধে তুমুল হুল্লোড়।

গ্রাম-বাংলার এই চিরন্তন ঋতুময়তায় যে কী আনন্দঘন আবহ নিয়ে লুকিয়ে আছে গ্রামের নিসর্গের ভাঁজ খুললেই তার সুগন্ধি নাকে এসে লাগে। যেন টাট্কা রৌদ্রের রুমালের ভিতর ঝিম্ মেরে বসে থাকা জমাট মৌমাছি পুঞ্জ; রুমালের পরত খুলতেই যাবে উড়ে-অনেক দূরের মিউর‌্যালে আর নগরজীবনের ঋতুগুলো এত ক্ষীণ ধুলোম্লান যে, নাগরিক বোধের মলাট খুলতে না খুলতেই ঋতুর রঙগুলো শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের সিম্ফনি বেজে ওঠার আগেই যায় মিলিয়ে। রুটিনে বাঁধা ব্যস্ত নগর জীবনে যেন ঋতুর উপস্থিতিটা চশমার কাচে জমা উড়ন্ত ধুলোবালির মতো। টিস্যু পেপারের এক ঘষাতেই যায় মুছে, তবুও ঋতু আসে। ঘুরে ঘুরে ঋতুর উপস্থিতি চোখে পড়ে রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজাভ গাছের চূড়ায়, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সদ্য সংযোজিত হাতির ঝিলের স্পন্দিত গুঞ্জরণে। খুব ভোরবেলা পাখির কলস্বরে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন এ নগরের এক সুউচ্চ ফ্ল্যাট-বাড়ির নির্দিষ্ট গ-িবাঁধা জীবন দেখে, দেখতে পাব উধাও আকাশ। সীমাবদ্ধ হাওয়ায় পলুশনের গাঢ় ধূসরতা। এই ধূসর পাতার মার্জিনেই যেন সম্প্রতি ধরতে শুরু করেছে রঙ। যে রঙ বসন্তের। ঋতুরাজ বসন্তের এই রঙে রাঙা হয়ে ওঠার অপেক্ষাতেই যেন বসে আছে মন। যখন শীতের কাতরানি কিছুটা কমতে শুরু করে প্রকৃতির আঙুলগুচ্ছ বসন্তের হিরণ¥য় অঙ্গুরীয় পরে নেয়ার আয়োজন সম্পন্ন করেছেÑতখনই নগর জীবনের অন্তরের খিড়কি’র জানালার পাশে এসে উঁকি দিচ্ছে হীরক উৎসবমুখর লাবণ্য ঝরা আয়োজন। যে আয়োজনের অন্যতম হলো একুশে গ্রন্থমেলাÑ যা এখন পড়েছে শেষ সপ্তায়।

এই বসন্তেরই কালো রেশমী গাউন পরা দূত গাছে গাছে ডেকে উঠবে কু-উ-উ স্বরে। কোকিলের কুহুরণে মাতাল বাতাস পেভ্মেন্টে ঝরে পড়া পাতার কার্নিশে ধাক্কা খেয়ে আবারও বাও কুড়ানির মতো ঘূর্ণির লম্বা সুতায় গেঁথে উঠে যাবে দিগন্তে প্রবাসী মেঘের কোল অভিমুখে। কেউ দেখুক বা না দেখুক বসন্ত এসেই ডানা খুলে বসবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিঝুম কান্কোয় বৃক্ষের মগডালে। বসন্ত-বিভোর বিকেলে ধানম-ি লেকের তরঙ্গ ফোটা কল্লোলিত জলসায় এসে বসবে আপন মহিমায়। এভিনিউ থেকে ঘুরে যখন বসন্ত ভোরের রানওয়েতে অবতরণের জন্য থামিয়ে দেবে লাল ঝুটিতে জ্বলা নীল প্রপেলার-ঠিক তখনই নগর জীবনের গহন থেকে গহনে ছড়িয়ে পড়বে মায়াবী হীরের উজ্জ্বলতা। যে উজ্জ্বলতায় ধূলি-ধূসর ব্যস্ততম নগরজীবনে ফুটতে শুরু করবে জুঁই, বেলী, চন্দ্রমল্লিকা, হাস্নাহেনা, কামিনী, গোলাপসহ অজস্র ফুল।

বসন্তের রঙটাই তো অন্যরকম। কেমন যেন মন জয় করা এক অফুরন্ত ভালো লাগা লেগে থাকা উপলব্ধির আলাদা আমেজগাঁথা উন্মাতাল আবাহন কাল থেকে কালান্তর ধরে বহন করে চলেছে রঙিন বসন্ত। ঋতু বৈচিত্র্য ঘেরা এই বাংলার প্রতিটি প্রহরেই বসন্ত এক দামী মনিরতেœর মতো এসে চমকে দিয়ে যায় সকলেরই নিভৃত মন। বসন্ত যেমন গ্রাম-গ্রামান্তরে অন্য এক ঔজ্জ্বল্য ধরা দেয়। একইভাবে বিজড়িত হয় নগর জীবন এবং মফস্বল শহরের নির্জন মাঠে-মাঠে। এভাবেই ঋতুরাজ বসন্ত-মাথায় ময়ূর পালক, গলায় মুক্তোর মালা, কপালে লাল সোনার দিনার জ্বলা টিপ, কানে হীরের ঝুমকো আর খোঁপায় গাঁদা ফুলের মালা জড়িয়ে আসে। বসন্ত আসে মখমলি ছোঁয়ায় আর রেশমী স্কার্ফ উড়িয়ে। ফুরিয়ে আসা শীতের দুপুরের প্লাটফর্মে এই বুঝি থামল এসে জাফরানি বসন্তের মনোহর ট্রেন। আর শিরিষের শাখায় শাখায় পাতার ঝালরের ফাঁকে বসে ডেকে উঠবে বসন্তের দূত ভেলভেটে মোড়ানো মায়াবী কোকিল।

ফারুক রেজা

ছবি:আজিম এলাহী

মডেল: তুর্য ও নিগার