১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কে কোন্ ‘শেষ’ দেখতে চাইছেন?


দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। যাঁরা সংবাদপত্রের নিয়মিক পাঠক তাঁরা হয়ত নিশ্চিতভাবেই তাঁদের স্মৃতি ঝালিয়ে নিতে পারবেন আজকের সঙ্কটের ধারাবাহিক উত্তরণের কালক্রম। কোন টেলিভিশন চ্যানেল চাইলেই এ বিষয়ে একটি অনুষ্ঠান বানাতে পারে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়েই আসলে এই সঙ্কটের শুরু। কারণ সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের ভূমিধস পরাজয় না ঘটলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই কোন সঙ্কটে পড়ত না। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেয়ার সক্ষমতা বা গণতান্ত্রিক শক্তি এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটি অর্জন করেনি। অর্জন করেনি বলেই প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে এবং সরকার উৎখাতকেই একমাত্র পথ হিসেবে দেখেছে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক কোন আন্দোলনকে তারা সরকার পরিবর্তনের কোন মাধ্যম হিসেবে ভাবতে পারে বলে আমাদের সামনে কোন নজির নেই।

কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের বিগত আমলে বিডিআর বিদ্রোহের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা সামাল দেয়ার পর সরকারকে সকল পক্ষ থেকেই সাধুবাদ জানানো হয়েছিল যে, আসলে বাংলাদেশে অতীতের কোন সরকারকেই এ ধরনের কোন সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়নি। বেগম জিয়া সেই সঙ্কটকালে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন কেন সে প্রশ্ন এখনও অনুদ্ঘাটিত। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি নতুনতর রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। আমরা যদি পেছন ফিরে তাকাই তাহলে এ কথা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার মূল ও প্রধান কারণ আসলে বাংলাদেশকে পরাধীন করা। যতই এখন ইনিয়ে-বিনিয়ে তাঁর মৃত্যুর জন্য তাঁর শাসনকালকে দায়ী করার চেষ্টা করা হোক না কেন তা যুক্তিতে টেকে না। বরং নেতা এবং শাসক বঙ্গবন্ধুকে যাঁরা আলাদা করতে চান তাঁরা মূলত বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আড়াল করতে চান। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ, আরেকদিন এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছে রইল।

মুক্তিযুদ্ধ আজও বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নিয়ামক ও জ্যান্তব মাপকাঠি। মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে ইচ্ছে করলেই আমরা দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি-ভবিষ্যতকে সঠিকভাবে মেপে ফেলতে পারি এবং কাজটি মোটেও কষ্টসাধ্য নয়। এমনকি দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও মুক্তিযুদ্ধকে আমরা মিলিয়ে দেখতে পারি। অর্থাৎ লক্ষ্য করে দেখবেন যে, যে মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশ একটি সুষম প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে চলতে শুরু করেছে। দুটো প্রক্রিয়াকে কেউ আলাদা করতে পারবেন না। পারবেন না, তার কারণ হচ্ছে, একটি দেশ কখনই অতীতের কোন অবিচারকে আড়ালে রেখে গতিশীল অর্থনীতি কিংবা রাজনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে না। জার্মানি যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পাপ থেকে মুক্তি না পেত, একটি বিচার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে পরিশোধিত না হতো তাহলে তার পক্ষে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোন পর্যায়েই সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জন সম্ভবপর ছিল না। দেশের ভেতর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হলেও অতীত-অন্যায়ের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। ধরুন, নাৎসিদের বিচার প্রক্রিয়ায় যদি বাধা দেয়ার চেষ্টা হতো কিংবা বিচার প্রক্রিয়া আদৌ সম্পন্ন না হতো তাহলে কি তা জার্মানির রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলত না? আবারও কি ইউরোপে ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সম্ভাবনা থেকে যেত না? কিন্তু সেখানে তো আসলে সম্মিলিতভাবেই নাৎসিবাদ মোকাবেলা করা হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো এ ব্যাপারে জিরো-টলারেন্স পলিসি গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন এটি সম্ভব হয়নি সে প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের মানুষের ভেতর স্বাধীনতাবিরোধী অংশটি ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছিল এবং তা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ভেতর দিয়েই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিটি স্তরেই এই শক্তিময়তা আমরা লক্ষ্য করে থাকি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে চাকরির জন্য, ব্যবসার জন্য, পুরস্কারের জন্য ধর্ণা দিতে হয়েছে চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারের কাছে। রাষ্ট্র তাদের সে ক্ষমতা ধরিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতায়ন করেছে নানা ক্ষেত্রে। সুতরাং, তাদের যখন বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তখন সেসব শক্তিমানরা নড়েচড়ে বসেছে এবং একযোগে দেশে ও বিদেশে শুরু হয়েছে ষড়যন্ত্র।

প্রশ্ন হলো, এত বিশাল ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকার কি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে? যদি সঠিক ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করি তাহলে বলতেই হবে যে, এ বড় কঠিন যুদ্ধ। আমার মনে হয়, ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজটি কোন অংশেই কম কিছু নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব ও গুরুভার মুক্তিযুদ্ধের সেই সশস্ত্র দিনগুলোর চেয়ে বেশি। অনেকেই হয়ত এই তুলনায় একটু নারাজ হতে পারেন, কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, ১৯৭১ সালে এই রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর শক্তিকেন্দ্র ছিল কেবলমাত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। কিন্তু এখন তাদের শক্তিকেন্দ্র দেশের ভেতরে তো আছেই, বিদেশেও তাদের শক্তির দোসর, সমর্থক ও সহযোগী গোষ্ঠী রয়েছে। তারা ধর্মের নামে দেশের ভেতর যে বিশাল বর্ম তৈরি করেছে তা সাঈদীকে চাঁদে দেখানোর কৌশল দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, কী করে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে ধর্মের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। সুতরাং এই কূটকৌশলী, ক্ষমতাবান, ষড়যন্ত্রে পারদর্শী, মিথ্যা ও ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠীটির সঙ্গে সরকারকে কৌশলে পারতে হলে তাকে সকল দিক থেকেই শক্তিশালী হতে হবে। কিন্তু সরকারের ভেতরেও তো এমন মানুষ পাওয়া যাবে যারা মনে করেন যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার আসলে কোন ইস্যু নয়, বরং এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হলে সরকার অনেক শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেত। শেখ হাসিনা একটি অনাকাক্সিক্ষত কাজ করছেন, যা তাঁকে কেবলই অজনপ্রিয় করবেÑ এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরও দেশে অভাব নেই এবং আওয়ামী লীগের ভেতরেই। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায়ই বলা যায় যে, বৈপরীত্য ও বিপদ মোকাবেলার কৌশলপত্র তৈরি ছাড়াই সরকারের পক্ষে এই বিশাল বিরুদ্ধশক্তির মোকাবেলা খুব সহজ কাজ নয়। কিন্তু তারপরও একটি ফাঁসির রায় কার্যকরসহ অনেক রায় আপীল বিভাগে এখন বিচারাধীন রয়েছে। এখন এর পরবর্তী অধ্যায়ে মূলত আমরা দেখতে পাই যে, এই বিচার প্রক্রিয়ার একটি সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিণতি। ২০১২-১৩ সালে বাংলাদেশে আসলে কোন রাজনৈতিক কর্মকা- হয়নি, হয়েছে মূলত বিবিধ ষড়যন্ত্রের খেলা। যাকে আমাদের দেশের সুশীল বিবেকগণ রাজনীতি আখ্যা দিতে চেয়েছেন। একপক্ষ একের পর এক ষড়যন্ত্র করেছে, আরেক পক্ষ তা মোকাবেলার চেষ্টা করেছে কেবল। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সেই ষড়যন্ত্রে আপাত একটি বাধার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল কেবল, কিন্তু ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে এসে সেই বাধাও আর নেই। এবার ‘শেষ দেখার জন্য বিএনপি-জামায়াত প্রস্তুত’Ñ আমরা গণমাধ্যমে এরকম শিরোনামই দেখতে পাচ্ছি গেল কিছুদিন ধরে।

এই ‘শেষ দেখা’ নিয়ে কথা বলেই আজকের লেখার ইতি টানতে চাই। এই শেষ দেখা আসলে আর কিছু নয়, সরকার উৎখাত। সরকার উৎখাত মানেই হচ্ছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার বাইরে পাঠানো। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার বাইরে পাঠানো মানেই হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়া। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যখন বার বার এই কথাটি বলা হয় যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করার জন্যই তারা হাজার হাজার মানুষ পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করছে তখন সেটা শুনতে যতই শ্রুতিকটু শোনাক না কেন, আসলে সেটাই যে সত্য তা আমাদের মানতে হবে। কারণ, শেখ হাসিনা এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে যাদের শত্রু বানিয়েছেন তারাই আসলে তাঁর পিতাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। তিনি তাঁদের বিষনজর থেকে বাইরে নন তার প্রমাণও আমরা বার বার পেয়েছি। তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হত্যা করা সম্ভব নয়, কারণ তিনি বাংলাদেশের মানুষকে একটি ভিত্তিগত পরিচয় দিতে পেরেছেন। তাঁর রাজনীতি নিয়ে আমরা সমালোচনা করতে পারি, কিংবা তাঁর সম্পর্কে অনেকেই নানাবিধ সমালোচনা উত্থাপন করতে পারেন, কিন্তু একথা তাঁর শত্রুও স্বীকার করবেন যে, তিনি আসলে বাংলাদেশকে একটি দৃঢ় উন্নয়ন কাঠামোর ভেতর আনতে সক্ষম হয়েছেন। এর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে যোগ করা হলে নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার অনেক পরিচিত নেতৃত্বকেই তিনি ছাড়িয়ে যান কর্মকুশলতা এবং যোগ্যতায়। তিনি আমাদের সামনে আছেন, দেশ শাসন করছেন বলেই আমরা একথা বুঝতে পারি না বা স্বীকার করতে চাই না, কিন্তু একটু নিরপেক্ষ ও বিশ্লেষণী দৃষ্টি নিয়ে দেখলে আমরা দেখতে পাব যে, জাতি হিসেবে আমাদের উচ্চতা বেড়েছে, সক্ষমতা বেড়েছে এবং বেড়েছে সম্মানও। এটা কেবলমাত্র সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার কারণেই। কিন্তু তাঁকে এই ক্রেডিট দিতে গেলে তো ‘শেষ দেখা’ হবে না, তাই আজকে তাঁর বিরুদ্ধে দেশ ও বিদেশে সকল ‘শেষ দেখায়’ বিশ্বাসীরা একযোগে জিহাদ ঘোষণা করেছে। ২০০৮-১৫ সাল, বাংলাদেশকে বিশ্লেষণ করতে হলে, বাংলাদেশকে বুঝতে হলে এই সময়কালের রাজনীতি, সমাজনীতি ও উন্নয়নীতি যেমন বোঝা দরকার তেমনই এই সময়কালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক, ব্যবসা এবং সুশীলতার আড়ালে চরমপন্থী তথা কেবলমাত্র শেখ হাসিনা-বিরোধী রাজনীতি করা ব্যক্তিদের অবস্থান এবং ভূমিকা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। তাহলেই পরিষ্কার হবে যে, আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় আছি এবং কোথায় যাচ্ছি। একই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার হবে যে, এই দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রকৃত বাধা আসলে কারা দেয় এবং কোত্থেকে তার প্রেসক্রিপশন আসে। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, তারা যদি ‘শেষ দেখা’র জন্য অধীর হয়ে থাকে তাহলে শেখ হাসিনারও উচিত তাঁর পক্ষ থেকে ‘শেষ দেখা’র সুযোগ করে দেয়া। কোন কিছুর শেষ দেখার জন্য আলোচনা বা সংলাপের প্রয়োজন নেই। কারণ, একেক পক্ষের কাছে শেষ দেখা একেক রকম, তাই না? আমরা তো জানি যে, কোন্্ পক্ষের ‘শেষ দেখা’ কী রকম।

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

masuda.bhatti@gmail.com