১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

‘নৃশংস হরতাল অবরোধ’ কেন অবৈধ নয় ॥ হাইকোর্টের রুল


‘নৃশংস হরতাল অবরোধ’ কেন অবৈধ নয় ॥ হাইকোর্টের রুল

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের টানা কর্মসূচীতে প্রাণহানি ও নাশকতার মধ্যে ‘হরতাল ও অবরোধের নামে নৈরাজ্য বন্ধে’ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপশি হরতাল-অবরোধের মধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়া এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ব্যবস্থা করতেও সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ‘নৃশংস হরতাল ও অবরোধ’ কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন আদালত।

এদিকে, হরতাল-অবরোধ বন্ধে হাইকোর্ট থেকে যে রুল জারি করা হয়েছে তার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটির বৈঠকে সরকারসহ অন্য পক্ষগুলোকে ওই আদেশ প্রতিপালনের তাগিদ দেয়া হয়েছে।

রবিবার পৃথক দুইটি আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মোঃ সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ‘নৈরাজ্য’ বন্ধের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ ও রুল জারি করেন।

এমন এক সময়ে আদালতের এই নির্দেশনা এল, যখন হরতাল অবরোধের নামে সন্ত্রাসের ফলে বিপাকে পড়া দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে ব্যবসায়ীরা আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, জনগণ চাইলে হরতাল বন্ধে আইন হবে। বিএনপি-জামাত জোটের চলমান অবরোধ-হরতালে নাশকতার চিত্র তুলে ধরে একটি রিট করেন শাহীনুর রহমান শাহীন নামে কেরানীগঞ্জের এক ব্যবসায়ী। তার রিটে নৈরাজ্য বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ আসে। এই রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বিকল্পধারার সভাপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।

অপর এক রিট আবেদনে হরতাল-অবরোধের মধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়া এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে একই আদালত। এক্ষেত্রে কেউ বাধা দিলে ‘সিরিয়াস ব্যবস্থা’ নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচী চলাকালে ‘শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম’ কেন ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন আদালত। এই রিটেও স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার, বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বিকল্পধারার সভাপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বিবাদী করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের ইস্পাহানি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির পক্ষে শফিউল আজম খান বারকু এই রিট আবেদন করেন।

আদালতে রিট আবেদনগুলোর পক্ষে শুনানি করেন, আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন, আবদুল বাসেত মজুমদার, আবদুল মতিন খসরু ও সাহারা খাতুন প্রমুখ। আদেশের পর এ বিষয়ে আবদুল মতিন খসরু জনকণ্ঠকে বলেন, হরতালের নামে, জালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যা, সহিংসতা সৃষ্টি করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। তিনি বলেন, আমরা হরতালে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আদলতের আরজি জানিয়েছিলাম। তখন আদালত এই ক্ষতিপূরণ দিতে আহ্বানকারীদের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন।

তিনি আরও বলেন, আদালতের আদেশে এসএসসি পরীক্ষার সময় যাতে বিঘœ সৃষ্টি না হয় তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আর যারা বিঘœ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, বলেও জানান এই আইনজীবী।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগাম নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট গত ৫ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ চালিয়ে আসছে। এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে সাপ্তাহিক ছুটি বাদে প্রতিদিনই চলছে হরতাল। অবরোধ ও হরতালের মধ্যে নাশকতা ও সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও কর্মসূচী চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন ২০ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া। চলমান মাধ্যমিক পরীক্ষার মধ্যে হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচী না দিতে সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবকদের আহ্বানেও বিএনপি জোট সাড়া দেয়নি।

এর আগে নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৩ সালে বছরজুড়ে সংঘাত সহিংসতার কারণে ব্যবসায়ীরা আইন করে হরতাল বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন একাধিকবার। আর এবার অবরোধের প্রথম ৩৩ দিনে দেশের অর্থনীতির ৭৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে আবারও একই দাবি তোলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই হরতাল নিষিদ্ধের এ দাবিকে সমর্থন করেছেন। হরতাল-অবরোধের নামে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে সরকার নতুন একটি আইন করার কথা ভাবছে বলেও সম্প্রতি জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত। অবশ্য বিদ্যমান আইনেই চলমান জ্বালাও-পোড়াওয়ের বিচার সম্ভব বলে সম্প্রতি মত প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক।

আদেশের সঙ্গে একমত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ॥ হরতাল-অবরোধ বন্ধে হাইকোর্ট থেকে যে রুল জারি করা হয়েছে তার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটির বৈঠকে সরকারসহ অন্য পক্ষগুলোকে ওই আদেশ প্রতিপালনের তাগিদ দেয়া হয়েছে।

রবিবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এই তাগিদ দেয়া হয়। কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটি সদস্য শামসুল হক টুকু, মোঃ আবদুল মজিদ খান, এ্যাডভোকেট মোঃ জিয়াউল হক মৃধা ও সফুরা বেগম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, হাইকোর্টের ক্ষমতা আছে রুল জারি করার। তারা তা করেছে। এটা আমাদের মানতে হবে। রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর এ সংক্রান্ত আইন করা হবে। এ সময় তিনি পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, পশ্চিমা অনেক দেশেই এসব আন্দোলনে ক্ষয়ক্ষতির জন্য মামলা হয়েছে। সেসব দেশের মামলার রায়ও হয়েছে। সেগুলো আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, হরতাল অবরোধ করা যেমন রাজনৈতিক অধিকার, পাশাপাশি নিজের অধিকার পালন করতে গিয়ে অন্যের অধিকার খর্ব করা যাবে না বলেও সংবিধানে বলা আছে। হরতাল-অবরোধ যারাই ডাক দেবেন, সে কর্মসূচীতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হলে সে ক্ষতিপূরণ তাদেরই দিতে হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: