২৪ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বই মেলা ॥ মাঝবেলায় বইমেলা


গত সপ্তাহের লেখায় বইমেলার প্রথম তিন দিনের চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছিলাম। এরই মধ্যে মেলা গড়িয়েছে মাঝবেলায়; মাঝনদীতে শঙ্কিত বিচলিত সাম্পানের মতোই যেন কখনো কখনো দুলে উঠেছে বইমেলা। দেশব্যাপী চলছে টানা অবরোধ, আর সপ্তাহের প্রতিটি কর্মদিবসেই হরতাল। এমন অভিজ্ঞতা আর হয়নি মেলার। তবু প্রথম শুক্রবারটি যথারীতি ছিল চেনা চেহারায়। লাইন ধরে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢুকেছেন মেলায়, ধুলোয় অস্থির হয়েছেন বহুজন, প্রতিটি স্টলের দোকানিদের মুখে ফুটেছে হাসি। পরদিন শনিবার ভিড় অর্ধেক হয়ে গেলেও বই বিক্রিতে বিশেষ হেরফের ঘটেনি। কিন্তু রবিবার থেকে একটা হতাশা গ্রাস করে। দু-তিন দিন এ অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল বইমেলা বুঝি এবার ফ্লপই হলো। কিন্তু না, বুধবার থেকে দারুণ জমজমাট হয়ে উঠল বইমেলা। এই ধারা অব্যাহত থাকার পূর্বাভাসও যেন পাওয়া যাচ্ছে। গত সপ্তাহেই বলেছি এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত মেলাটি যথেষ্ট পরিমাণে জায়গা নিয়ে হচ্ছে। রীতিমতো বিশাল ময়দান। তাই গায়ে গা লাগিয়ে চলা, ঠেলাঠেলি এসব সাবেক হয়ে গেছে। এখন বিস্তৃত সুপরিসর। এমন স্পেসও মেলায় রয়েছে যেখানে সান্ধ্যকালীন হাঁটাহাঁটিও সেরে নেয়া যায় ইচ্ছে করলে। তাতে অন্য কারোরই বিন্দুমাত্র অসুবিধে হবে না। সত্যিকারের বইপ্রেমী ও ক্রেতাদের জন্য এবারের মূল মেলাটি প্রকৃত বান্ধব হয়ে উঠেছে। এই যে আমি ‘মূল মেলা’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করলাম, তাতে মনে হতে পারে দশকের পর দশক ধরে চলা মেলার ভেনু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণটিকে গৌণ করে তুলছি। তা নয়, মানি আর নাই মানি মেলা এখন স্পষ্টত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। শুধু বই আর অন্যান্য প্রকাশনার জন্য একাডেমি প্রাঙ্গণেও পাঠককে যেতে হচ্ছে। কেননা ওখানে শিশু-কিশোরদের বই রয়েছে। আর আছে নবীন-তরুণ লেখকদের আত্মপ্রকাশ ও দাঁড়াবার মাধ্যম লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট কাগজ। এই দুটি বিষয় যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলার ভেতর সঙ্কুলান করা যেত তবে অক্ষরকেন্দ্রিক মেলাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠত উদ্যানে। আর কথা ও গানকেন্দ্রিক আয়োজনটি হতে পারত একাডেমি প্রাঙ্গণে। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, টিভির সরাসরি সম্প্রচার, সেমিনার ইত্যাদিও থাকত ওখানে। এমনটা হলে আর বিভক্ত বা বিচ্ছিন্ন মনে হতো না মেলাকে। যাঁরা বইয়ের জন্য বইমেলায় যান তাঁদেরও সুবিধে হতো, আর যাঁরা শুধু ঘোরাফেরা, গান শোনা উৎসব-উৎসব পরিবেশের মধ্যে আনন্দ পেতে চান তাঁদেরও সুবিধে হতো। সত্যি বলতে কি, আমি এক ঘণ্টার জন্য হলেও মেলায় যাই প্রতিদিন। হিসেব করে দেখলাম চার-পাঁচ দিন একাডেমি প্রাঙ্গণে যাওয়াই হলো না। মিস করলাম শুধু লিটল ম্যাগ প্রাঙ্গণ। তাই মন বলছিল, আহা! অন্তত লিটল ম্যাগের স্টলগুলো জায়গা পেত উদ্যানে তাহলে কত ভালই না হতো।

যা হোক, মেলার নতুন অবয়বের মধ্যে দশটি প্যাভিলিয়ন রয়েছে। দশ সুপরিচিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বই বিপণনে এতে বিশেষ সুবিধে হয়েছে। কুড়ি ত্রিশ বছর বা তারও বেশি বয়স হয়েছে যেসব সংস্থার, সেগুলোর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও তো ছাড়িয়ে গেছে কয়েক হাজার। চলতি মেলায় প্রকাশিত বিশ-পঞ্চাশটা বইয়ের পাশাপাশি আগে বেরুনো শত শত বই প্রদর্শনের একটা সুযোগ পেয়েছে প্যাভিলিয়নের প্রকাশকবৃন্দ। কিন্তু মনে হলো না যে সুযোগটির সদ্ব্যবহার তারা করতে পারছেন। গত দশ বছরে যে কুড়ি পঁচিশটি বই বেস্ট সেলার হয়েছে কিংবা বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছে সেগুলো নতুন দিনের পাঠকের সামনে তুলে ধরার, সেসঙ্গে নিজ সংস্থার অতীত গৌরব উপস্থাপনের সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা একমাত্র ইউপিএলের মধ্যেই দেখলাম। সুশিক্ষা, সুরুচি আর পেশাদারিত্বের সমন্বয়ে তাদের প্যাভিলিয়নটি বইমেলায় আন্তর্জাতিক আবহ নিয়ে এসেছে। আমার সঙ্গে একমত হলেন আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক। তাঁকে বললাম, দশটির মধ্যে আর কোন কোন প্যাভিলিয়ন সত্যিকারের বইয়ের প্যাভিলিয়ন হয়েছে বলে মনে করেন। তিনি সাহিত্য প্রকাশের কথা বললেন। যথার্থই বলেছেন ওসমান গনি। দেশের সেরা দুটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও তো সে-দুটোই। প্রকাশক দু’জনও সবচেয়ে প্রবীণÑ মহিউদ্দিন আহমেদ ও মফিদুল হক। বিশ্বের বড় বড় বইমেলায় ঘোরার অভিজ্ঞতা এ দু’জনের বেশি। অভিজ্ঞতার সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি ও রুচিও জরুরী। তার অভাব ঘটলে প্যাভিলিয়ন হয়ে উঠতে পারে বইয়ের গুদামঘর। এমন উদাহরণও আছে বইমেলায়। আবার প্যাভিলিয়ন নেয়নি, তবু দৃষ্টিনন্দন করে সাজিয়েছে স্টল, এমন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কম নয়। এগুলোর ভেতর পুরনো প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য, কথাপ্রকাশ, বাংলাপ্রকাশ যেমন রয়েছে, তেমনি নবাগতদের মধ্যে জার্নিম্যান, অনুপ্রাণন, চিত্রা প্রকাশনীও আছে।

বইমেলা নিয়ে আরও দুয়েকটি কথা বলে সরাসরি চলে যাব নতুন বই আর লেখকদের গল্পে। বইমেলায় তথ্যকেন্দ্র থেকে যে ঘোষণা দেয়া হয়ে থাকে তা অনেক সময় শব্দদূষণের পর্যায়ে চলে যায়। বাচন শ্রুতিমধুর হওয়া যেমন বাঞ্ছনীয়, তেমনি শব্দের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখাও কর্তব্য। এত বছরেও এসব দেখার কেউ থাকবে না! বইমেলার সময় রাত নয়টা পর্যন্ত করার কথা বলা হচ্ছে বার বার কর্মজীবীদের কথা ভেবেই। কর্তৃপক্ষ সেটা বোঝেননি। বইমেলা বহু বছর যাবত প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে। এটি কেবল লেখকদের ‘ঈদ’ নয়, পাঠকদেরও আনন্দোৎসব। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন টকশো বসে টিভি স্টুডিওতে, মেলামাঠ থেকে গ-ায় গ-ায় টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করে অনুষ্ঠান। সব দৈনিকের শেষ পাতার বিশেষ জায়গা বরাদ্দ থাকে বইমেলার জন্যে। বিজ্ঞাপনে দেয়া হয় উচ্চ ছাড়। বইমেলার প্রতিবেদক নিজে লেখক হলে সেই লেখা পাঠককে টানে বেশি। সুমন্ত আসলাম ও নওশাদ জামিল দুটি সংবাদপত্রে লিখছেন। শুধু বাইরের চোখ নয়, অন্তরের চোখ দিয়েও যে বইমেলাকে অবলোকন করা দরকার, এ দু’জনের লেখায় সেটা পেলে ভাল লাগে।

বইমেলায় যেসব লেখকের সঙ্গে আড্ডা হয়েছে তাদের ভেতর আছেন কবি ফারুক মাহমুদ, মিনার মনসুর, মুজতবা আহমেদ মুরশেদ, মানিক রাজ্জাক, লুৎফর রহমান রিটন, গোলাম কিবরিয়া পিনু, সালাম সালেহউদ্দীন, শামসেত তাবরেজী, সরকার আমিন, শিহাব শাহরিয়ার, মাসউদ আহমেদ, মনি হায়দার, শাহনাজ নাসরীন, মণিকা চক্রবর্তী, স্বকৃত নোমান, নাজিব তারেক এবং আরও অনেকেই।

এবার সিনিয়র লেখকদের কম দেখছি মেলায়। সদ্য একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বইমেলায় এলে তাকে ঘিরে ধরেন টিভি-সাংবাদিকরা। জাহানারা পারভীন টিভি-সাংবাদিক, তার নতুন কাব্যগ্রন্থ বেরুলে সতীর্থরা উৎসবে মেতে ওঠেন। মুনতাসীর মামুন মেলায় এলে বন্ধুর স্টল সুবর্ণতে বসেন। সেখানে আসেন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরও। মঈনুল আহসান সাবেরের বেশ কয়েকটি গল্প-উপন্যাস বেরুলেও তিনি থাকেন নিজের স্টল দিব্যপ্রকাশে। ইমদাদুল হক মিলনের দেখা মিলবে অনন্যায়, যদি তিনি মেলায় যান। যেমন আনিসুল হককে পাওয়া যাবে প্রথমার সামনে। জার্নিম্যান স্টলে তারিক সুজাতের সঙ্গে পাওয়া যায় অনেক কবিকেই। প্রতিটি মেলার সময় অস্ট্রেলিয়া থেকে আসেন অনুবাদক ফজল হাসান। এবার তার দুটি বই ‘চীনের শ্রেষ্ঠ গল্প’ ও ‘ম্যানবুকার বিজয়ীদের সেরা গল্প’। কানাডা থেকে এলেন কবি তুষার গায়েন, তার নতুন বই নেই অবশ্য। অনুবাদে এবারের সেরা প্রকাশনার কথা বলতে গেলে অন্তত দুটো বইয়ের কথা বলতেই হবে। এর একটি মাসরুর আরেফিন অনূদিত ‘ইলিয়াড’, দ্বিতীয়টি ৫ মহাদেশের নির্বাচিত গল্প নিয়ে মেহবুব আহমেদের ‘ছড়ানো ভূগোলে ছোটগল্প’। হোমারের ইলয়াডের ভূমিকা ও পাঠ-পর্যালোচনাও সংযুক্ত করেছেন অনুবাদক। তার প্রকাশক (পাঠক সমাবেশ) বলছেন, ১৫,৬৯৩ লাইনের এ মহাকাব্যটির এত বিশ্বস্ত বাংলা অনুবাদ আর কখনোই হয়নি। পার্স করা (বাক্যের অন্তর্গত শব্দগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নির্দেশ ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ করা) এক গ্রিক-ইংরেজী ইন্টারলাইনার টেক্সটের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই বাংলা অনুবাদ লাইন-বাই-লাইন হোমার। এতে কিছুই যোগ করা হয়নি যা মূল হোমারে নেই, আর কিছুই বাদ দেয়া হয়নি যা মূল হোমারে আছে।

কবিতার বইয়ের প্রোডাকশন দুর্দান্ত হওয়া চাই। এখনও গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো আসেনি। পহেলা ফাল্গুন আর ভালবাসা দিবসকে সামনে রেখেই অনেক প্রকাশক কবিতার বই নিয়ে আসেন মেলায়। এরই মধ্যে যেগুলো চোখ ও মন কেড়েছে তার ভেতর আছে মারুফুল ইসলামের কবিতাসংগ্রহ, কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতাসমগ্র, কাজল শাহনেওয়াজের একটি পুরুষ পেঁপে গাছের প্রস্তাব, সৈয়দ তারিকের ঊনসন্ন্যাসী, জফির সেতুর প্রস্তরলিখিত, মোশতাক আহমদের ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, পিয়াস মজিদের কুয়াশা ক্যাফে, আফরোজা সোমার ডাহুক, রহিমা আফরোজ মুন্নীর উড্ডীন নদীর গান ইত্যাদি। প্রথম কবিতার বই বেরুচ্ছে অনেক কবিরই, আশা করছি এঁদের মধ্যে পাঠকদের নজর কাড়বেন চৈতী আহমেদ, মাহবুব আজীজ, রুখসানা কাজল, ফারুক ওয়াসিফ প্রমুখ। বয়োকনিষ্ঠ লেখকদের বই সিনিয়রদের কিনতে দেখা যায় কম। কবি সোহেল অমিতাভ, কথাসাহিত্যিক আন্দালিব রাশদী খুঁজে খুঁজে আমার প্রথম উপন্যাসটি নিলেন। জানি না আর কোন কবির লেখা উপন্যাস এবার বেরিয়েছে কিনা। জনকণ্ঠেই বেরিয়েছিল আমার এ উপন্যাস ‘রানী ও কেরানি’। দীর্ঘদিন গল্প লিখলেও এবারই প্রথম উপন্যাস এলো বদরুন নাহারের।

নাজমুল হুদা রতন একাধারে লেখক-প্রকাশক। তাঁর প্রকাশনীর স্টলে (সাহস) তরুণ লেখকদের আড্ডা বসে, আসেন রেজাউদ্দীন স্টালিন, কামরুজ্জামান, বকুল আশরাফ, ক্যামেলিয়া আহমেদ প্রমুখ। গল্প-শিশুতোষ-অনুবাদ কবিতা সব মিলিয়ে বকুল আশরাফের এবার বেশ কিছু প্রকাশনা। অনুপ্রাণন-এর স্টলের আড্ডায় আসেন এখান থেকে প্রকাশিত বইয়ের নবীন-তরুণ লেখকরা। পনেরো-কুড়িজন তো হবেই। প্রবীণদের ভেতরও আসেন অনেকে, যেমন মঞ্জু সরকার। এই স্টলে কুহক মাহমুদ নিয়মিত থাকেন, আসেন অঞ্জন আচার্য, মোজাফফর হোসেন। অনুপ্রাণন-এর আরেক লেখক সুলতানা শাহরিয়া পিউ অনুবাদ করেছেন পার্সি কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামির অর্ধশত কবিতা।

লেখক-দম্পতি ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ও ফারহানা মান্নানকে দেখেছি খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন লেখকের বই কিনতে। সাযযাদ কাদির ও মাসুদুজ্জামানও প্রয়োজনীয় বই খুঁজে বেড়ান স্টলে স্টলে। এছাড়াও নতুন বইয়ের খোঁজ যার কাছে বেশি পাই তিনি আহমাদ মাযহার। মেলা চষে বেড়ান তিনি। বইমেলায় যেসব কবি-সাহিত্যিককে ঘুরে বেড়াতে দেখি তাদের ক’জনই বা স্টলে স্টলে গিয়ে নতুন বইয়ের সন্ধান করেন!

প্রিয় পাঠক, শুভ পহেলা ফাল্গুন। শুভ ভালবাসা দিবস।

marufraihan71@gmail.com