২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রসার পায় যাত্রাপালা


বাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে ॥ প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যের যাত্রাপালা। অথচ ব্রিটিশ আমল থেকে মাত্র দু’দশক আগেও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের শহর ও গ্রামগঞ্জের মেলায়-প্রদর্শনীতে যাত্রাপালার জমজমাট আসর বসত। এসব আয়োজনে রাতজেগে ভিড় জমাত নানা বয়সী হাজারো মানুষ। দর্শক শ্রোতার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও যাত্রাশিল্পীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত, পেশা বদল ও এই শিল্প মালিকদের কম পুঁজি বিনিয়োগের মানসিকতাসহ অশ্লীলতা নির্ভর কথিত যাত্রাপালার দাপুটে প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্দিনের ধারাবাহিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই যাত্রাপালা। তারপরও এই যাত্রাশিল্পের সঙ্গে যেসব শিল্পী ও কলাকুশলী আঁকড়ে রয়েছেন তাদের অমানবিক দিন চলছে। এসব নানা কারণে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে শীত মৌসুমে বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন হলেও যাত্রাপালার নামে যে আয়োজন থাকে সেটি অশ্লীলতায় ভরা নাচগান ছাড়া আর কিছুই নয় বলে দাবি স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মীদের। এ নিয়ে হতাশ স্থানীয় প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মীরা।

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ প্রকাশিত বার্ষিকী ‘ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি’তে সুধীর দাসের লেখা ময়মনসিংহের নাট্য পরিক্রমা থেকে জানা যায়, একসময় কলকাতা ছিল বঙ্গ সংস্কৃতির কেন্দ্র। কলকাতাতেই প্রথম বাংলা নাট্যশালা স্থাপিত হয়েছিল এবং কালক্রমে জমিদার ও ধনিক শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় এটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা ১৩৫২ সালে আটআনি রাজ এ্যাস্টেটের রাজা জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরীর কনিষ্ঠপুত্র কুমার ভুপেন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরী তৎকালীন ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করে মুক্তাগাছার রাজবাড়িতে স্থাপন করেন ভুপেন্দ্র বঙ্গপীঠ নামে স্থায়ী ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চ। পূর্ববঙ্গে এটিই ছিল প্রথম নাট্যমঞ্চ। পরবর্তীতে সংস্কৃতিমনা জমিদারদের নিজ উদ্যোগে প্রতিটি রাজবাড়িতে নাট্যচর্চার এরকম আয়োজন গড়ে তোলার কারণে এতদঞ্চলে নাট্যচর্চা ও নাট্যকর্মীর বিস্তার ঘটে। কিন্তু তারও বহু আগে ব্রিটিশ আমল থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিত্তশালী ধনিক শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় যাত্রাপালা চলে আসছিল। ময়মনসিংহ জেলার সর্বত্র লোকনাট্যের যেসব পালা অতীত থেকে আজ পর্যন্ত অভিনীত হয়ে লাখ লাখ মানুষের আনন্দের খোরাক জুগিয়ে চলেছে তার মধ্যে ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ বিভিন্ন পালা বা গাঁথা, রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী, শিব পার্বতীবিষয়ক পালা, মনসার ভাসান, হরিশ্চন্দ্রের পালা, সাবিত্রী সত্যবানের কাহিনী, ঢপযাত্রা বা কৃষ্ণযাত্রা, গুণাইবিবি, জরিনা সুন্দরী, রাখাল বন্ধু, উমরাবাইদ্যার পালা, রূপবান এবং পৌরাণিক, ঐতিহাসিক বা লোকায়ত কাহিনী ভিত্তিক যাত্রাগান ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ কাহিনীগুলোর মধ্যে দস্যু কেনারামের পালা, মহুয়া বা হোমরা বাইদ্যার পালা উত্তর-পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। নবরঞ্জন অপেরার পরিচালক ও খ্যাতিমান যাত্রাশিল্পী হাবীব সারোয়ার জানান, যাত্রাশিল্প মালিকরা মাসিক বেতন দিয়ে শিল্পীদের পুষতেন। বছরে ৩ মাস রিহার্সেল চলত। শীতকালজুড়ে চলত যাত্রাপালা। প্রতিটি যাত্রাপালায় ম্যানেজার রাখতেন মালিকরা।

ধনিক শ্রেণীর মালিকরা ছিলেন সংস্কৃতিমনা। মানসম্পন্ন শিল্পী ও পালা মঞ্চায়নের অভাবসহ অপেশাদার মালিকদের কমপুঁজি বিনিয়োগের মানসিকতা এবং যাত্রাপালার নামে অশ্লীলতা প্রদর্শনের কারণেই মুখ থুবড়ে পড়েছে এই শিল্প। যেখানে একটি পালা পরিচালনায় ১৪ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী শিল্পীর প্রয়োজন সেখানে খরচ কমাতে ৫-৬ জন শিল্পী নিয়ে পালা চালাতে চান মালিকরা।