১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রাজাপাকসের পতনের নেপথ্যে


রাজাপাকসের পতনের  নেপথ্যে

কঠোর হাতে ১০ বছর শ্রীলঙ্কাকে শাসন করে আসা মাহিন্দা রাজাপাকসের সর্বশেষ ভোটে পরাজয়ের পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ইন্ধন ছিল এমন অভিযোগ উঠেছে। চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে রাজাপাকসেরই এক সময়ের মন্ত্রী মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করাতে কলকাঠি নেড়েছিলেন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কলম্বো স্টেশনের প্রধান। আর এই অভিযোগ ওঠার পর নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে শ্রীলঙ্কা ‘র’-এর ওই কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হয়।

‘র’-এর কলম্বোর ‘স্টেশন প্রধানকে সরিয়ে আনার কথা স্বীকার করলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, অন্য কোন কারণ নেই, ওটা ছিল চাকরির নিয়মিত বদলির অংশ। তবে কলম্বো এবং নয়াদিল্লীর সূত্রগুলো বলছে, এক মাস আগে গত ডিসেম্বরে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে সরাতে বলেছিল শ্রীলঙ্কা সরকার। এরপর তাকে সরিয়ে আনা হয়। শ্রীলঙ্কার দৈনিক সানডে টাইমস গত ২৮ ডিসেম্বর খবর ছাপিয়েছিল, সম্মিলিত বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দাম দিলেন ‘র’-এর কলম্বোর স্টেশন চিফ।

মাহিন্দা রাজাপাকসে ওই সময় প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকা রাজাপাকসে রয়টার্সের জিজ্ঞাসায় বলেছেন, তিনি সব কিছু ভালভাবে জানেন না। অন্যদিকে গত ৮ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা নেতৃত্বাধীন সরকারের ভাষ্য হচ্ছে, বিষয়টি তারা নিশ্চিত নয়, তবে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর তাদের চোখে পড়েছে।

প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আগে থেকেই ভূমিকা রেখে আসছিল ভারত। তামিল বিদ্রোহীদের দমনে শ্রীলঙ্কা সরকারকে সহযোগিতায় ১৯৮৭ সালে সৈন্যও পাঠিয়েছিল ভারত। শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা জানিয়েছেন, আগামী মাসে প্রথম বিদেশ সফরে নয়াদিল্লী যাবেন তিনি। তার বৈদেশিক নীতিতে অগ্রাধিকার ভারতকেই। ভারতীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বন্দ্বে লিপ্ত বিরোধী দলগুলোকে একত্র করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন এমন অভিযোগ পাওয়ার পর ‘র’-এর ওই প্রতিনিধিকে ডেকে পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে সিরিসেনাসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতাকে রাজাপাকসের দল ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে বৈঠক করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়, জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা; যাদের সঙ্গে ভারতের গনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

যাই হোক, নির্বাচনের আগে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজ) বলেছিল যে, বিরোধী প্রার্থী সিরিসেনা বিজয়ী হলেও ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে, এমনটি না-ও হতে পারে। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ও তাঁর অন্য দুই ভাই ক্ষমতা ধরে রাখতে বিকল্প নানা ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে তাঁর অনুগত সুপ্রিমকোর্টকে দিয়ে নির্বাচনটি বাতিল করাতে পারেন অথবা শেষ উপায় হিসেবে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এক দিন না পেরোতেই গত শনিবার সন্ধ্যায় কলম্বো মিরর খবর দিল যে, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্র রাজিথা সেনারতেœ জানিয়েছেন, যে প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ঠিক সেই চেষ্টাটাই করেছিলেন। ভোটে তিনি হেরে যাচ্ছেন এমন আলামত দেখে তিনি সেনাপ্রধান দয়া রতœায়েকেকে প্রেসিডেন্ট ভবনে ডেকে আনেন। মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী সেনাপ্রধান সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখেন যে, প্রধান বিচারপতি তাঁর আগেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। মুখপাত্র জানান যে, প্রেসিডেন্ট তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনা মোতায়েনের কথা বললে সেনাপ্রধান তাতে রাজি হননি। ফলে নিরুপায় রাজাপাকসে পরাজয় মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন, যা তাঁর সমর্থকদের তো বটেই, এমনকি বিদেশী পর্যবেক্ষকদেরও বিস্মিত করে।

প্রায় তিন দশক ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল বিদ্রোহ মোকাবিলায় রাজাপাকসে যে কঠোর নীতি অনুসরণ করে সফল হয়েছিলেন, তা দেশটির সংখ্যালঘু সিংহলি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উজ্জীবন ঘটায়, তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি তাঁর নেতৃত্বকে আরও সংহত করতে সমর্থ হন।

ক্ষমতা ধরে রাখার বাসনায় প্রেসিডেন্ট পদে দুবারের বেশি নির্বাচন করার বিধান না থাকলেও সংবিধান সংশোধন করে সেই বাধা অপসারণ করেছেন। আদালতের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রধান বিচারপতিকে অপসারণ করেছেন। সুপ্রিমকোর্ট সেই অপসারণকে অবৈধ ঘোষণার পরও তিনি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সফল হন এবং তাঁর পছন্দমতো সুপ্রিমকোর্টের পুনর্গঠন করেন। ক্ষমতাকে পরিবারের মধ্যে কুক্ষিগত রাখার ক্ষেত্রেও তিনি নতুন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে ওঠেন তাঁর ভাই প্রতিরক্ষা সচিব গোটাবায়া রাজাপাকসে। তাঁর ভাইদের মধ্যে একজন উন্নয়নমন্ত্রী ও আরেকজন স্পীকার। এত কিছুর পরও ক্ষমতার দম্ভে মত্ত মাহিন্দা রাজাপাকসে রাজনৈতিক হিসাব কষে বিরোধীদের অনৈক্য ও দৈন্যদশার সুযোগ নিতে জ্যোতিষীর পরামর্শে মেয়াদের দুই বছর বাকি থাকতেই আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় রাজাপাকসের কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ এতটাই ব্যাপকভিত্তিক ও কঠোর রূপ নিয়েছিল যে দেশ-বিদেশে সবাই তাঁকে শ্রীলঙ্কার নতুন রাজা হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করেছিলেন।