১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রাখাইনদের ভাগ্যোন্নয়নে চিত্তরঞ্জন


বাংলাদেশের সহজ-সরল রাখাইন মহিলাদের জীবনযাপন প্রণালী সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই খুব একটা স্বচ্ছ ধারণা নেই বললেই চলে। এদের পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী গোটা সংসারের ভরণপোষণের গুরু দায়িত্বটা স্ত্রীকে পালন করতে হয়। মহিলাদের অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বল্প বিত্তবান এই মহিলাদের জন্য অর্থ উপার্জন খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। গ্রামীণ পরিবেশে এটি একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তেমনি বরগুনা জেলার তালতলি উপজেলার রাখাইন মহিলাদের জীবনচিত্র।

মান্ধাতার আমলের নিজস্ব তাঁতমেশিন দিয়ে রাখাইনদের অনেকেই কাপড় বুননের কাজ করে কোনমতে জীবন-জীবিকা চালাত। তাদের জীবনের আর্থিক দুঃখ-দুর্দশাকে কিছুটা লাঘব করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশনে’র ’কোস্টাল লাইভলিহুডস অ্যাডাপটেশন প্রজেক্ট’ (সিএলএপি) এর আওতায় রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আরডিএফ) নামে বেসরকারী সংস্থার মাধ্যমে উপকূলীয় রাখাইন মহিলাদের পরিবার মাথাপিছু একটি করে চিত্তরঞ্জন তাঁত দেয়া হয়। উক্ত তাঁত পরিচালনা বা কাপড় বুনোনের জন্য তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং প্রাথমিকভাবে কিছুটা আর্থিক সহায়তা বা বস্ত্র তৈরির উপকরণাদি প্রদান করা হয়। তবে রাখাইন মহিলারা ওই চিত্তরঞ্জন তাঁতকে সেমি অটোলোম বলে।

চিত্তরঞ্জন বা সেমি অটোলোম দ্বারা মাত্র দু’বছরের মধ্যেই তাদের ভাগ্যের চাকাকে সচল করতে সক্ষম হয়েছে। সংসারে এসেছে আর্থিক সচ্ছলতার সবুজ সঙ্কেত। স্বামীর নিকট বেড়েছে তাদের অনেক বেশি কদর। ছোট-খাটো রোগের চিকিৎসা করতে আগের মতো এখন আর হিমশিম খেতে হয় না। বর্তমানে সন্তানদের স্কুলড্রেস কিনে রীতিমতো পড়াতে পারছে। আগের মতো ২-১ বেলা না খেয়ে থাকতে হয় না, বরং উন্নততর খাবার খেতে পারছে। সমাজেও বেড়েছে তাদের সম্মান বা মর্যাদা। এক কথায়, এই চিত্তরঞ্জন একটা বড় ধরনের আশীর্বাদ বলেই তারা মনে করছে। এই সহজ সরল মহিলারা অর্থশাস্ত্রের লাভ-ক্ষতি নির্ণয়ের সূত্র হয়তো জানে না। তাই নিজের বা পারিবারিক শ্রমকে তারা খরচের খাতায় লিপিবদ্ধ করে না। চিত্তরঞ্জন থেকে অনেক বেশি লাভ হয় বলে তারা মনে করে। আগে একজন মহিলা তাদের নিজস্ব তাঁত ব্যবহার করে ২-৩ দিনে একটি মাত্র শার্টের পিস বুনতে পারত। আর এখন চিত্তরঞ্জন দিয়ে প্রতিদিনই ২-৩টি শার্টের পিস সহজেই বুনতে পারছে। তারা কিন্তু বাহারি ডিজাইনের জামার কাপড়, বিছানার চাদর, শাল ইত্যাদি তৈরি করে থাকে। একজন মহিলা চিত্তরঞ্জন ব্যবহার করে বছরে গড়ে টাকা ১৭,৩০০ মুনাফা করতে সক্ষম হচ্ছে। আর পারিবারিক শ্রম খরচ এই হিসেব থেকে বাদ দিলে ওই মুনাফা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২-৩ গুণ বেশি। আর সে জন্যই চিত্তরঞ্জন হলো তাদের ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি।

জেলা শহর থেকে রাখাইন গ্রামে যাবার রাস্তাটি ছিল খুবই খারাপ। সুতরাং তাদের উৎপাদিত সুন্দর সুন্দর বস্ত্রাদি বিক্রি করতে কিছুটা জটিলতার সৃষ্টি হয়। ফলে, তারা পণ্যের নায্যমূল্য পাচ্ছে না এবং মুনাফার পরিমাণ কম হচ্ছে। অপরপক্ষে, বস্ত্রের উপকরণাদি যেমন সুতা ক্রয়, রং, ববিন ইত্যাদিতে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, এদের অটোলোম কেনার জন্য সহজশর্তে প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহ করা গেলে কাপড়ের উৎপাদন এবং গুণগত মান বহুলাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব। শুধু বস্ত্র বাজারজাত ও বিপণনের সুব্যবস্থা করা হলে রাখাইনদের তৈরি কাপড় দিয়ে সুন্দর সুন্দর পোশাক তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশকে দ্রুত সমৃদ্ধির পথে নিয়ে আসা যায়। আর রাখাইনসহ গ্রামীণ বহু বেকার ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা এবং খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব।

অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।