২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ওয়ান মাইল স্কয়ার


বুড়িগঙ্গা নদী তীরের ঢাকা একটি প্রাচীন শহর। ধারণা করা হয় খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের আগে ঢাকা নগরের গোড়া পত্তন। তারপর বুড়িগঙ্গায় অনেক জল গড়িয়েছে। ঢাকা হারিয়েছে তার অতীত। সেই ঢাকা এখন পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকার সেই পুরান এখন আর নেই। ঢাকার কোন কিছুই ঠিক ঠাক নেই। আগের চেয়ে সংস্কার হয়েছে, সুউচ্চ দালান কোঠা বাড়লেও যৌবনের স্মৃতি বিজড়িত পুরান ঢাকার সব সৃষ্টিই নীরবে নিস্তব্ধ হতে চলেছে। পুরান ঢাকার সেই নিস্তব্ধ রূপ দেখার জন্য, আষাঢ়ের বৃষ্টি আঁচড়ানো অপরাহ্ণে কিংবা কোন গনগনে ভাদ্রের দুপুরে অথবা শৈত্যপ্রবাহের কোন সন্ধ্যায় মন আনচান করলেও জ্যামের জন্য ইচ্ছে করে না যেতে বা এখন আর মন চায় না জ্যাম সরিয়ে চারশ বছরের পুরনো শহর ঢাকা থেকে একবার ঘুরে আসতে। এভাবেই আমরা নিজেকে নির্বাসিত করে রাখি আমাদের অতি প্রিয় পুরান ঢাকা থেকে। তবে নতুন কিছু যোদ্ধা পেয়েছে পুরান ঢাকা। সে জন্য নতুনভাবে নতুন অবয়বে মুখরিত হচ্ছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে। আর সে চেষ্টাই করল সৃজনশীল সংগঠন বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট। নেদারল্যান্ডসের সংস্থা আর্টস কোলাবরেটরির সহায়তায় ‘ওয়ান মাইল স্কয়ার’ শিরোনামে গত ২ জানুয়ারি দিনভর বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট পুরান ঢাকায় আয়োজন করল এক ব্যাতিক্রম ও অনন্য শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর। প্রায় এক মাইল এলাকার ১৬টি স্থানে এই প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্য আয়োজনটি এবারই প্রথম ছিল না, ২০০৯ সালে আয়োজনটি প্রথম রচিত হয়। সকাল ১০টায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলে উন্মুক্ত প্রদর্শনীটি। এ বিষয়ে প্রদর্শনীর শিল্পনির্দেশক মাহবুর রহমান বলেন, ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ঠাসা আমাদের এই নগর। এই নগরে রয়েছে বিখ্যাত বিনত বিবির মসজিদ, আছে আহসান মঞ্জিল, ইসলাম খাঁর প্রাচীন দুর্গ ছোটকাটরা, বড় কাটরা, হোসনি দালান, মকিম কাটরা, ঢাকেশ্বরী মন্দির, বাহাদুর শাহ পার্ক, লালবাগের কেল্লা, রূপলাল হাউসসহ কত ইতিহাস ও ঐতিহ্য। পুরো পুরান ঢাকাই আমাদের গর্ব। এই গর্বকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এলাকাবাসীর সচেতনতা সবচেয়ে বেশি দরকার। সেই লক্ষ্যেই আমাদের আজকের এই আয়োজন।’

পঞ্জিকা মতে পৌষমাসের শেষ অধ্যায় চলছে। শীত শেষ হতে আরও একমাস বাকি অথচ এদিন শীত যেন কোথায় হাওয়া। বুড়িগঙ্গার কাছের বুলবুল ললিত কলা একাডেমীতে গিয়েও শীতের আমেজ পাওয়া গেল না। তবে এখানে দেখা হয়ে গেল মোল্লা সাগরের ভিডিও চিত্র। বিষয় চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের বাড়ি অনুসন্ধান। মূল একাডেমী ভবনের ঠিক পেছনে একাডেমীর নিজস্ব মাঠটিতে শিল্পী শিমুল দত্ত প্লাস্টিক দিয়ে মানুষ আদলের মূর্তি বানিয়ে রাখলেন বাস ও সিমেন্ট বস্তার স্তূপের ওপর। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল শিল্পকর্ম বিষয়ে তার ভাবনা। ‘অসলে এই নগরের এবং আমাদের ব্যবহার্য কোন কিছুই ফেলে দেবার নয়। যা কিছু ফেলনা সে থেকেই নানা রকম সামগ্রী তৈরি সম্ভব। আর সেটাই আমি করে দেখিয়েছি এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে।’

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহমান সূতিকাগার বিউটি বোর্ডিং। বিউটি বোর্ডিং অনেকের কাছেই নস্টালজিয়া। বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা বা হারিয়ে যাওয়া সোনালী বিকেল- এসব মিলে পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। দিনব্যাপী প্রদর্শনীর একাংশ চলে বিউটি বোডিংয়ে। এখানে প্রদর্শিত উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনীগুলো হচ্ছে; গাছের ওপর নানারকম লাইট দিয়ে শিল্পী সুলেখা চৌধুরীর শিল্পকর্ম ‘জ্যোস্নায় অমাবস্যা’। শিল্পী মুনেফ ওয়াসিফ আলো-আঁধারিতে তুলে আনলেন পেপার নেগেটিভ। ইমরান হোসেন পিপলু, কবির আহমেদ ও মাসুম চিস্তি তৈরি করেন টুইন্স ইন দি ওম্ব নামের স্থাপনা। এ বিষয়ে শিল্পীত্রয় বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে এখানে পাকিস্তানী বর্বরতায় শহীদ হন মোট ১৭ জন। কৃত্রিম এই স্থাপনার মাধ্যমে বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস ছিল আমাদের।’ সেদিন প্রমথেশ দাসের স্থাপনাটিও ছিল নজরকাড়া। প্রদর্শনী নিয়ে প্রশ্ন করলে বিউটি বোর্ডিংয়ের অন্যতম স্বত্বাধিকারী তারক সাহা বলেন, ‘ওদের শিল্পকর্ম এবং সব কিছু মিলে একটি ব্যতিক্রমধর্মী দিন গেল আজ। খুব ভাল হয়েছে। ব্যাপার শুধু পুরান ঢাকার স্থাপনা রক্ষা নয়, ঢাকার পুরনো জায়গাগুলো যেন টিকে থাকে এই আয়োজনের মাধ্যমে সবার কাছে আমার এই আবেদন।’ তারপর তিনি বলেন, টুইন্স ইন দি ওম্ব দেখে মুগ্ধ আমি। মুগ্ধ আমি ‘উত্থিত পুরনো দিনের গল্প’ শিরোনামের প্রদর্শনীর ঘড়ির সবগুলো এ্যালার্ম দুইঘণ্টা পরপর বেজে উঠতে দেখে। এ বিষয়ে অ্যালার্ম ঘড়ির শিল্পী ঋতু সাত্তার বলেন, ‘এক সময় পুরান ঢাকায় কুলঙ্গিতে প্রদীপ জ্বালানো হতো আমি আজ সেখানে এ্যালার্ম ঘড়ি বসিয়েছি। আসলে আমাদের এই আদি বা পুরনো ঢাকার সেই পুরনো গল্পগুলো বদলে যাচ্ছে, বেশির ভাগ হারিয়ে যাচ্ছে। আমার চেষ্টা ছিল সেই পুরনোকে তুলে আনা।’

পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ ও শ্যামবাজার এলাকা বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে লালকুঠি, রূপলাল হাউসসহ বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনা। পুরো এলাকায় ঘুরলে এখনও পুরান ঢাকার সেই সব দিনে ফিরে যাওয়া যায়। সে সব সোনালী দিনে যাওয়া যায়। প্রাচীন নগরীর অন্যতম প্রাচীন এলাকা বলা যায় এলাকাটিকে। এখানকার পাঁচবাড়ি নামের বাড়িটি সেই প্রাচীন আমলের সাক্ষী। শিল্পী ইমরান সোহেলের স্থাপনা সহবাস-১ প্রদর্শিত হয় বিখ্যাত সেই পাঁচবাড়িতে। নজরকাড়া সেই স্থাপনাটি ছিল সেদিন প্রদর্শনীর মূল আলোচ্য বিষয়। প্রচুর দর্শনার্থীর ভিড় ছিল স্থাপনাটির সামনে। এছাড়া ওয়ান মাইল স্কয়ার নামক প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনী ছিল বাহাদুর শাহ পার্কে শিল্পী খন্দকার নাছিম আহমেদের ভিক্টোরিয়া পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্ক, আন্টাঘর এবং আমাদের বাল্যশিক্ষা। এছাড়া শিল্পী তাইয়েবা বেগমের ওহ ওয়াটার এবং মাহবুবুর রহমানের ‘শাওয়ার উইথ ওয়েল’ নামের সুন্দর বনে তেল ট্যাংকার ডুবির প্রতিক্রিয়াবিষয়ক ভিডিও স্থাপনা দর্শক নন্দিত হয়।

৪০ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে ওয়ান মাইল স্কয়ার নামের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় বাহাদুর শাহ পার্ক, বিউটিবোর্ডিং, ঢাকা কেন্দ্র, পাঁচবাড়ি, মালাকার টোলা লেন, রূপলাল দাস লেন, শ্যামবাজার, জুবিলি স্কুল, ফরাশগঞ্জ এতিমখানা, লালকুঠি, ঈশ্বর দাস লেন, পোগোজ স্কুল, বুলবুল ললিত কলা একাডেমিসহ মোট ১৬টি এলাকায়। পুরো এলাকা এদিন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। এলাকার অনেকে এখন বাইরে থাকেন। এমন একটি আয়োজনের কথা শুনে সেদিনটি তারা তাদের শেকড়ে কাটিয়ে যান একটি দিন। বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষ, শিক্ষার্থী ও অনেক পর্যটক দিনটি পুরান ঢাকায় কাটিয়ে যান। এমন একজন ষাট বছর বয়সী উলফাত কাদের। কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র এবং এক সময়ের কলতাবাজারবাসী। তিনি তাঁর অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, দারুণ আয়োজন। খুব ভাল হয়েছে। আজকের আয়োজনে থাকতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। আমরা ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষার সব রকম চেষ্টা করে যাব।’ এরপর তিনি যোগ করেন, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে আগে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে। প্রদর্শনীতে বুড়িগঙ্গা নেই দেখে দারুণভাবে মর্মাহত!’

লেখক : পরিবেশকর্মী এবং প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

farukh.ahmed@gmail.com