২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নাজমুল হুসাইন ॥ আড়ালের বাকশিল্পী


১৯৬৮ সাল। তিনি তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। কলেজের এক ভবনের ক্লাস শেষে অন্য ভবনে ফাঁকে হিন্দি ভাষায় হঠাৎ হঠাৎ বলে উঠতেন ‘আ রাহা হ্যায়...!’ এরপর বাংলায় বিজ্ঞাপনের আদলে বলতেন, ‘প্রস্তুতকারক বেঙ্গল কেমিক্যাল।’ কেউ কেউ ভাবতেন মাথায় কোন গ-গোল আছে তাঁর। সেই পাগলামির টানেই হয়ত একটা জীবন পার করে দিলেন তিনি রেডিও’র সঙ্গে। তিনি নাজমুল হুসাইন। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী। অস্ত্র হাতে নয়, বরং কণ্ঠযুদ্ধে শরিক হন তিনি। যুদ্ধচলাকালেই পরিচয় হয় নাট্যকার মামুনুর রশীদের সঙ্গে। স্বাধীন বাংলায় ফিরে সেই মানুষটির নেতৃত্বে গঠন করেন ‘আরণ্যক নাট্যদল’। সেই দলের হয়ে অভিনয় করেছেন ‘পশ্চিমের সিঁড়ি’ এবং মুনীর চৌধুরীর আলোচিত নাটক ‘কবর’সহ অনেক নাটকে।

৭২ সালের ঘটনা। মামুনুর রশীদের কাহিনী অবলম্বনের নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘পায়ে চলা পথ’। সেই ছবির মধ্য দিয়েই নাজমুল হুসাইনের অভিনয়ের পথ চলা। এবারের ঘটনা ১৯৭৫ সালে। একটি ছবি এলো সেসময়। সেই ছবির কাহিনী নিয়ে একদিন উপস্থাপনার ভঙ্গিতে নিজে নিজেই আওড়াতে থাকেন তিনি। ছবিটির পরিচালক ছিলেন ইবনে মিজান। উনি তাঁকে ডেকে বললেন, ‘এই ছেলে তুমি তো ছবির ধারাভাষ্য হিন্দিতে বললে, একইভাবে বাংলায় বল তো দেখি।’ এভাবে তাঁর ‘দুই রাজকুমার’ সিনেমায় প্রথম কণ্ঠ দিলেন তিনি। একইসঙ্গে লেখা হলো ইতিহাস। ৩০ সেকেন্ডের সেই বিজ্ঞাপনটিই বাংলাদেশের প্রথম কোন ছায়াছবির বিজ্ঞাপন আজও অম্লান হয়ে আছে।

আমজাদ হোসেন সিনেমা করছেন ‘নয়নমণি’ নামে। আমজাদ হোসেনকে তিনি বলেন, ‘ভাই, রেডিও সিলনে আমিন সাহানী নামে এক ভদ্রলোক বোম্বে থেকে হিন্দিতে ১৫ মিনিটের অনুষ্ঠান করেন। আপনি চাইলে আপনার সিনেমারও বিজ্ঞাপন এভাবে হতে পারে। এরপর এ ব্যাপারে একটি স্ক্রিপ্ট দাঁড় করালাম। এ সিনেমার বিজ্ঞাপনের রেকর্ডিং হলো ইপসা রেকর্ডিংয়ে। সিনেমার প্রথম বিজ্ঞাপন, সিনেমার প্রথম রেডিও অনুষ্ঠান এখান থেকেই শুরু। দুই মাস চলেছিল অনুষ্ঠানটি। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল ছবিটার নামডাক।’

১৯৭৮ সাল। বাংলাদেশ বেতারে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সফল স্পন্সরড প্রোগ্রাম প্রথম শুরু করেন নাজমুল হুসাইন। নাম দেন তার ‘শনিবারের সুর’। এটাই বাণিজ্যিক কার্যক্রমের প্রথম অনুষ্ঠান। অল্প দিনেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল ‘শনিবারের সুর’ অনুষ্ঠানটি। এরপর ‘সুরে সুরে কেয়া সুপার বিউটি সোপ’, ‘হাঁস মার্কা নারিকেল তেল গানের দোলা’, ‘অভিযাত্রী সুরবিহার’ বাংলার মানুষের শ্রবণে ও মনে আজও গেঁথে আছে। এছাড়া কয়েক হাজার টিভি বিজ্ঞাপনে দিয়েছেন কণ্ঠ। ‘ইতিহাস’, ‘বর্তমান’, ‘যন্ত্রণা’, ‘বড় সাহেব’, ‘অশান্তি’, ‘মহানগর’Ñ এমন সব জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি করেছেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়। প্রযোজনা করেছেন সালমান শাহ্্-শাবনূর অভিনীত ‘রঙিন সুজন-সখী’ ছবিটি। ১৯৯১ সালে গড়ে তুলেন ‘ভাইব্রেশন টু’ নামে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা। জীবনের এ প্রান্তে এসে এখন তাঁর সময় কাটে বই পড়ে, টিভিতে বিদেশী চলচ্চিত্র দেখে, লেখালেখি করে, ইন্টারনেট ব্রাউজিং করে। গত ৩৯ বছর ধরে যে মানুষটি রেডিও’র স্পীকারের মতো জড়িয়ে আছেন বেতারের সাথে, সেই মানুষটিকেই অবহেলা ভরে দেখতে দেখা গেছে বেতারের হীরকজয়ন্তী উৎসবে। নিতান্ত সৌজন্যতায় পাঠানো হয় উনাকে উৎসবের কার্ড। ফোন দিয়ে জানানোর ভদ্রতাটুকুও কেউ বোধ করেননি। অথচ ‘সিলভার জুবিলি’ উৎসবে পুরো অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল তার উপরই। কথা শেষ। উঠব উঠব করছিলাম। এমন সময় তাঁর একটি কথায় মনটা ধক করে উঠল। তিনি বললেন, ‘চাকরি করিনি, ব্যবসা যা করেছিলাম তাও ছিল ক্ষণস্থায়ী। হিসেবি না বলে, টাকা-পয়সাও সঞ্চয় করিনি ব্যাংকে। জীবনে সঞ্চয় বলতে আমার এই গলটাই আছে। আজ যদি আমার এ গলাটা নষ্ট হয়ে যায়, কাল থেকে আমি বেকার।’

অঞ্জন আচার্য্য