২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ব্র্যাডম্যান ১২ সাঙ্গাকারা ১১


ব্যাট হাতে এগিয়ে চলেছেন কুমার সাঙ্গাকারা। আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম ক্ল্যাসিক্যাল উইলোবাজ প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাচ্ছেন নিজেকে। রানের পর রান, সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি, ডাবল সেঞ্চুরির পর ডাবল সেঞ্চুরিতে অভিজাতশ্রেণীর ওপরের দিকে তাঁর নাম। ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ইতিহাসের পঞ্চম ও তৃতীয় লঙ্কান হিসেবে টেস্টে ১২ হাজার রানের মালইলফলক অতিক্রমের একদিন পর গড়েন আরও এক নজির। তুলে নেন ক্যারিয়ারের ১১তম ডাবল সেঞ্চুরি। টেস্টে ১২টি ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তাঁর সামনে কেবল প্রয়াত অসি কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। ১৪৯৩ রান করে ছিলেন গত বছর ২০১৪ সালের সর্বাধিক রান সংগ্রাহক। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে দু-দুটি ঐতিহাসিক অর্জনে নাম লেখালেন সাঙ্গাকারা। এক কথায় বিদায়লগ্নে ব্যাট হাতে উড়ছেন ৩৭ বছর বয়সী লঙ্কান ক্রিকেটের এই দিকপাল!

ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানো যাঁর জন্য মামুলি, যে কোন ম্যাচেই তিনি সেটা করতে পারতেন। এতে খুব বেশি আশ্চর্য হওয়ার নেই! কিন্তু এবার কোন পরিস্থিতিতে সেটি করলেন? তা সত্যি চোখ কপালে তুলে দেয়ার মতো। নিউজিল্যান্ডের ২২১ রানের জবাবে এক পর্যায়ে ৭৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে প্রথম দিনেই হার দেখছিল শ্রীলঙ্কা, সেখান থেকে প্রতিরোধ গড়ে দলকে নিয়ে গেলেন ৩৫৬ রানে! লিড ১৩৫। এক শ’, দেড় শ’ পেরিয়ে হাঁকালেন ডাবল সেঞ্চুরি! আধুনিক ক্রিকেটের ক্ল্যাসিক্যাল উইলোবাজ সাঙ্গাকারা বেসিন রিজার্ভ পার্কে যা করেছেন, তার বর্ণনা ভাষাতীত। নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে জিমি নিশামের বলে ট্রেন্ট বোল্টের হাতে ক্যাচ তুলে দেয়ার আগে ৩০৬ বলে খেলেন ২০৩ রানের মনোমুগ্ধকর ইনিংস। চার ১৮ ও ছক্কা ৩টি। ১৯২৮-১৯৪৮ পর্যন্ত মাত্র ৫২ টেস্টেই ১২টি ডাব সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে এখনও সবার ওপরে ব্র্যাডম্যান। আর ২০০০ থেকে এ পর্যন্ত ১৩০তম টেস্টে ১১ নম্বর ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নিলেন বাঁ-হাতি স্টাইলিস উইলোবাজ সাঙ্গাকারা।

৯ ও ৭টি করে ডাবল সেঞ্চুরি নিয়ে এ তালিকায় তাঁর পেছনে দুই সাবেক তারকা ব্র্যায়ান লারা ও সদ্য অবসরে যাওয়া সতীর্থবন্ধু মাহেলা জয়াবর্ধনে। ৫ ডাবল সেঞ্চুরিতে বর্তমানদের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে পাকিস্তানের ইউনুস খান। মানুষ তার আশার সমান বড়। বিশ্বকাপ খেলে ওয়ানডে ছাড়বেন, ইঙ্গিত ছিল টেস্ট বিদায়েরও, তবে বিশেষ অনুরোধে চালিয়ে যাচ্ছেন সাদা পোশাকে এ খেলোয়াড়। ডাবল সেঞ্চুরিতে নাম লেখাতে চান ব্র্যাডম্যানের পাশে। ‘ব্র্যাডম্যানের মতো মহান কিংবদন্তির পাশে বসতে পারলে ভালই লাগবে। তবে এটা নির্ভর করছে বিশ্বকাপের পর সবকিছু কেমন যাবে, তার ওপর। নিজের ভবিষ্যত নিয়ে আমার ভাবনা কি হবে, সেটা একেবারে ঠিকঠাক অনুমান করা কঠিন। তবে আরও কিছুদিন টেস্ট ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া যায় কি না- এ নিয়ে গুরুত্ব দিয়েই ভেবে দেখব, কারণ নির্বাচকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।’ বলেন তিনি। ডাবল সেঞ্চুরির পথে ৫ রান করে করে ১২ হাজারি ক্লাবে নাম লেখান সাঙ্গাকারা, সেটিও দ্রুততম সময়ের রেকর্ড গড়ে! মাত্র ২২৩ ইনিংসে ল্যান্ডমার্ক অতিক্রম করেন সাঙ্গা, যেখানে শচীন ও পন্টিংয়ের লেগেছিল ২৪৭ ইনিংস! তিনি যে কেবল শ্রীলঙ্কা নয়, ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান, দারুণ এ কৃতীর মধ্য দিয়ে সেটি আরও একবার প্রমাণ করলেন ৩৭ বছর বয়সী সাঙ্গাকারা। ওয়েলিংটনে নিজেদের বছরের প্রথম ম্যাচে নামার আগে তাঁর রান ছিল ১১ হাজার ৯৯৫। এদিন সতীর্থদের প্যাভিলিয়নে যাওয়া-আসার মিছিলে যথরীতি গড়েন প্রতিরোধ, অপরাজিত ৩৩ রানের পথে ৫ রান যোগ করেই মাইলফলক স্পর্শ করেন সাঙ্গাকারা। ১৩০ টেস্টে (চলমান) ২২৩ ইনিংসে তাঁর রান এখন ১২১৯৮। ৫৯ গড়ে সেঞ্চুরি ৩৮ ও হাফ সেঞ্চুরি ৫১টি। ১৫ হাজার ৯২১ রান নিয়ে সবার ওপরে লিজেন্ড শচীন টেন্ডুলকর। পন্টিং, জ্যাক ক্যালিস ও রাহুল দ্রাবিড়Ñ তিনজন মাঝ খানে আছেন যথাক্রমে ১৩৩৭৮, ১৩২৮৯ ও ১৩২৮৮ রান নিয়ে। অর্থাৎ বর্তমানে খেলা চালিয়ে যাওয়াদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি টেস্ট রানের মালিক সাঙ্গাকারাই। মাস দুয়েক আগে অবসর নেয়া সতীর্থ মাহেলা জয়াবর্ধনের মোট রান ১১ হাজার ৮১৪, ৭ম স্থানে। বর্তমানদের তালিকায় সাঙ্গাকারার পেছনে ইনজুরিতে ক্যারিয়ার-শঙ্কায় থাকা অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক মাইকেল ক্লাকের রান ৮ হাজার ৪৩২, ২১তম! সাঙ্গাকারা টি২০ থেকে অবসর নিয়েছেন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত গত বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে। বন্ধু মাহেলা জয়াবর্ধনের সঙ্গে আসন্ন ১১তম ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলে রঙিন পোশাকের ওয়ানডেকেও বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। তবে নির্বাচকদের অনুরোধে আভিজাত্যের টেস্টে চালিয়ে যাবেন আরও কিছুদিন। চালিয়ে যাবেন বললে অপমান করা হবে। কারণ ব্যাট হাতে এখনও দলের সেরা পারফর্মার তিনি। এই আটত্রিশ ছোঁয়া বয়সেও ব্যাট হাতে দুরন্ত-দুর্বার কুমার সাঙ্গাকারা। ১২ ম্যাচের ২২ ইনিংসে ১৪৯৩ রান নিয়ে ২০১৪ সালে টেস্টে সবেচেয়ে বেশি রান সংগ্রহ করেছেন সাঙ্গা। ৭১ গড়ে সেঞ্চুরি ৪ ও হাফ সেঞ্চুরি ৯টি! একসময় কাঁধে ছিল নেতৃত্বে ভার, উকেটের পেছনে সামলেছেন উইকেটরক্ষকের দায়িত্বও। দুটি ছেড়ে (ওয়ানডেতে অবশ্য কিপিং করছেন) দিয়ে এখন খেলছেন কেবল লঙ্কান ব্যাটিংয়ের প্রাণভোমড়া হয়ে। স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলা ৮২ টেস্টে হাঁকিয়েছেন ৩০টি সেঞ্চুরি! কম যাননি ওয়ানডেতে। গত মাসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইতিহাসের চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে ১৩ হাজারি ক্লাবে নাম লেখান সাঙ্গাকারা! ক্রাইস্টচার্চে রান না পাওয়ার পরও অধিনায়ক ম্যাথুস যেমন বলেছিলেন, ‘সাঙ্গাকারার মতো ব্যাটসম্যানের জন্য রান পাওয়ায় শেষ কথা নয়, ও চলমান কিংবদন্তি, আমাদের অনুপ্রেরণা।’ খুব কি বাড়িয়ে বলেছিলেন? টেস্টে সাঙ্গাকারার সেঞ্চুরি ৩৮টি। এ তালিকাতেও তাঁর ওপরে মাত্র তিনজন। শচীন ৫১, ক্যালিস ৪৫ ও পন্টিং ৪১টি। শচীন ঊনচল্লিশে খেলেছেন, চল্লিশেও সমানে চালিয়ে যাচ্ছেন পাকিস্তানের মিসবাহ-উল হক। সুতরাং শ্রীলঙ্কা তো বটেই বিশ্বের তাবত ক্রিকেটপ্রেমী চাইবেন, সাঙ্গাকারা তাঁর ব্যাটিংয়ের অপুর্ব ছন্দে মাতিয়ে যান আরও কিছুদিন।