১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শক্ত হোক আগামীর বন্ধন


শক্ত হোক আগামীর বন্ধন

আশির দশকে একটি বাস্তবতার চিত্রায়ন অনেকেই বিটিভির পর্দায় দেখেছিলেন। তখন তো এখনকার মতো বিভিন্ন চ্যানেলে সয়লাব হওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। সেটি ছিল একটি নাটকের দৃশ্য। মোবাইলের যুগও নয় তখন। ল্যান্ডফোনই ভরসা। ফোন বাজছে। ধরলেন প্রৌঢ় এক ভদ্রলোক। ফোনে যাকে চাওয়া হচ্ছে তিনি একটু আগে বেরিয়ে গেছেন। ওপাশ থেকে বলা হচ্ছে প্রার্থিত ব্যক্তির জন্য একটি মেসেজ রাখা যাবে কিনা? যিনি ফোন রিসিভ করেছেন তিনি কে এবং প্রার্থিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক কী? ফোন রিসিভকারী ওই ব্যক্তির পিতা। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলছেন, মেসেজ রাখতে অপারগ। কেননা একই ছাদের নিচে পিতাপুত্র ও পরিবারের অন্যরা বসবাস করলেও দেখা-সাক্ষাত হয় কম। সবাই কর্মব্যস্ত। হয়ত কদাচিৎ রাতের খাবার টেবিলে দেখা হয় আবার নাও হয়। ছুটির দিনে যার যার মতো ছুটি কাটাতে ব্যস্ত। পুত্রের জরুরী মেসেজ রাখতে পারছেন না পিতা! এটা কিন্তু কোন ইগো প্রবলেম নয়। বরং পিতার সততা আর রূঢ় বাস্তবতা। দৃশ্যটির প্রেক্ষাপট তিরিশ বছর আগে রাজধানীর।

পর্যবেক্ষণ : ২

গত শতাব্দীর প্রায় ৩৫ বছর পরে এসে একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবারের খেটেখাওয়া পরিবারের দিকে এখন তাকালে চালচিত্র পাওয়া যায় তা একবার দেখা যাক। ধরা যাক কর্তাব্যক্তিটির নাম মহিদুর রহমান। থাকেন রাজধানীর সবুজবাগের নন্দীপাড়ায়। কাজ করেন পোশাক তৈরির কারখানায়। সেই সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে হেঁটেই যান অফিসে। সারাদিন অফিস করলেও ছুটি হয় না যথাসময়ে। ওভারটাইম বাধ্যতামূলক। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১১টা। ততক্ষণে একমাত্র কন্যাসন্তান নাইমা ৪ বছরের শরীর নিয়ে ঘুমে কাদা। মহিদুরও ক্লান্ত। ঘুমন্ত সন্তানের মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে একপলক তাকানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি। সকালে উঠে ঘুমন্ত সন্তানকে একটু চুমু দিয়ে আবার ছোটা। সপ্তাহের যেদিনটি ‘ছুটি’ নামে ঘোষিত দিনটি যায় সাংসারিক অন্যান্য কাজকর্মের পেছনে। নাইমাকে কোলে নিতে বা আদর করতে গেলে কেমন যেন করে। আসতে চায় না কোলে, নিতে চায় না আদর। ড্যাব ড্যাব করে কৌতূহল আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিজের জন্মদাতার মুখের দিকে। মনে মনে যেন বলতে চায়Ñ এ লোকটি কে?

দুটি বাস্তবতা শুধু চলমান সমাজেরই চিত্র নয়। বাঙালীর বংশ পরম্পরায় পরিবারের যে ভালবাসার আবহ গড়ে উঠেছে তাতে মলিনাতার ছাপ লেগেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা এখন আর রাজধানীর চিত্র নয়, কম বেশি সারাদেশেরই। জীবন-জীবিকার তাগিদে সবাই ব্যস্ত। সেই ব্যস্ততা দিনের উদয় থেকে অস্তই নয়, গভীর রাত পর্যন্ত। পরিবারে যে স্নেহ-মায়া-মমতার বন্ধন তিল তিল করে গড়ে ওঠে সেই বন্ধন যে ক্রমান্বয়ে ঢিলে হয়ে পড়ছে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? একই ছাদের নিচে বসবাস করে এই যে দেখা-সাক্ষাত না হওয়া তা কি আগামী দিনের পরিবারের অন্যতম মূল ভিত্তি ‘ভালবাসার বন্ধন’ ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কার প্রতি ইঙ্গিত দেয় না? তবুও বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয় বা হবে।

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এই ‘অপত্য’ সম্পর্ক কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। আগে অনুধাবন করতে হবে আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, দৈনন্দিন, জীবন প্রণালী, পৃথিবীর অন্যান্য সমাজ ব্যবস্থা বা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো থেকে ভিন্ন। আবহাওয়া ও জলবায়ু এবং নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়েও আমরা হার্দিক, প্রেমময়, কোমলতায় পূর্ণ হৃৎজগত। মনোভূমি গড়ে ওঠে ওইসব মানবিক অনুষঙ্গে। সেসব লালন-পালন ও বিস্তার ঘটাতে পরিবারের কোন বিকল্প নেই। পরিবার শুধু সমাজ গঠনেরই একক নয়, মানুষের ‘মানবিক’ গুণাবলী গঠনেরও ভিত্তিভূমি আর সেই ভিত্তি ভূমির মূল পরিচালক পিতা বা মাতা। চলমান সময়ে রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে বা ডিঙিয়ে উভয়কেই সন্তানের জন্য আলাদাভাবে সময় বের করে রক্তের বন্ধনকে শুধু দৃঢ় করতে নয়; মানবিক করে গড়ে তুলতে হবে। যদি সন্তান ও অভিভাবকের মাঝে এমন শূন্যতা বা ঢিলে বন্ধন চলমান থাকে তাহলে আগামী প্রজন্ম অভিভাবক, সংসার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে গিয়ে যথাযথ বিকাশ নাও ঘটতে পারে। মানসিকভাবে হতে পারে প্রতিবন্ধকতার শিকার। এটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। কর্মজীবী পিতা-মাতার পালাকরে হলেও সন্তানের কাছে যতটা বেশি সময় থাকা যায় সেদিকে দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। পাশাপাশি কর্মদাতা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থারও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করতে হবে। কেননা কার্যদাতাও সমাজের বাইরের কেউ নন। সমাজের একজন হয়ে তার বা তাদেরও আছে কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা।