২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

একজন অভিভাবকের প্রয়াণ


একজন অভিভাবকের প্রয়াণ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা খলিল উল্যাহ খান। ২০১২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। তার আগে তার বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে তিনি মাত্র একটি বারই পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। কিংবদন্তি এই অভিনেতা আর নেই। গতকাল রাজধানীর স্কয়ার হসপিটালে তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। দীর্ঘদিন যাবত তিনি কিডনিজনিত সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত নানান রোগে ভুগছিলেন। গত দু’দিন আগে তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর খারাপ হলে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ইনটেনসিভ কেয়ারে তাঁর চিকিৎসা চলে। গুরুতর একটি অপারেশনের জন্য সকালে তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবার সময় তিনি ইন্তেকাল করেন। খলিলের মৃত্যুতে গোটা চলচ্চিত্রাঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। পুরনো সহকর্মীরা যারাই তাঁর মৃত্যুর খবর শুনেছেন, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। কলিম শরাফী ও জহির রায়হান পরিচালিত ‘সোনার কাজল’ ছবিতে নায়ক হিসেবে খলিলের অভিষেক ঘটে চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ছিলেন সুলতানা জামান ও সুমিতা দেবী। সোনার কাজলের পর নায়ক হিসেবে ভাওয়াল সন্ন্যাসী, প্রীত না জানে রীত, কাজল, জংলীফুল, সঙ্গমসহ আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন খলিল। প্রতিটি ছবিই সেই সময় বেশ ব্যবসা সফল হয়। খলিল সম্পর্কে কিংবদন্তি নায়িকা শবনম বলেন, ‘ একজন মার্জিত শিল্পী খলিল ভাই। তাঁর বিপরীতে নায়িকা হিসেবেও আমি অভিনয় করেছি। সব সময়ই চিরাচরিত হাসি তাঁর মুখে লেগেই থাকত। তাঁর মতো এমন গুণী অভিনয়শিল্পী আমাদের চলচ্চিত্রে খুব কমই আছেন। তাঁর শূন্যতা সত্যিই কোনদিনই পূরণ হবার নয়।’ এসএম পারভেজ পরিচালিত ‘বেগানা’ ছবিতে প্রথম খলনায়ক হিসেবে খলিল অভিনয় করেন। এই ছবিতে দর্শক তাঁর অভিনয়কে গ্রহণ করে নেন। যার ফলে একই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের আরও সুযোগ আসে। তিনিও কখনও না করেননি। ফলে এরপর একের পর এক খলনায়ক হিসেবেই ছবিতে কাজ করেন। নায়ক চরিত্রে আর অভিনয় করা হয়ে উঠেনি। একজন শিল্পী দর্শকের ভালবাসার জন্যই মূলত কাজ করে। এর পেছনে আর্থিক যে সাপোর্টটা থাকে তা একেবারেই নামেমাত্র। শিল্পী সবসময়ই তাঁর নিজস্ব অভিনয়শৈলীকে উপস্থাপন করেন তার সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে। তিনি দর্শকের ভালবাসার জন্যই কাজ করেছেন। আর দর্শকের ভালবাসার সর্বোচ্চ রায় হচ্ছে পুরস্কার বা স্বীকৃতি। চলচ্চিত্রে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হচ্ছে সেই স্বীকৃতি। একজন শিল্পী যদি সত্যিই ভাল অভিনয় করেন, তাঁকে দলমত নির্বিশেষে তাঁর কাজের জন্য পুরস্কার দেয়া উচিত। চিত্রনায়িকা কবরী প্রযোজিত আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘গু-া’ ছবিতে খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন খলিল। একবারই পেয়েছিলেন এই সম্মাননা। অথচ এরপর আরও অনেক অনেক ভাল ভাল চরিত্রে কাজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর কোন স্বীকৃতিই মিলেনি তাঁর ভাগ্যে। কিন্তু তাতে কোন দুঃখ নেই তাঁর। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি দর্শকের ভালবাসা পাচ্ছি। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’ খলিল প্রসঙ্গে চিত্রনায়িকা কবরী বলেন, ‘ খলিল ভাইয়ের অভিনয়ের মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণ ছিল। আকর্ষণটা ঠিক এমন ছিল যে, তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করতেন সেই চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে তাঁর গলার আওয়াজ সহায়ক ভূমিকা পালন করত। যে কারণে তাঁর চরিত্রটিও হয়ে উঠতো প্রাণবন্ত। খলিল ভাই কখনই তাকে দেয়া চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে বাড়তি কিছু করার চেষ্টা করতেন না। কারণ তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করতেন তাতে সহজাতভাবেই তিনি অভিনয় করতেন। আর তাতেই চরিত্রটি ফুটে উঠতো। আর সেসব চরিত্রই দর্শককে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করত। আমি সত্যিই বলছি, খলিল ভাইয়ের মতো অভিনেতা আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে আর দ্বিতীয় জন নেই। সত্যিই তাঁর শূন্যতা পূরণ হবার নয়। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।’ অভিনয় করলেও কখনই তাঁকে নির্দেশনায় পাওয়া যায়নি খলিলকে। ছবি পরিচালনা না করলেও দুটি ছবি প্রযোজনা করেছিলেন তিনি। একটি ‘সিপাহী’ অন্যটি ‘এই ঘর এই সংসার’। সিপাহী ছবিটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন কাজী হায়াৎ। ছবিটি বেশ ভালো ব্যবসা করেছিল। তবে তারচেয়েও বেশি ব্যবসা সফল হয়েছিল মালেক আফসারী পরিচালিত‘ এই ঘর এই সংসার’ ছবিটি। এই ছবিতে নায়ক হিসেবে ছিল প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ। তার বিপরীতে ছিল বৃষ্টি। খলিল সর্বশেষ নায়ক রাজ রাজ্জাকের সঙ্গে ‘বাপ বড় না শ্বশুর বড়’ ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এরপর আর নতুন কোন ছবিতে কাজ করেননি। খলিলকে নিয়ে নায়ক রাজ রাজ্জাক বলেন, ‘তিন দিন আগেও আমার সঙ্গে ফোনে কথা হলো। বলছিলেন, যে কোন সময় চলে যেতে পারি। কথাটা শুনে খুব খারাপ লেগেছিল। আজ সত্যিই তিনি নেই। মেনে নিতে পারছি না। তিনি ছিলেন আমার সত্যিকারের মুরব্বি, অভিভাবক। নিজেকে কখনোই তিনি সিনিয়র মনে করতেন না। তিনি যেমন আমার বন্ধু ছিলেন ঠিক তেমনি আমার দুই ছেলে বাপ্পা এবং সম্রাটের বন্ধু ছিলেন। আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন তিনি। তাঁর হঠাৎ করে চলে যাওয়ায় আমাদের পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেস্ত নসিব করেন।’ শিল্পী সমিতির দ্বিতীয় সভাপতি ছিলেন তিনি। খলিল অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পুণম কি রাত, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, উলঝান, সমাপ্তি, তানসেন, নদের চাঁদ, পাগলা রাজা, বেঈমান, অলংকার, মিন্টু আমার নাম, ফকির মজনুশাহ, কন্যাবদল, মেঘের পরে মেঘ, আয়না, মধুমতি, ওয়াদা, ভাই ভাই, বিনি সুদেতার মালা, মাটির পুতুল, সুখে থাকো, অভিযান, কার বউ, দিদার, আওয়াজ, নবাব ইত্যাদি। প্রতিটি ছবিতেই তার অনবদ্য অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে তুলে। একজন খলিল সারা জীবন অভিনয় করে গেছেন তা নয়। পাশাপাশি সামাজিক কাজের সঙ্গেও তিনি ছিলেন সম্পৃক্ত। একজন খলিলকে দর্শক শুধু চলচ্চিত্রেই দেখেছেন তা কিন্তু নয়। পাশাপাশি তিনি টিভি নাটকেও অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত বিশেষ নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আবদুল্লাহ আল মামুনের ধারাবাহিক নাটক সংশপ্তক। এই নাটকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিল। নাটকটি প্রচারকালীন সময়ে খলিলের অভিনয় দর্শকের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। খলিল বলেছিলেন, ‘যে সময়ে সংশপ্তক নাটকটি নির্মিত হয় সে সময় এলে আমি চলচ্চিত্রে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। তারপরও চরিত্রটি পছন্দ হওয়ায় সে সময় বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করা ছেড়ে দেই। মন দিয়ে কাজটি করি। যে কারণে আজও আমাকে এই নাটকে অভিনয়ের প্রসঙ্গ টেনে অনেক কথা বলেন।’ খলিল প্রসঙ্গে চিত্রনায়ক উজ্জ্বল বলেন, ‘নায়ক হবারও আগে খলিল ভাইয়ের অভিনয়ের ভক্ত ছিলাম আমি। সেই পর্দার মানুষটির সঙ্গে যখন একসঙ্গে কাজ শুরু করি তখন পেয়েছিলাম সহযোগিতার হাত। বন্ধু বৎসল একজন মানুষ ছিলেন তিনি। যখন যেখানে থাকতেন তিনি মাতিয়ে রাখতেন তিনি। শুধু তাই নয় জুনিয়র শিল্পীদের আপন করে নেয়ার যে অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাও পরবর্তীতে আমরা কাজ করতে এসে ফলো করেছি খলিল ভাইকেই। একজন অত্যন্ত বিনয়ী, সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষকে হারালাম আমরা। এই ক্ষতি কোনদিনই পূরণ হবার নয়। ’ চিত্রনায়িকা এবং চলচ্চিত্র পরিচালক কোহিনূর আক্তার সুচন্দা বলেন, ‘আসলে সবাই আমরা এখন তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি। এটাই হয়ত নিয়ম, বয়স হলে চলে যেতে হয়। নায়িকা হবার অনেক আগে থেকেই আমি খলিল ভাইয়ের চলচ্চিত্র দেখেছি। খলিল ভাই সব সময়ই একজন হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মানুষ ছিলেন। কারও যদি মনে কোন কষ্ট থাকত কিংবা খলিল ভাইয়ের প্রতি রাগ থাকত তবে তিনি এমন কিছু বলতেন যে রাগ আর থাকত না কিংবা না হেসে পারতেনই না। খলিল ভাইয়ের সামনে এলে সব দুঃখ ভুলে যেতেই হতো। এটা তাঁর অনেক বড় গুণ ছিল। সর্বশেষ তারসঙ্গে আমার এ্যাপোলে হসপিটালে দেখা হয়েছিল। সেখানে অনেকটা সময় কেটেছিল। সেদিনের সেই কথাগুলো আজ বার বার কানে ভেসে আসছে। খলিল ভাইয়ের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেস্ত নসিব করেন।’ তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন খলিল। ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে বসবাস করতেন খলিল। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, সিলেটে। খলিলের স্ত্রী রাবেয়া খানম। একজন খলিলের শূন্যতা সত্যিই পূরণ হবার নয়। আসুন আমরা সবাই তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

অভি মঈনুদ্দীন

ছবি : আরিফ আহমেদ