২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মূল ফিচার ॥ ফিরলেন পপি


রাতের ঢাকা। চারদিকে নিয়ন আলোর বাড়াবাড়ি। মানুষগুলো ক্রমেই ব্যস্ততার পাট চুকিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। তখনও ব্যস্ত পপি। ‘চার অক্ষরের ভালবাসা’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকে দুয়েকটা হল ঘুরেছেন তিনি। এখনও ঘুরছেন। দর্শক প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন। কেমন দেখলেন? ‘আমি তো ভালই দেখেছি। তবে একটা উপলব্ধি হলো যে- আমাদের দর্শক ছবি দেখার জন্য হলে যেতে চায়, যদি মানসম্মত ভাল ছবি বানানো হয় এবং হলগুলোর পরিবেশ ঠিক করা হয়।’ এ প্রজন্মের দর্শকরা অনেক আধুনিক। তারা হলিউড, বলিউড দেখে অভ্যস্ত। তাদের কাছে এমন নাম, এমন গল্পের ছবি কি ভালভাবে গ্রহণযোগ্য? আমার সংশয় ছিল। কিন্তু, পপি আত্মবিশ্বাসী। ‘অবশ্যই। আমি যত ছবিতে কাজ করেছি বা করছি, প্রত্যেকটা ছবির দর্শক গ্রহণযোগ্যতা এ যাবতকালে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, আমার প্রত্যেকটা ছবিতেই কোন না কোন বার্তা থাকে। যেমন, গার্মেন্টস কন্যা। সেটাতে শ্রমজীবী, কর্মজীবী মানুষের কথা বলা হয়েছে। চার অক্ষরের ভালবাসা ছবিতে ভালবাসার কথা বলা হয়েছে। সৃষ্টির শুরুই তো ভালবাসা দিয়ে। আজও পর্যন্ত টিকে আছে ওই ভালবাসাই। এটা জীবনেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি আসলে গতানুগতিক ছবি কখনোই করতে চাই না। যে ছবিতে চ্যালেঞ্জ থাকে, কাজ করার ভাল সুযোগ থাকে, যেটা কোনো না কোনোভাবে সমাজের মানুষের উপকারের যোগ্য বলে মনে হয়- সেটাতেই আমি কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’

এই আত্মবিশ্বাসে পপিকেই মানায়। চলচ্চিত্রের স্বর্ণসময়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি। পার করে ফেলেছেন দেড় যুগের মতো সময়। সেই সময় আর এখনকার সময়ের মধ্যে ব্যবধান কেমন? ‘অনেক বেশি। শাবানা ম্যাডাম বা ববিতা আপারা যখন কাজ করতেন, ওই সময়ে ছবির দর্শকপ্রিয়তা সবচে’ বেশি থাকত। তখন প্রচুর ঐতিহাসিক ছবি নির্মিত হতো। আমি আসার পরে অন্তত ১০ বছর পর্যন্ত ইন্ডাস্ট্রির স্বর্ণসময় চলেছে। তখন খুব ভাল ছবি তৈরি হতো, ব্যবসায়িকভাবে সফল হতো। এখনও ছবি হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো কতটুকু ব্যবসায়িকভাবে সফল, আমি ঠিক জানি না। তবে এতটুকু বলতে পারি, মনে দাগ কাটার মতো সে রকম ছবি হচ্ছেই না এখন। আগে গল্পে অনেক ভ্যারিয়েশন থাকত, এখন প্রায় সবই এক।’ সেজন্যই কি ছবিতে কাজ করা কমিয়ে দিয়েছেন? ‘হ্যাঁ.. আমার কাছে এমন কোন চ্যালেঞ্জিং ক্যারেক্টার আসছে না, যেটাতে আমি কাজ করে মজা পাই। কাজের আগ্রহটা বাড়ে। আর, ডিজিটাল ছবির নামে বানানো সস্তা ছবিগুলোর কারণে প্রপার ফিল্ম বলতে আমরা যেটা বুঝি, সেটা থেকে মানুষ আস্তে আস্তে ডাইভার্ট হয়ে যাচ্ছে।’

তা তো আছেই, নকল ছবিতেও তো সয়লাব এখন চারদিক। কারণটা কী? ‘স্টাডির অভাব। আমাদের এখানে কেউই তেমন স্টাডি করে না। প্রচুর বই পড়লে, সাহিত্য পড়লে কিন্তু অনেক ভাল ছবি বের করে আনা সম্ভব। তারপরও চুরি যদি করে কেউ, সেটা যদি প্রপার মেধা খাটিয়ে করে, সুন্দরভাবে করে- তাহলেও কিন্তু সেটা খারাপ মনে হয় না।’ হাসলেন পপি। তারপর বললেন, ‘সেই মেধাটাও তো থাকতে হবে! চুরি করাটাও একটা ট্যালেন্টের মধ্যে পড়ে, সেটা যদি শৈল্পিক হয়। আমি গল্প চুরির কথা বলছি; টাকা-পয়সা, সোনা-দানা এসব না কিন্তু!’

আবারও হাসলেন পপি। সেই হাসি যেন ট্রাফিক সিগন্যালের মতো থামিয়ে দিচ্ছিল রাতকে। পপির হাতে কোন ছবি নেই, ফুরিয়ে গেছেন তিনি- এ ধরনের অনেক কথা বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায়। কিন্তু কেন! ‘যারা শিল্পিদের সম্মান করতে জানেন না, ইন্ডাস্ট্রিকে ভালবাসতে জানেন না, নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মানবোধটা নেই- তেমন কিছু অশিক্ষিত লোকই এভাবে বলতে পারেন। শিক্ষিত বা বিজ্ঞ মানুষরা এ ধরনের কথা বলবেন না। যাদের জ্ঞানের খুবই অভাব, তারাই শুধু বলবেন। হলিউডের দিকে যদি তাকাই, এ্যাঞ্জেলিনা জোলি থেকে শুরু করে জেনিফার লোপেজ, কেট, টম ক্রুজ- এরা কিন্তু অনেক শক্তিমান অভিনেতা। তাদের বেলায় এই বিশ্লেষণগুলো কিন্তু কখনোই আসা সম্ভব না। আমার জন্য কেন আসবে! তাদের অর্ধেক বয়সও আমার না। কিংবা আপনি সালমান, শাহরুখ, আমির খান, ক্যাটরিনা, কারিনা, ঐশ্বরিয়া এমনকি অমিতাভ বচ্চনের দিকেও যদি তাকান- এদের নামটা লেখার আগে কখনোই কিন্তু সিনিয়র কথাটা আসে না। তারাও তো আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র! এই বিশ্লেষণগুলো কি তাদের ক্ষেত্রেও লেখা হয়? না। আসলে, যেদিন থেকে আমি কাজ করা শুরু করেছি, সেদিন থেকেই আমি একজন শিল্পি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি শিল্পিই থাকব। মৃত্যুর পরেও কিন্তু আমার নামের সঙ্গে শিল্পি কথাটা লেখা থাকবে। তো, এই বিশ্লেষণগুলো কখনোই আসা উচিত না। যাঁরা বলছেন এমন, তাঁরা নিহায়তই হিংসা বা ব্যক্তিগত কোনো ফায়দার জন্য বলছেন আসলে। আঙ্গুর ফল টক, কথাটা এদের ক্ষেত্রেই যায়।’ অভিনয় জীবনে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন পপি। ভালবাসা পেয়েছেন অজস্র দর্শকের। তবুও কি তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নিজের পুরো ক্যারিয়ার নিয়ে? ‘অবশ্যই। কারণ, আমি জেনে বুঝে কাজ করছি। ছোটবেলায় নিশ্চয়ই কচ্ছপ আর খরগোশের গল্পটা পড়েছেন? আমি ক্যারিয়ার থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ওটাকে অনুসরণ করি। কখনোই আমি আমার ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে উচ্চাকাক্সক্ষা ধারণ করি না। খুব আস্তে আস্তে আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই। যাতে করে দর্শকরা আমাকে গালি না; অন্তত সম্মানটা দিবে, ভালবাসবে।’

কিন্তু, কখনোই কি মনে হয়নি যে অভিনেত্রী না হয়ে অন্যকিছু হলে ভাল হতো! ‘যখন দেখি যে বাংলাদেশে শিল্পির সম্মানটা একেবারেই জিরোর কোঠায়, তখন আসলেই অনেক দুঃখবোধ হয়। কিন্তু যখন প্রাপ্তিটা অনেক বেশি থাকে, যখন খুব ভাল কিছু পাই- তখন ঠিকই মনে হয় যে, হ্যাঁ.. আমার অভিনেত্রী হওয়াটাই ঠিক ছিল। ভুল করিনি। আসলে, মানুষ সাধারণত দুইটা কারণে কাজ করে। টাকা আর সম্মান। আমার ক্ষেত্রে টাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমি বরাবরই সম্মানটা চেয়েছি।’ পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেন না পপি। তবুও যদি থেকেই থাকে এমন কিছু, তাহলে মাদার তেরেসা হতে চান সেই জন্মে। শ্রদ্ধেয় পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন অসুস্থ। তার চিকিৎসার জন্য খুব ভুগতে হচ্ছে পুরো পরিবারকে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! পপি জানালেন নিষ্ঠুর সত্যি কথা। ‘চলচ্চিত্রের ইতিহাস বলে- যারা চলচ্চিত্রকে কিছু দিয়েছে, তাদেরকে চলচ্চিত্র আসলে খুব কমই দিয়েছে। তারা প্রায়ই বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। কিন্তু যারা চলচ্চিত্র থেকে নিয়েছে প্রপার ভাবে, যারা কোনো সেক্রিফাইস করেনি- তারাই খুব লাভবান হয়েছে আসলে। শুধু তাই নয়, ভুগছি আমরাও। আমি একজন শিল্পী। আমার নিজস্ব যে স্ট্যাটাস, ফ্যামিলি- সবকিছু মেন্টেন করে মোটামুটিভাবে বেঁচে থাকার জন্য অন্তত একটা বাসস্থান তো দরকার। ডিআইটি’র সরকারী একটা প্লট পাওয়ার জন্য সেই কবে থেকেই চেষ্টা করছি, পাইনি আজও। অথচ, রাজ্জাক ভাইরা, ববিতা আপারা যখন কাজ করতেন, তাঁরা কিন্তু দু-চারটা কাজ করেই যা উপার্জন করতেন- তা দিয়ে গুলশানের মতো যায়গায় প্লট কিনতে পারতেন। অথচ আমি যদি এখন কিনতে চাই, সেটা আমার সাধ্যের বাইরে। শিল্পী হিসেবে আমারও তো অধিকার আছে ভালভাবে বেঁচে থাকার!’ কথাগুলো ভেসে যাচ্ছিল ইথারে ইথারে। এই অবস্থার পরিবর্তন হবে কবে? প্রশ্নটা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টসহ সরকার এবং সবার বিবেকের কাছেই জমা রইল।

ছবি : আরিফ আহমেদ