১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

শেখ ফজলুল হক মণি ॥ মেধাবী রাজনীতিকের প্রতিকৃতি


বাংলাদেশের অন্যতম মেধাবী রাজনীতিক শেখ ফজলুল হক মনি। ১৯৩৯ সালের ৪ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সস্ত্রীক খুনীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেছেন। সে সময় তাঁর স্ত্রী আরজু মনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা।

শেখ মনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুই-দুইবার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আইয়ুব খান মোনায়েম খান তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বড় শত্রু হিসেবেই চিনতেন। ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি আন্দোলনে শেখ মনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মোনায়েম খানের হাত থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ না করার আন্দোলনে শেখ মনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যাঁরা মোনায়েমের হাত থেকে উপাধিপত্র গ্রহণ করার জন্য সভাস্থলে হাজির হয়েছিলেন, তাঁরা উল্টো শেখ মনির নেতৃত্বে সভাস্থল বয়কট করে মোনায়েম খানকে প্রকাশ্যে বর্জন করেন।

শেখ মনির রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় কৃতিত্ব ১৯৬৬ সালের ৭ জুনে ৬ দফার পক্ষে হরতাল সফল করে তোলা। তিনি তখন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকদের তিনি সংগঠিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। ওই হরতাল সফল না হলে বাঙালীর মুক্তিসংগ্রাম পিছিয়ে যেত। মোনায়েম খান শেখ মনিকে গ্রেফতার করেন। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান।

শেখ মনি ছিলেন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের কর্মসূচীর অন্যতম প্রণেতা। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী শেখ মনি সত্তরের নির্বাচনী কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করেনÑ ‘পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশকে ৬ দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান, ব্যাংক-বীমা ও ভারি শিল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য, পাট ও তুলা ব্যবসা জাতীয়করণ, পূর্ব পাকিস্তানের জায়গীরদারী, জমিদারী ও সর্দারী প্রথার উচ্ছেদ, পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমির খাজনা মওকুফ, শ্রমিকদের ভারি শিল্পের শতকরা পঁচিশ ভাগ শেয়ার প্রদান ও বাস্তুহারাদের পুনর্বাসন ইত্যাদি।’

শেখ মনি ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিউক্লিয়াস বাহিনীর পরিকল্পক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে মুজিব বাহিনী গঠনের অন্যতম প্রণেতা ছিলেন।

দৈনিক ‘বাংলার বাণীর’ প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনি। তিনি ‘দূরবীনে দূরদর্শী’ নামে কলাম লিখতেন।

কবি আসাদ চৌধুরী শেখ মনি সম্পর্কে বলেছেন, ‘সেই একটা সময় ছিল ত্যাগ ব্রতের রাজনীতিÑতাদের ঘিরে যারা জারা হতেন তাদের মধ্যে গভীর দেশপ্রেম ছিল। রাজনীতি চর্চার জন্য শিক্ষা ও আদর্শ ছিল, চরিত্রে সংহতি ছিল। তারা দেশের মানুষের ভোটার বা রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়িই শুধু ভাবতেন না, বড় করে দেখতেন। আমাদের মনি ভাই এই দলের মানুষ। মতান্তরে গিয়ে দাঁড়ায়নি কখনও। মনি ভাইকে আমার সশ্রদ্ধ সালাম।’

১৯৭২ সালের ১১ নবেম্বর শেখ মনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন। বিশ্ব রাজনীতির ওপর তার প্রগাঢ় জ্ঞান ছিল।

তিনি সমকালীন রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণও করতেন। তিনি তাঁর প্রবন্ধে সে সব কথা নিঃশঙ্কচিত্তে লিখে গেছেন। লেনিনকে নিয়ে তাঁর লেখাÑ‘বিল্পবের পর প্রতিবিপ্লব আসবে’ একটি উল্লেযোগ্য প্রবন্ধ। এছাড়াও তিনি ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় নেতা সুকর্নের পতন নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সুকর্নের এই পতন বঙ্গবন্ধুর বেলায়ও হতে পারে বলে অনুমান করেছিলেন তিনি। ‘বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারই একটি রাষ্ট্র। মানুষ এখানে দরিদ্র। মধ্যবিত্তের উচ্চাভিলাষ এখানে অপরিমিত, স্বাধীনতার শত্রুরা এখানে তৎপর, পুরাতন আমলারা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রে পুনর্বাসিত। সুতরাং সময় থাকতে রোগ ধরা না গেলে দাওয়াইটিও কেউ খুঁজবে না এবং একজন সংবাদপত্রসেবী হিসেবে সে দায়িত্ব আমাদেরই।’

এই উদ্ধৃতির আক্ষরিক বাস্তবতা আমরা ’৭৫ পরবর্তী কালে দেখেছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক