২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অভিমত ॥ ফিটনেসবিহীন গাড়ি যাত্রীদুর্ভোগ


সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি বড় অভিশাপ। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের খামখেয়ালিপনা, অনভিজ্ঞ চালক দ্বারা গাড়ি পরিচালনাকেই দায়ী করা হচ্ছে। মানুষ নিত্যপ্রয়োজনে প্রতিনিয়তই দেশের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সড়ক কিংবা নৌপথে যাতায়াত করে থাকে। জীবনের তাগিদে সবাই গ্রাম থেকে শহরে বা শহর থেকে গ্রামে যে কোন যানবাহনে ছুটে চলছে। প্রতিটি মানুষই চায় তাদের চলার পথ যেন হয় নিরাপদ। আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্য যে কোন দেশের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অস্বাভাবিক মৃত্যু যেন আজ সাধারণ মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক-মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে সারাদেশে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। সরকারের গৃহীত এই পদক্ষেপ কতটুকু আলোর মুখ দেখবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছে সাধারণ মানুষদের মধ্যে। বিআরটিএ-এর কার্যক্রম যাতে মাঝপথে ঝিমিয়ে না পড়ে সেদিকে নজর দিতে হবে। সড়ক মহাসড়কগুলোতে বিভিন্ন পরিবহনের নামে বিলাসবহুল গাড়ি চললেও ঢাকা সিটিসহ জেলা শহরগুলোর কম দূরত্বের রাস্তাগুলোতে যাত্রী সেবার নামে যে পরিমাণে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি চালিত হয়ে আসছে তাতে শুধু যাত্রী সেবাই ব্যাহত হচ্ছে না যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ির চালক ও হেলপাররা নিয়ম-নীতির কোন তোয়াক্কা না করে সদর্পে তারা তাদের গাড়ি পরিচালনা করে আসছে।

সরকার সাধারণ মানুষের চলারপথ নিরাপদ রাখতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সশূন্য চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও যাত্রীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনায় গাড়িশূন্য হয়ে পড়ছে রাস্তাঘাট। বিআরটিএ এর পরিচালনার শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে মানুষের ভোগান্তির চিত্র ফুটে উঠছে। বিকল্প পরিবহন ছাড়া অভিযান পরিচালনা করায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। আটকের ভয়ে অবৈধ গাড়ি গ্যারেজ ও রাস্তার পাশে রেখে দিয়েছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। বাস স্টপেজগুলোতে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়ছে। বাসে জায়গা না পেয়ে অনেক যাত্রী বাদুরঝোলা হয়ে যেতে দেখা গেছে। পরিবহন সঙ্কটে ক্ষোভ প্রকাশ করে যাত্রীরা বলেন, কয়েকটি পয়েন্টে অভিযান শুরু করা হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা আগে থেকে জেনে যাচ্ছেন কোথায় কখন মোবাইল কোর্ট বসবে। তারা ওই রুট এড়িয়ে অন্য রুটে চলে যাচ্ছেন। অটোরিক্সা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেছে যাত্রীদের কাছ থেকে। যাত্রীরা এদের কাছে অনেকটা জিম্মি অবস্থায় থাকলেও পুলিশ কর্তৃক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। এদিকে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আনফিট যানবাহন উচ্ছেদ করতে এবার আটঘাট বেঁধে নেমেছি। এজন্য রাজধানীতে যানবাহন সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হতে পারে এ বিবেচনায় রাজধানীতে বিআরটিসির অতিরিক্ত বাস নামানো হয়েছে।

সরকারী হিসাব মতে সারাদেশে প্রায় সোয়া তিন লাখ সনদহীন যানবাহন চললেও রাজধানীতেই এর পরিমাণ প্রায় এক লাখ। অবৈধ চালকও রয়েছে সমসংখ্যক! সম্প্রতি যশোরের অভয়নগরে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় টনক নড়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের। সড়কের নিরাপত্তা জোরদার করতে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ও চালকসহ মেয়াদোত্তীর্ণ পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হয়। এর অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্র ও পরিবহন মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে দেশের সকল জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের চিঠিতে ১০ নবেম্বর থেকে অবৈধ যান ও চালকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালানো হবে বলে জানানো হয়। বেসরকারী বিভিন্ন পরিসংখ্যান মতে দেখা যায়, দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের বেশি! সরকারী তালিকাভুক্ত ২১ লাখ যানবাহনের মধ্যে ফিটনেস ছাড়াই চলছে প্রায় সাড়ে তিন লাখেরও বেশি যানবাহন। ১৩ লাখ লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের মধ্যে প্রায় সাত লাখ অবৈধ চালক রেজিস্ট্রেশনভুক্ত পরিবহন চালাচ্ছেন। দেশে ৩৩ লাখেরও বেশি চালক অবৈধভাবে যানবাহন পরিচালনা করে আসছে। ৩৬১টি রুট দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে এসব অবৈধ চালক ও যানবাহন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ পরিষদের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৮ লাখ নসিমন, করিমন, ভটভটিসহ ৩ লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক নিয়মিতভাবে সড়ক মহাসড়কে যাতায়াত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ৯১ ভাগ চালকই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে ৬১ ভাগ চালককে লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে রাজধানীতে মোট যানবাহনের সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ৯১২টি থাকলেও বিগত পাঁচ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছরে রাজধানীতে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত পরিবহনের সংখ্যা আট লাখ ৩৫ হাজার ৮১২টি। যার মধ্যে রয়েছে বাস ২১ হাজার ৪৯৩টি, মোটরসাইকেল ৩ লাখ ২৮ হাজার ৩৪২টি, প্রাইভেট পেসেঞ্জার কার ২ লাখেরও বেশি। চলতি বছরে সারাদেশে রেজিস্ট্রেনভুক্ত মোট পরিবহনের সংখ্যা ২১ লাখ ৫ হাজার ১৪০টি। যার মধ্যে অটোরিক্সা ২ লাখ ২১ হাজার ৮৬টি, ডেলিভারি ভ্যান ২০ হাজার ৫৬২টি, জিপ প্রায় ৪০ হাজার, মাইক্রোবাস প্রায় ৮০ হাজার, মোটরসাইকেল ১১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি, প্রাইভেট পেসেঞ্জার কারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ১৭টি এবং ট্রাক রয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজারের বেশি। বিআরটিএর সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, সারাদেশে তিন লাখ ১৩ হাজার যানবাহন চলাচল যোগ্যতা (ফিটনেস) সনদ ছাড়াই চলছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই ফিটনেস সনদবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ৯৩ হাজার ৬০৪। শতকরা হিসেবে প্রায় ৩৩ ভাগ যানবাহনেরই ফিটনেস নেই। [সূত্র : জনকণ্ঠ]

ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে সারাদেশে অভিযান শুরু হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিআরটিএ এর বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে।

লেখক : সংবাদকর্মী